স্যাটেলাইট চ্যানেল ও ইন্টারনেটসহ আকাশ সংস্কৃতির মাধ্যমে পর্নোগ্রাফির অবাধ বিস্তার ধর্ষণ বৃদ্ধির নেপথ্যে বিশেষ ভূমিকা রাখছে বলে মন্তব্য করেছেন সমাজবিজ্ঞানী, অপরাধ বিশ্লেষক, শিক্ষক, পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে স্মার্ট ফোনের বদৌলতে কিছুই আর হাতের নাগালের বাইরে থাকছে না। আগে তবুও ভিসিআরের শরণাপন্ন হতে হতো। তাই পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতাকেই এর পেছনে দায়ী করার সময় এসেছে। পাশাপাশি ধর্ষণের ঘটনায় অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া, সামাজিক অবক্ষয়, মানবিক গুণাবলিসমৃদ্ধ শিক্ষা ব্যবস্থার অভাবের কারণেই মূলত এসব অপরাধ বাড়ছে।
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে দিন দিন বাড়ছে ধর্ষণের ঘটনা। চলন্ত গাড়ি, ভাসমান নৌকা, কর্মস্থল, বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থানে প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে এসব ঘটনা। ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন শিশু থেকে পঞ্চাশোর্ধ্ব নারী। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন বলছে, আগের মাসগুলোর তুলনায় চলতি মাসে ধর্ষণের মতো গর্হিত অপরাধ আশংকাজনক হারে বেড়েছে। এ ব্যাপারে জরুরি ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে এটি ভয়াবহ এক সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিতে পারে বলে আশংকা বিশেষজ্ঞদের।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্ষণের ঘটনা প্রতিরোধে আইনশৃংখলা বাহিনীর পাশাপাশি দলমত নির্বিশেষে সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। দায়িত্ব নিয়ে গড়ে তুলতে হবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। অপরিচিত অথবা স্বল্প সময়ের পরিচিত, ফোন বা ফেসবুকে পরিচিত লোকজনের সঙ্গে কোথাও না যাওয়ার জন্য নারীদের প্রতি পরামর্শ দিয়েছেন তারা। এ ছাড়া কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শপিং মল ও যানবাহনে দু-তিনজন নারী একসঙ্গে থাকার চেষ্টা করতে হবে। আর নিকটস্থ থানা-পুলিশের ফোন নম্বর মোবাইল ফোনে সংরক্ষণ করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ ছাড়া ধর্ষণ প্রতিরোধে সরকারের প্রতি বেশকিছু সুপারিশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- বিদ্যমান আইনের সংস্কার, আইনের যথাযথ প্রয়োগ, পুলিশের আলাদা তদন্ত ইউনিট গঠন, ধর্ষকদের শাস্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কাউনন্সিলিংয়ের জন্য একজন মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ দেয়া।
মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ১৫৮টি ধর্ষণের ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৩৩, ফেব্রুয়ারিতে ৪৪, মার্চে ৪০ ও এপ্রিলে ৪১টি। এ ছাড়া চলতি মাসে এ পর্যন্ত ৬৮টি ধর্ষণের ঘটনার সংবাদ দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে শিশু ধর্ষিত হয়েছে ৭, কিশোরী ২০, স্কুল ও কলেজের ছাত্রী ২৫, গৃহবধূ ১০, গৃহপরিচারিকা ১ এবং গার্মেন্ট শ্রমিক, শ্রমিক ও শপিং মলের বিক্রয়কমী ৬ জন।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০১৪ সালে ৭০৭ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ৬৮ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষণের অপমান সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন ১৩ জন নারী।
বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মুহিত কামাল এ প্রসঙ্গে বলেছেন, নারী নির্যাতন যুগে যুগে ছিল এখনও আছে। কিন্তু এখন সেটা বেড়েছে। ধর্ষণের অন্যতম কারণ প্রবৃত্তিগত তাড়না। এর মোটিভ হচ্ছে প্রবৃত্তির ওপর অনিয়ন্ত্রণ। আমরা সব সময় ধর্মীয় অনুশাসন, সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক মূল্যবোধের কথা বলি কিন্তু বর্তমানে ধর্ষণের যেসব ঘটনা ঘটছে তার নেপথ্যে বৈশ্বিক (গ্লোবাল) সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। এখন ইন্টারনেটে সর্বাধিক হান্টিং হয় পর্নো ওয়েবসাইটগুলো। সেখানে পেশাদার মেয়েদের কার্যকলাপ, তাদের বেপরোয়া যৌনক্রিয়ার চিত্র আমাদের তরুণদের মনে গেঁথে যাচ্ছে। তরুণ যুবকরা পর্নোছবিতে যেসব দৃশ্য দেখছে; তার আবেগের মধ্যে সেই উপলব্ধি উপস্থিত হচ্ছে। যারা তার বোন, যারা তার মা হতে পারে তাদের ওই সব তরুণ সেভাবে শ্রদ্ধার চোখে দেখতে পারছে না। ফলে তারা হিংস্র হয়ে উঠছে এবং ধর্ষণের মতো গর্হিত অপরাধ ঘটাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট সমাজ বিজ্ঞানী ড. সাদেকা হালিম বলেন, নারী নির্যাতন বা ধর্ষণ নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু বর্তমানে যে ধারা চালু হয়েছে চলন্ত গাড়িতে ধর্ষণ, ট্রাকে ধর্ষণ সেটা ভারত এবং উন্নত বিশ্বে আগে দেখা গেছে। এখন এটা আমাদের সমাজেও শুরু হয়েছে। গণমাধ্যমের বদৌলতে আমরা সেসব খবর জানতে পারছি। এক জরিপে দেখা গেছে, উন্নত বিশ্বেই ৫৪ শতাংশ নারী রিপোর্ট করেন না। বাংলাদেশেরও অনেক রিপোর্ট গণমাধ্যমে আসছে না। অনেকে পুলিশের কাছেও যাচ্ছেন না।
সাদেকা হালিম বলেন নারীদের প্রতি পরামর্শ হিসেবে বলেন, কাউকে না কাউকে তো বিশ্বাস করতেই হবে। বিশ্বাসের পাশাপাশি নারীদের উচিত সচেতনভাবে চলাফেরা করা। অফিস বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বের হলে ২-৩ জন এক সঙ্গে চলতে হবে। কাছের থানা, থানার ওসি, র্যাবের দফতরের ফোন নম্বর রাখতে হবে। যাতে কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে অবগত করা যায়। নারীদের কারাতেসহ মৌলিক কিছু প্রশিক্ষণও নিয়ে রাখা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
বিশেষ প্রতিনিধি
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।



Leave a Reply