মঙ্গলবার ৩ নভেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশি বিদ্বেষী আসামে বাড়ছে মুসলিম দলের প্রভাব

AIUDF-badruddin২০০৫ সালে অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এআইইউডিএফ) প্রতিষ্ঠার সময় কংগ্রেস নেতা ও আসামের মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ বলেছিলেন, ‘বদরুদ্দিন আজমল কে?’ ওই ঘটনার ১০ বছর পর গত ১২ এপ্রিল, বোরোল্যান্ড টেরিটোরিয়াল কাউন্সিলের চারটি আসনে জয়লাভ করে এআইইউডিএফ। সেখানে আসাম রাজ্যের ক্ষমতাসীন কংগ্রেস কোনো আসন পায়নি। এরপর নওগাঁও জেলার ধাইংয়ে এক সমাবেশে এআইইউডিএফের প্রধান মাওলানা বদরুদ্দিন আজমল বলেন, ‘তরুণ গগৈ কে?’

তরুণ গগৈকে আজমলের পাল্টা জবাব দেওয়ার সাহস আসামের রাজনীতির নতুন শক্তির আগমনের আভাস দেয়। রাজ্যের ৪০ সদস্যের কাউন্সিলে চারটি আসন যত না গুরুত্বপূর্ণ, এর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এআইইউডিএফের স্ট্রাইক রেট। মাত্র আটটি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল এআইইউডিএফ, যার চারটিতে মুসলিম ও চারটিতে বোরো সম্প্রদায়ের প্রার্থী ছিল। নির্বাচনে দুজন মুসলমান ও দুজন বোরো প্রার্থী জয়লাভ করেন। অন্যদিকে ৩৫টির বেশি আসনে প্রার্থী দিয়ে কংগ্রেস কোনো আসন পায়নি, বিজেপি মাত্র একটি আসন পেয়েছে।

বোরোল্যান্ড টেরিটোরিয়াল এরিয়া ডিস্ট্রিক্ট (বিটিএডি) মুসলিম অভিবাসীদের সঙ্গে বোরোদের সংঘর্ষ যেন মহামারি। সেখানে এআইইউডিএফের জয়লাভ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর কারণ আজমল নিজেকে ‘মহান সংঘর্ষ নিবারক’ হিসেবে উপস্থাপন করতে পেরেছেন।

জন্ম আসামে হলেও মুম্বাইয়ে ব্যবসা করেন আজমল। তাঁর বস্ত্র, রিয়েল এস্টেট, চামড়া, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সুগন্ধীর ব্যবসা রয়েছে। আজমলের নজর এখন আগামী বছরের বিধানসভার নির্বাচনের দিকে।

গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক ননী গোপাল মহান্তের মতে, কংগ্রেস বা বিজেপি কেউই পরিষ্কার সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। আগামী বছর আজমল অবশ্যই এখানে প্রধান ভূমিকা পালন করবেন।

তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আজমলের বিস্ময়কর উত্থান হয়েছে। ২০০৫ সালে এআইইউডিএফের গঠনের বছরে সুপ্রিম কোর্ট বিতর্কিত অবৈধ অভিবাসী (ট্রাইব্যুনাল দ্বারা নির্ধারিত) আইনটি (আইএমডিটি) বাতিল করে দেয়। আইনটি বাতিল করতে সর্ব আসাম ছাত্র ইউনিয়নের নেতা ও বিজেপির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সর্বানন্দা সোনোয়াল দীর্ঘ আইনি লড়াই চালান। কিন্তু আইনটি অভিবাসীদের প্রতি হয়রানির বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করত। কংগ্রেস সরকার অভিবাসীদের সুরক্ষার জন্য আইনটি করেছিল।

