বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় খ্রিস্টান মিশনারী পরিচালিত মেয়েদের জন্য প্রসিদ্ধ হলিক্রস গার্লস হাইস্কুলেও মৌলবাদী ধ্যান ধারণার মানুষরা ঠাঁই করে নিয়েছেন। তাদের চিন্তা চেতনা মেয়েদের মধ্যেও ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য কাজও শুরু হয়েছে। এর জলন্ত প্রমাণ পাওয়া গেল স্কুলটির দশম শ্রেণির প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে। যৌন নিপীড়নের ব্যাপারে মেয়েদের সচেতন না করে বরং নারীর পোষাকের কারণেই যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটে বলে দশম শ্রেণির ইসলাম ধর্ম পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে বলা হয়েছে। সৃজনশীল ওই প্রশ্নপত্রে এমনভাবে প্রশ্ন করা হয়েছে, যেন উত্তর দিতে গিয়ে পোষাককেই যৌন নিপীড়নের জন্য দায়ী বলা যায়।
যৌন নিপীড়নের জন্য নারীর পোশাকের দিকে ইঙ্গিত করে হওয়া প্রশ্ন পরে অভিবাবকরা দেখলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। এ প্রশ্ন পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে এই বালিকা বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী নিজেও অস্বস্তিতে ভোগার কথা জানিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের মনের মধ্যে সংকীর্ণতা ঢুকিয়ে দিতেই মৌলবাদী চক্র এভাবে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করেছে বলেও মনে করছেন অভিবাবকদের অনেকেই।
হলি ক্রস উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির প্রথম সাময়িকীর ইসলাম ধর্ম (সৃজনশীল) পরীক্ষা হয় গত সোমবার। বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগের ছয়টি সেকশনের শিক্ষার্থীরা এই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষায় অংশ নেন।
৫০ নম্বরের প্রশ্নপত্রের ৫ নম্বর প্রশ্নে নারীকে অবমাননা এবং নারীর পোশাককে উদাহরণ টেনে নারীর প্রতি সহিংসতা উস্কে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
৫ নম্বর প্রশ্নে বলা হয়েছে, “সানজিদার চালচলন, বেশভূষা ও কথাবার্তায় বেশ মার্জিত সবাই তার সাথে সদাচরণ করে। অপরপক্ষে তার সহপাঠী রুমানা আটসাঁট পোশাক পরে। তাই সে গেঞ্জি ও জিন্সের প্যান্ট পরে প্রতিবছর বৈশাখী মেলাসহ বিভিন্ন মেলায় অংশ গ্রহণ করে। মাঝে মধ্যে সে অনেক সমস্যায় পড়ে, তার কথাবার্তা চালচলন মার্জিত নয়। পাড়ার ছেলেরা অনেক সময় তাকে উত্যক্ত করে। এ বছর বৈশাখী মেলায় ঘটে যাওয়া বিষয় সম্পর্কে রুমানা –সানজিদাকে জানালে সানজিদা তাকে পোশাক পরিচ্ছদে শালীনতা অবলম্বনের পরামর্শ দেয়।”
প্রশ্ন হলো: ক. শালীনতা কী?
খ. রুমানা পোশাক পরিচ্ছদে শালীনতা অবলম্বন করবে কেন? ব্যাখ্যা কর।
গ. সানজিদাকে অনুসরণ করে আমরা কীভাবে সামাজিক অবক্ষয় থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারি? ব্যাখ্যা কর।
ঘ. সুস্থ, সুন্দর সমাজ গঠনে শালীনতার তাৎপর্য ও গুরুত্ব কুরআন- হাদীসের আলোকে বিশ্লেষণ কর।
আবদুল হাই ও জিন্নাত আলী নামে দুই শিক্ষক বিদ্যালয়ের মর্নিং ও ডে শিফটে ইসলাম শিক্ষার ক্লাশ নেন বলে শিক্ষার্থীরা জানান। তবে কে এই প্রশ্ন প্রণয়ন করেছেন তা জানা যায়নি।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান আবু বক্কর ছিদ্দিক বলেন, “এটি একটি সেনসেটিভ বিষয়। এ ধরনের বিষয় প্রশ্নপত্রে পরিহার করাই ভালো।”
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে হলি ক্রস উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সিস্টার রানী ক্যাথরিন গোমেজকে অফিসের ফোনে একাধিকবার কল করলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এই ধরনের প্রশ্নপত্রের বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা ও বেসরকারি সংস্থা গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, “এটা যে বা যারাই করুক, কোন একটা উদ্দেশ্য নিয়ে করেছেন। এখানে ছেলেদের তো উদাহরণ টেনে বলা হয়নি। টার্গেট তো মেয়েদের করা হয়েছে। ছেলেরাও তো গেঞ্জি, জিন্স পরে, মেলায় যায়। কিন্তু মেয়েদের টার্গেট করে নেতিবাচক ধারণা দেওয়া হয়েছে।”
গত ১৪ এপ্রিল বর্ষবরণ উৎসবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় নারীদের উপর নিপীড়নের ঘটনা দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু হয়। ওই ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও শাস্তি দাবিতে এখনো আন্দোলন করছে বিভিন্ন সংগঠন। ঘটনার ফুটেজ দেখে আটজনের চিত্র প্রকাশ করে তাদের ধরিয়ে দিতে পারলে প্রত্যেকের জন্য লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে।
বিশেষ প্রতিনিধি
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম



Leave a Reply