ডিম্পল বরা, নয়াদিল্লি থেকে॥
চারবছর পরও একই নাটকীয়তা। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঢাকা সফর নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী এবারও ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দাবা খেলছেন। সর্বশেষ মঙ্গলবার তিনি জানান ঢাকা যাবেন না। এরপর বিজেপি সরকারের ঐকান্তিক চেষ্টার পর বৃহস্পতিবার তিনি ঢাকা সফরে যেতে রাজি হয়েছেন। তবে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের ঢাকাগামী বিমানে না ওঠা পর্যন্ত তার ওপর আস্থা আনতে পারছে না খোদ বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও মেঘালয়, আসাম, ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীরাও আগামী ৬-৭ জুন সফরে সঙ্গী হচ্ছেন। ঢাকা, নয়াদিল্লি ও কলকাতার একাধিক সূত্র এ তথ্য জানায়।
কংগ্রেস জোট সরকারের পর বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে বিজেপি সরকারও। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অত্যন্ত আন্তরিকভাবে ঢাকা সফরের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় স্থল সীমান্ত চুক্তির পর তিস্তা নিয়েও ইতিবাচক তার সরকার।
এছাড়া দু’দেশের মধ্যে আরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে চুক্তি ও সমঝোতা সইয়ের প্রস্তুতিও চলছে। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে আগরতলা থেকে কলকাতা পর্যন্ত বাসও চলবে। সবকিছু নিয়ে যখন সহযোগিতা ও পারস্পরিক আস্থার নতুন এক দিগন্ত উন্মোচনের অপেক্ষা ঠিক তখনই আবারও বেঁকে বসে সেই সম্ভাবনাকে হোঁচট খাওয়ানোর মতো পরিবেশ তৈরি করেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা।
মমতা বন্দোপাধ্যায়ের ঢাকা না আসার কথা জানার পর ঢাকায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। ঢাকা থেকে বার্তা পাঠানো হয়, ‘স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের ঘোষণার সময় মমতা বন্দোপাধ্যায়কে পাশে দেখতে চাই।’ এছাড়া ওদিকে দিল্লিতেও বিষয়টি নিয়ে বুধবার বিকেল থেকেই শুরু হয় রাজনৈতিক সমাধান খোঁজার চেষ্টা। তবে সবকিছু মিলিয়ে বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত মমতা ‘না’ তেই দাঁড়িয়েছিলেন।
কলকাতায় মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয়ে ঢাকায় যাওয়ার জন্য নয়াদিল্লি থেকে নতুন করে বিশেষ আমন্ত্রণপত্র পৌঁছানো হয়। এরপরই মমতাও ঢাকা যাওয়ার ব্যাপারে নিজের সম্মতি জানান মমতা। তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক ও পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টেপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রীর ঢাকা যাওয়ার ঘোষণা জানিয়ে বলেন, ‘এটা খুবই ভাল ব্যাপার যে প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী একসঙ্গে বাংলাদেশে যাচ্ছেন। আমরা আশা করব এই সফরে রাজ্যের স্বার্থ উপেক্ষিত হবে না। দুই বাংলার সম্পর্ক আরও উন্নত হবে। আমাদের রাজ্যের বাসিন্দারাও সেটাই চান’।
২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকায় ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং-এর সফরসঙ্গী হিসেবে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার, মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রীর মুকুল সাংমা, কংগ্রেসের জোটসঙ্গী তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় সহ প্রতিবেশি বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতীয় রাজ্যগুলির মুখ্যমন্ত্রীদের নাম থাকলেও রাজ্যের স্বার্থের প্রশ্ন তুলে শেষ মুহূর্তে সফর বাতিল করেন তিনি। এর পরের ঘটনা সকলেরই জানা। হিমঘরে চলে যায় তিস্তা চুক্তি। এরপর তৎকালীন কংগ্রেস জোট সরকার অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও সেই ক্ষত মেরামত করতে সমর্থ হয়নি।
গত চার বছরে তিস্তা দিয়ে অনেক পানি অতিবাহিত হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসও তাদের অবস্থান বদল করেছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে আন্তর্জাতিক ভাষা শহীদ দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বাংলাদেশ সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে ছিটমহল বিনিময় ও তিস্তা সমস্যা সমাধানের বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকার উদ্যোগ নেবে বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন মমতা।
পরবর্তীতে মমতা সম্মতি দেওয়ায় গত সপ্তাহেই ভারত-বাংলাদেশ ৪১ বছরের পুরোনা স্থলসীমান্ত সীমান্ত চুক্তি সংশোধনী বিল পাশ হয়েছে দেশটির সংসদে। তাই মমতা ছাড়া যে বাংলাদেশের সঙ্গে কোন চুক্তিই যে কার্যত একপ্রকার অসম্ভব তা মোদিও ভাল বোঝেন। তাছাড়া ভারতের মতো যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় অঙ্গরাজ্যগুলির মতামতো নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। তাই মমতাকে এবার তার সফর সঙ্গী করার জন্য মনে প্রাণে চাইছেন প্রধানমন্ত্রী।
গত মঙ্গলবারই কলকাতায় গিয়ে দেশটির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংও গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন ‘বাংলাদেশের সঙ্গে খুব শিগগির আমরা তিস্তা চুক্তি সেরে ফেলতে চাই। আমরা আশা করব পশ্চিমবঙ্গ সরকার আমাদের এই ইস্যুতে পূর্ণ সহযোগিতা করবে। সুষ্ঠু ভাবে বিষয়টি নিয়ে একটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার এবং বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে’।
রাজনাথের ওই বক্তব্যের পরই তৃণমূলের তরফে দলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায় জানান ‘রাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা না করেই তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে রাজনাথ তাঁর নিজের বক্তব্য পেশ করেছেন’। স্বাভাবিকভাবেই দলের এই মন্তব্যের পরই মমতার ঢাকা সফর নিয়ে এক ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়। এমনও শোনা গিয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী নাকি তার ঘনিষ্ঠ মহলে জানিয়েছেন, ‘দুই দেশের মধ্যে স্থলসীমান্ত চুক্তি সংক্রান্ত সংশোধনী বিলে সমর্থন জানিয়ে ‘তিনি তার কাজ সেরে ফেলেছেন। তিস্তা নিয়েও ওরা একাই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। অতএব প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়ে তার আর ঢাকার উদ্যেশ্যে পাড়ি দেওয়ার কোন প্রয়োজনীয়তা নেই।’ তবে শেষ পর্যন্ত বৃহস্পতিবার বিকেলে সমস্ত ধোঁয়াশার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন মমতা।
নয়াদিল্লি প্রতিনিধি
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।




Leave a Reply