সরকার বড় আকারের বাজেট করতে গিয়ে বেশি মাত্রায় ঋণনির্ভর হয়ে পড়ছে। এতে বাড়ছে ঋণের পরিমাণ। বর্তমানে এর পরিমাণ বেড়ে সাড়ে ৭১ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে- যা মোট বাজেটের প্রায় ২৮ শতাংশ। এই মাত্রাতিরিক্ত ঋণ সরকারের জন্য এক ধরনের ফাঁদ তৈরি করেছে। এই ফাঁদে পড়ে বেড়ে যাচ্ছে মূল ঋণ ও ঋণের সুদ পরিশোধের পরিমাণ। গত পাঁচ বছরে ঋণ ও সুদ পরিশোধে খরচ হয়েছে গড়ে মোট বাজেটের ২২ থেকে ২৫ শতাংশ অর্থ- যা বর্তমান বাজেটের প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা, যা দিয়ে অনায়াসে দুটি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব। এই ঋণের একটি বড় অংশই সরকারের অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হচ্ছে। যা দেশের মানুষের ওপর ঋণের বোঝা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, বাজেটের ঋণের বোঝা এভাবে বাড়তে থাকলে এক সময়ে মূল বাজেটের অর্ধেকের বেশি চলে যাবে ঋণ ও সুদ পরিশোধে। ফলে বাজেট বাড়বে, কিন্তু তা জনকল্যাণে ব্যবহৃত না হয়ে ব্যয় হবে অনুৎপাদনশীল খাতে- যা মূল্যস্ফীতির হারকে উস্কে দেবে। ঋণ নিলে তা অবশ্যই উৎপাদন খাতে ব্যবহার করতে হবে। নয়তো ঋণ কমাতে হবে। তা না হলে বাজেটের শৃংখলা রক্ষা করা যাবে না।
সূত্র জানায়, বাজেটে ঋণের বোঝা বেড়ে বর্তমানে নতুন ঋণের পরিমাণ আগের ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের প্রায় কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। ঋণের অংক বাড়তে থাকলে হয়তো অচিরেই এটি সমান সমান হয়ে যাবে। এই ধরনের হলে ঋণভারে আক্রান্ত হয়ে পড়বে বাজেট।
চলতি অর্থবছরের এখন পর্যন্ত সরকার আগের বছরের ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করেছে। কিন্তু সংশোধিত বাজেট সমন্বয় করতে গিয়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেড়ে যাচ্ছে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ। সঞ্চয়পত্র বেশি পরিমাণে বিক্রি হওয়ায় এ খাতেও ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। আর ব্যাংক ঋণের চেয়ে সঞ্চয়পত্রের ঋণের সুদ অনেক বেশি। ফলে সরকার চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে। কেননা, গ্রাহকদের সঞ্চয়ে উৎসাহিত করতে সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রিকে উৎসাহিত করছে। ফলে এই খাতে ঋণের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই। এ খাত থেকে ঋণ কমাতে সম্প্রতি সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানো হয়েছে।
তবে গত কয়েক বছরে সরকারের বৈদেশিক ঋণনির্ভরতা কমে এসেছে। একই সঙ্গে কমছে অন্যান্য খাতের ঋণের পরিমাণও।
এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন অর্থনীতিবিদ জানান, সরকারকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সব সময়ই ঋণের পরিমাণ কমাতে বলা হয়। এখন সরকার ব্যাংক ঋণ কম দিলেও সঞ্চয়পত্র থেকে বেশি ঋণ নিচ্ছে। এটি সরকারের ঋণের খচর বাড়িয়ে দিচ্ছে- যা আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য ক্ষতিকর। তিনি বলেন, ঋণের অংক বাড়লেও মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকারও বাড়ছে। ফলে জিডিপির হিসাবে ঋণ খুব বেশি বাড়ছে না। এটি সাড়ে ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে। ঋণের টাকা উৎপাদন খাতে ব্যবহৃত হলে ক্ষতির কারণ নেই।
সূত্র জানায়, এ সরকারের শুরুর দিকে ২০০৯-১০ অর্থবছরে বাজেটে ঋণের পরিমাণ ছিল ৩০ হাজার কোটি টাকা। এখন তা বেড়ে হয়েছে ৭১ হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে ঋণ শোধের খরচও ১৭ হাজার থেকে বেড়ে এখন হয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে ঋণের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ৬১ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা। বছর শেষে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭১ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা। অর্থবছরের শুরু থেকে শেষ সময়ে এসে ঋণ বেড়েছে ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণ নেয়ার কথা ছিল ১৮ হাজার ৬৯ কোটি টাকা। নেয়া হচ্ছে ১৫ হাজার ৪২২ কোটি টাকা- যা প্রায় ২ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকা কম। ব্যাংক থেকে নেয়ার কথা ছিল ৩১ হাজার ২২১ কোটি টাকা। নেয়া হচ্ছে ৩২ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা। এর পরিমাণ বাড়ছে ১ হাজার ২১১ কোটি টাকা। সঞ্চয় প্রকল্প থেকে ৯ হাজার ৫৬ কোটি টাকা নেয়ার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে নেয়া হচ্ছে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি। অন্যান্য খাত থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। এর কাছাকাছি থাকছে। ঋণ ও সুদ পরিশোধের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৯ হাজার ৪০১ কোটি টাকা। সঞ্চয়পত্র থেকে বেশি নেয়ার কারণে এর পরিমাণও বেড়ে ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। ফলে মোট বাজেটের প্রায় ২৪ শতাংশ খরচ হবে এ খাতে।
২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেটে সরকারের ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪৮ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে এর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। বেড়েছে প্রায় ১১ শতাংশ।
২০১২-১৩ অর্থবছরে সরকারের ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৬ হাজার ২৪ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকায়।
২০১১-১২ অর্থবছরে সরকারের ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪০ হাজার ২৬৬ কোটি টাকা। বছর শেষে নেয়া হয়েছে ৪১ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৩ শতাংশ।
নিজস্ব প্রতিবেদক
নিউজওয়ার্ল্ডিবিডি ডট কম।



Leave a Reply