সাব্বাহ্ আলী খান কলিন্স॥
গণমানুষের জন্য, সততার জন্য ও আদর্শের জন্য সবাই রুখে দাঁড়াতে পারেন না। মানুষের উন্নত স্বার্থে সোচ্চার হওয়ারও হিম্মৎ সবাই রাখেন না। জীবনের পরোয়া না করে যিনি তা পারেন— তিনি তো সাহসী বীর, গণমানুষের শ্রদ্ধার মণিকোঠায় উজ্জ্বল তারকা। তেমনই একজন সাহসী বীর জামিল আকতার রতন।
মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন হলেও পরাজিত শক্তি আমাদের স্বাধীনতা কখনো মেনে নিতে পারেনি। ’৭১ সালের পর থেকে আজ অবধি মওদুদীর উত্তরসূরী জামাত ও তাদের ছাত্র সংগঠন শিবির মুক্তিযুদ্ধের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেশী-বিদেশী অস্ত্র গচ্ছিত করে অস্ত্রাগার গড়ে তোলে। সেই অস্ত্রে শিবির-জামাত মিলিতভাবে প্রগতিবাদী, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও মুক্তবুদ্ধির চর্চাকারী অসংখ্য ছাত্র-শিক্ষকদের হত্যা করে এবং এখনও তাদের এই বর্বর কর্ম অব্যাহত রয়েছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি ৫ম বর্ষের মেধাবী ছাত্র শহীদ জামিল আকতার রতনকে এই খুনী জামাত-শিবির চক্র টার্গেট করেছিল। কারণ— শহীদ জামিল যেমন মেধাবী ছিলেন, তেমনি ছিলেন ছাত্র-ছাত্রীদের অধিকার প্রশ্নে সোচ্চার, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও রাষ্ট্র নির্মাণের এক অকুতোভয় সৈনিক। কোনো লোভ-লালসায় তাঁকে দমানো সম্ভব ছিল না— কারণ, তিনি ছিলেন সাহসী ও আদর্শবাদী ছাত্র। এ ছাড়া স্বৈরাচার এরশাদ আমাদের দেশকে সাম্প্রদায়িক দেশ বানানোর চেষ্টায় রাষ্ট্রধর্ম বিল আনলেন তার বিরুদ্ধে সারাদেশ যখন প্রতিবাদে সোচ্চার, যার থেকে বাইরে ছিল না রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ছাত্র-শিক্ষকরাও। যার নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন রাজশাহী মেডিকেলের জনপ্রিয় ছাত্রনেতা শহীদ জামিল আকতার রতন।
কিন্তু ওই খুনীচক্র বসে থাকেনি। সেদিন ছিল ১৯৮৮ সালের ৩১ মে। মওদুদী মতবাদী ’৭১-এর পরাজিত সাম্প্রদায়িক ও খুনী জামাত-শিবির চক্র একাডেমিক কাউন্সিলের ৩৫ জন শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীদের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে মধ্যযুগীয় কায়দায় হাত-পায়ের রগকেটে জামিল আকতার রতনকে নির্মমভাবে হত্যা করে। ওই হত্যাকারী জামাত-শিবিররা মুক্তিযুদ্ধের শত্রু অসাম্প্রদায়িকতার শত্রু, মানবতার শত্রু, প্রগতির শত্রু। এই শত্রুদের চিরতরে পরাজিত করতে হবে।
এই ধর্ম ব্যবসায়ী খুনীরা একাত্তরে ৩০ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছিল। পাকিস্তান বাহিনীকে সহযোগিতার জন্য রাজাকার-আলবদর, আলশামস বাহিনী গড়ে তুলেছিল। বরাবর জামাত-শিবির চক্র রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে আর খুনের নেশায় মত্ত থেকেছে। এই খুনীরাই এরশাদের সহযোগিতা নিয়ে খুন করেছে এবং খালেদা জিয়ার সাথে গাঁটছড়া বেঁধে খুন করেছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অসংখ্য প্রগতিবাদী মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিশ্বাসী ছাত্র-শিক্ষককে। কিছুদিন আগেও যখন দেশবাসী দেখল— পেট্রোলবোমা মেরে মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করতে। এরা কারা? এরা আর কেউ না শহীদ জামিলের খুনী সেই জামাত-শিবির চক্র।
শহীদ জামিলের ২৭তম শহীদ দিবসকে সামনে রেখে দৃঢ় চিত্তে বলতে চাই, আসুন অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক রাজনীতি এগিয়ে নিতে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় কোটি বাঙালী পরাজিত খুনী জামাত-শিবির ও সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে ইস্পাত দৃঢ় ঐক্য গড়ে তুলি। সোচ্চার হই এই নরপশু খুনীদের রাজনীতির দল জামাত-শিবির নিষিদ্ধের দাবীতে।
মৌলবাদী রাজনীতি জামাত-শিবিরের নেতাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী রাজাকার-আলবদর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলমান রায় হয়েছে কার্যকরও হচ্ছে। তবে ধীর গতিতে। অথচ জামাত-শিবির নিষিদ্ধের দাবী জনগণের। জনগণের রায় জামাত-শিবির নিষিদ্ধ হোক। নামে-বেনামে গড়ে তোলা আর্থিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয়করণ— জনগণের দাবী। দাবী বাস্তবায়নে সরকারের উদাসীনতা জনগণ হতাশ হচ্ছে। আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, হিজবুত তাহরীর নিষিদ্ধ করা গেলে জামাত-শিবির নিষিদ্ধ হচ্ছে না কেন? জনমনে এই প্রশ্ন আজ, আর এই প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্রকেই দিতে হবে। উত্তর পেতে দেরী হলে মাসুল দিতে হতে পারে। জনগণ আর কোনো মাসুল দিতে চায় না।
শহীদ জামিলের চেতনা ও আদর্শ জাগরুক থাকুক কোটি বাঙালীর প্রাণে। জয় হোক অসম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক রাজনীতি, জয়তু শহীদ জামিল আকতার রতন।
লেখক : সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ যুব মৈত্রী ও সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী



Leave a Reply