মঙ্গলবার ৩ নভেম্বর ২০২৬

মেয়র-চেয়ারম্যান বরখাস্তের রেকর্ড: এ পর্যন্ত ৫০

Cartoon-cahirmanবিভিন্ন সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য দলগুলোর নির্বাচিত জন প্রতিনিধিদের নানা অজুহাতে বরখাস্ত করে চলেছে সরকার। এসব নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বরখাস্তের মাধ্যমে সরিয়ে সে স্থানে বসানো হচ্ছে সরকারি দল আওয়ামী লীগের নেতাদের।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পৌরসভা আইন ২০০৯-এর ৩১ ও ৩২ ধারা অনুযায়ী, পৌর মেয়রদের বিরুদ্ধে কোনো মামলার চার্জশিট হলে তাকে বরখাস্ত ও অপসারণ করা যাবে। বিরোধী দল সমর্থিত স্থানীয় সরকার বিভাগের অন্যতম ধাপ পৌর মেয়রদের বিরুদ্ধে ওই ধারা আইনী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি।

সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত জনপ্রতিনিধি বরখাস্তের সংখ্যা ৫০ ছাড়িয়েছে। এদের মধ্যে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত সিটি করপোরেশনের মেয়র, পৌর মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান রয়েছেন। বরখাস্ত এ সব জনপ্রতিনিধিদের বাইরেও অনেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন।

সিটি করপোরেশন থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতার বা বরখাস্তের যে খড়গ নেমে এসেছে তা রেকর্ড সংখ্যক বলেও অনেকে মন্তব্য করছেন। রাজনৈতিকভাবে হেয় করতেই বিরোধী দল সমর্থিত জনপ্রতিনিধিদের ওপর এ ধরনের খড়গ নামানো হচ্ছে বলেও বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে।

২০০৯ সালে প্রণীত স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় (সিটি করপোরেশন) আইনে বিরোধী দল সমর্থক মেয়র, কাউন্সিলর, উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান এবং পৌরসভার মেয়রদের নিয়মিত বরখাস্ত করা হচ্ছে। ২০০৯ সালের প্রণীত আইনের ধারা ১২-এর ১ উপধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো সিটি করপোরেশনের মেয়র বা কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলায় অভিযোগপত্র গৃহীত হলে সরকার নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে পরামর্শক্রমে লিখিত আদেশের মাধ্যমে ওই মেয়র বা কাউন্সিলরকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করতে পারবে।’

গত ২৫ মে ২০১৫ নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ একরামুল আলম এবং নলডাঙ্গা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেনকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের উভয়ের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা থাকায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব স্বাক্ষরিত আদেশে এ দুই বিএনপি নেতাকে উপজেলা চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

গত সোমবার নাটোরের জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে পাঠানো বরখাস্তের আদেশ বড়াইগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল আলমের হাতে পৌঁছে। এই অপসারণের বিরুদ্ধে তিনি আইনী লড়াইয়ে আদালতে যাবেন বলে জানান।

এর আগে বরখাস্ত করা হয় রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র বিএনপি নেতা মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে। তার আগে সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে বরখাস্ত করা হয়। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র অধ্যাপক আবদুল মান্নানের স্থলে প্যানেল মেয়র আসাদুর রহমানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ভাল নেই খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের মেয়র মনিরুল হক সাক্কু।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমদ এ বিষয়ে বলেন, ‘সিটি করপোরেশন থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতার বা বরখাস্তের যে খড়গ নেমে এসেছে, এটা স্মরণাতীত কালের রেকর্ড। অতীতে এমনটি হয়েছে বলে আমার জানা নেই।’

সরকারি সূত্রে জানা যায়, হরতাল-অবরোধে গাড়ি পোড়ানোর মামলায় সিটি করপোরেশন, পৌর মেয়র-কাউন্সিলর ও উপজেলা চেয়ারম্যান এবং ভাইস চেয়ারম্যানদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মামলার কারণে এ সব জনপ্রতিনিধিদের অনেকে পালিয়ে বেড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। এ সুযোগে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন প্যানেল মেয়রের তালিকায় থাকা আওয়ামী লীগ দলীয় নেতারা।

এই আইনের বলে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ এক প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে তাকে বরখাস্ত করে।

চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হয়। সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া হত্যা মামলায় অভিযুক্ত হয়ে তিনি বর্তমানে কারাগারে।