২০১১ সালে তরুণ গগৈ যখন বারাক ভ্যালিতে গিয়ে ‘হিন্দু অভিবাসী’দের সুরক্ষার কথা বলেন, এ সময় মুসলিম অভিবাসীদের রক্ষার জন্য আজমল র‍্যালি করেন। ২০০৬ সালে এআইইউডিএফ ১০টি আসন পেয়েছিল, কিন্তু ২০১১ সালে ১৮টি আসন পেয়ে আসামের রাজনীতিতে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়।

গত ২০ এপ্রিল প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে যেসব বাংলাদেশি আসামে অবৈধভাবে এসেছেন, তাঁদের ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়ার ঘোষণা দেন তরুণ গগৈ। মহান্ত বলেন, ‘আইএমডিটি আইনের রক্ষা না করতে পারা ও বিটিএডিতে গণহত্যার পুনরাবৃত্তি প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হওয়ায় মুসলমানেরা কোনোদিনই কংগ্রেসকে ক্ষমা করবে না।’

বিরোধীদের অভিযোগ, আজমল কেবল একটি সম্প্রদায়ের লোকের স্বার্থ সুরক্ষা করে। আজমল এ দাবি স্রেফ উড়িয়ে দেন। তথ্যও আজমলের পক্ষে কথা বলছে। ২০০৬ সালের নির্বাচনে এআইইউডিএফ ৭৩টি আসনে প্রার্থী দেয়। তাঁদের মধ্যে ৩৮ জনই ছিলেন অমুসলিম। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে দলটির ১১ আসনের প্রার্থীদের মধ্যে ছয়জন ছিলেন অমুসলিম। ওই নির্বাচনে তাঁদের দলের তিনজন বিজয়ী প্রার্থীর একজন হিন্দু। এমনকি দলটির কার্যকরী সভাপতি ড. আদিত্য ল্যাংথাসা একজন আদিবাসী।

গত ২০ এপ্রিল থেকে আসামে শুরু হয় জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন। এ বিষয়ে আজমল বলেন, ‘আসামের ৪০ লাখ মুসলমানকে অবৈধ নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করা ষড়যন্ত্র।’ এর বিরুদ্ধে তিনি আদালতে যাবেন বলেও হুমকি দিয়ে রেখেছেন।

২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নাগরিক নিবন্ধনের সময় বেঁধে দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট। ২০১৬ সালেই আবার বিধানসভা নির্বাচনের সময় চলে আসবে। ২০১১ সালে আসামের আদমশুমারিতে দেখা যায়, রাজ্যে মুসলিম জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ৩৪ দশমিক ২ শতাংশ লোক মুসলিম। এরপরই ধর্মীয় বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মাতামাতি শুরু হয়।

মাওলানা আজমল মুসলিমদের ‘পানি পড়া’ দেন। ওই পানি খেলে সব রোগের নিয়ময় সম্ভব—তাঁর অনুসারীদের এমনটাই বিশ্বাস। আজমল কুসংস্কার ছড়াচ্ছেন—বিরোধীদের এমন দাবির জবাবে তিনি বলেন, ‘সরকার যখন জনগণের জন্য মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ, তখন আল্লার রহমতে আমি কাউকে সহযোগিতা করলে ক্ষতি কী? আমি মানুষকে ধোঁকা দিচ্ছি—এ অভিযোগ নিয়ে তো কেউ আসেননি।’

আজমলের নিন্দুকেরাও কিছু কাজের জন্য তাঁর প্রশংসা না করে পারেন না। রাজ্যজুড়ে অনেক স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন, ট্রাস্ট, বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, এতিমখানা, হাসপাতাল পরিচালনার সঙ্গে তিনি জড়িত। তাঁর কল্যাণেই আসামে দারিদ্র্যপীড়িত মুসলমানের সংখ্যা কম। রাজনৈতিক বিশ্লেষক দিলীপ চন্দন ভবিষ্যদ্বাণী করেন, আজমলের দল ৩০টি আসনে জয়লাভ করতে পারে।

ওয়েব ডেস্ক
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *