নয় মাসের সন্তান থাকার পরও আরেকটি ‘সন্তান প্রসবের’ ভুল খবর প্রকাশিত হওয়া নিয়ে যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে, তা নিয়ে সমাজে সন্মানহানির আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন হামিদা ও তার পরিবার। গাজীপুরের কালিয়াকৈরের বিশ্বাসপাড়ায় হামিদা আক্তারের সন্তান প্রসবের মিথ্যা সংবাদে দৈনিক প্রথমআলোকে দোষী সাব্যস্ত করে আদালত এক লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু ক্ষতিপূরণই কি সব? দরিদ্র কর্মজীবী এই পরিবারেরও তো সমাজ রয়েছে; যেখানে এখন প্রতিনিয়তই কানাঘুষা ও আড়ালে অপমানের বোঝা বইতে হচ্ছে। হামিদার ভাই দিনমজুর লাল মিয়া বললেন, “এই যে প্রচার হয়েছে, সেটা দেখে দেশের মানুষ নানা কথা বলছে। এটা ইজ্জতের সমস্যা না?”
কারখানায় কাজের সময় হামিদা আক্তারের অপরিণত গর্ভপাতকে ‘সন্তান প্রসব’ উল্লেখ করে দৈনিক প্রথম আলো সংবাদ প্রকাশ করলে তা দেখে গত ১০ মে উচ্চ আদালতের একটি বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বিষয়টি তদন্ত করতে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছিল, তলব করা হয়েছিল কারখানার কর্মকর্তাদের। নির্দেশ পেয়ে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তদন্ত করে এপেক্স ফুটওয়্যার কারখানায় ওই ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেন। ভুল সংবাদ প্রকাশ করায় হামিদা আক্তারকে এক লাখ টাকা দিতে প্রথম আলোকে নির্দেশ দেয় উচ্চ আদালত।
হামিদার ভাই লাল মিয়া বলেন, “বাড়িয়ে বাড়িয়ে লিখে আমাদের খুব ক্ষতি করে ফেলেছে। আমরা বিচার চেয়েছিলাম। বিচার পেয়েছি।” তবে ভুল প্রতিবেদন হওয়ায় যেটা হয়নি, সেটা এখন অনেক মানুষ বলবে বলে মন্তব্য লাল মিয়ার।
হামিদাকে নিয়ে গত ১০ মে দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত সংবাদের শিরোনাম ছিল ‘ছুটি মেলেনি, কারখানার টয়লেটে সন্তান প্রসব’। হামিদার পরিবার মিডিয়ার ভূমিকায় এতটাই ক্ষেপেছেন যে, মিডিয়া ‘বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে’ উল্লেখ করে পরদিন থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন।
মা দিবসে নারী শ্রমিককে নিয়ে ওই সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। প্রতিবেদনটি দেখে সেদিনই আদালত আদেশ দিলে ১৩ মে প্রথম আলো ভুল স্বীকার করে জানায়- “প্রকৃতপক্ষে কারখানার ওই নারী কর্মী ছুটি চাননি। তিনি সন্তান প্রসব করেননি, গর্ভপাত ঘটেছিল।”
কারো নামোল্লেখ না করে কারখানা শ্রমিক ও কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, কর্তৃপক্ষ ছুটি না দেওয়ায় ওই নারী শ্রমিক কারখানার টয়লেটে সন্তান জন্ম দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা তা ছিল না।
হামিদার গর্ভপাতের পরপরই শফিপুরের খাজা বদরুদ্দোজা মডার্ণ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানকার সহকারী ব্যবস্থাপক সুমন বলেন, “আলট্রাসনো প্রতিবেদনে দেখা গেছে, হামিদা আক্তারের ১৬ সপ্তাহের অপরিণত গর্ভপাত ঘটেছে। এটাকে কোনভাবেই সন্তান প্রসব বলা যায় না।”
লাল মিয়া বলেন, “এই রিপোর্ট করার আগে আমাদের সঙ্গে কথা বলা উচিৎ ছিল। আমরা গরিব মানুষ, কাজ করে খাই। আমাদের নিয়ে বাড়াবাড়ি লিখে মানুষের কাছে ছোট করার মানে আছে?”
ভুল প্রতিবেদনের জন্য প্রথম আলোর আলোর অর্থ গোনার ঘটনা এবার প্রথম হলেও এর আগে একাধিকবার ভুল প্রতিবেদন করে তা নিয়ে হৈচৈ শুরু হলে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে মাফ চাওয়া হয়েছে। তিরস্কারও শুনতে হয়েছে আদালতের।
গত বছরই আদালত অবমাননার জন্য সংবাদপত্রটি দোষী সাব্যস্ত হলে ক্ষমা চেয়ে রেহাই নিয়েছিলেন এর সম্পাদক মতিউর রহমান। তবে শাস্তি পেতে হয় প্রথম আলোর সাংবাদিক মিজানুর রহমান খানকে। এর আগে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় একটি কার্টুন প্রকাশ নিয়ে সমালোচনার মুখে বায়তুল মোকাররম মসজিদের খতিবের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন মতিউর রহমান।
মিডিয়া ডেস্ক
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম



Leave a Reply