এর আগে একই মামলায় অভিযুক্ত বর্তমানে কারারুদ্ধ হবিগঞ্জ পৌরসভার মেয়র জি কে গউছকেও বরখাস্ত করে সরকার। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, সাবেক মন্ত্রী ও বর্তমানে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত প্রতিষ্ঠাতা মেয়র অধ্যাপক এম এ মান্নানকে চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বারিধারার বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়। এম এ মান্নানের বিরুদ্ধে দু’টি মামলার অভিযোগপত্র এরই মধ্যে দাখিল করা হয়েছে।

২০১৪ সালের ২২ ডিসেম্বর পাবনা জেলা জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ও আটঘরিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মাওলানা জহুরুল ইসলাম খানকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়।

গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর নলছিটি পৌরসভার নির্বাচিত মেয়র ও বিএনপি নেতা মো. মজিবুর রহমানকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে দ্বিতীয় দফায় বরখাস্ত করা হয়।

ওই বছরের ১৮ নভেম্বর বরখাস্ত করা হয় গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মাজেদুর রহমান ও ভাইস চেয়ারম্যান আবু সোলায়মান সরকার সাজুকে।

ডিসেম্বরে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবু নছর মোহাম্মদ আলমগীর হুসাইনকে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের পদ থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়।

এ ছাড়া ২০১৪ সালের ১৩ নভেম্বর বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলা জামায়াতের আমীর নুরুল ইসলামকে উপজেলা চেয়ারম্যান পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। নাশকতার কয়েকটি মামলায় চার্জশিট হওয়ায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এ সিদ্ধান্ত নেয়।

রাজশাহীর চারঘাট উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আবু সাঈদ চাঁদকে চেয়ারম্যান পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

২০১৪ সালের ৮ অক্টোবর গাইবান্ধা সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল করিমকে ও পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মুক্তারুল হক মকুকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

মামলার ফাঁদে ধুনট উপজেলা চেয়ারম্যান তৌহিদুল আলম মামুন, বগুড়া সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আলী আজগর তালুকদার হেনা ও সোনাতলা উপজেলা চেয়ারম্যান আহসানুল তৈয়ব জাকির পলাতক রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে হরতাল-অবরোধে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন ‘নাশকতা’ মামলা রয়েছে।

গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলা চেয়ারম্যান আবু কাউসার মো. নজরুল ইসলাম ও ভাইস চেয়ারম্যান আবু তালেব সরকারকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার চেয়ারম্যান সরওয়ার জাহান চৌধুরী ও ভাইস চেয়ারম্যান সুলতান মাহমুদ চৌধুরীকে বরখাস্ত করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। গত বছর ২০ অক্টোবর সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আবদুর রউফকে শহরের মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের সামনে থেকে গ্রেফতার করা হয়।

লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ মাস্টার আদালতে একটি মামলার হাজিরা দিতে গিয়ে আটক হন। তার বিরুদ্ধে দোকানপাট ভাঙচুরের অভিযোগে মামলা দায়ের করে কালীগঞ্জ থানা পুলিশ।

রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের কাছে শপথ নিতে গিয়ে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন তিন উপজেলা চেয়ারম্যান ও দুই ভাইস চেয়ারম্যান। তারা হলেন—পঞ্চগড়ের আটোয়ারি উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুর রহমান আবদার, ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান, বোদা উপজেলা চেয়ারম্যান শফিউল আলম শফি, রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলা চেয়ারম্যান গোলাম রাব্বানী ও ভাইস চেয়ারম্যান আবদুর বাসেত সাজ্জান।

পবিত্র হজ ও তবলীগ জামাত নিয়ে সরকারের ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর বক্তব্যের প্রতিবাদে যশোরে এক মানববন্ধনে হামলার ঘটনায় দু’টি মামলা দায়ের হয়। এতে যশোর পৌরসভা মেয়র মারুফুল ইসলাম, কেশবপুর পৌরসভার মেয়র আবদুস সামাদ বিশ্বাস, মনিরামপুর পৌরসভার মেয়র শহীদ ইকবাল, বাঘারপাড়া পৌরসভার মেয়র আবদুর রহিম মনা, কাউন্সিলর হাজী আনিসুর রহমান মুকুলসহ বেশ কয়েকজনকে আসামি করা হয়। তাদেরও পরবর্তী সময়ে মন্ত্রণালয় থেকে পত্র পাঠিয়ে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *