বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, রেল ও অবকাঠামো খাতে হাজার কোটি ডলারের বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের জন্য বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম পরাশক্তি চীনের ডজনখানেক প্রস্তাব হাসিনা সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে। চীন সরকার ছাড়াও দেশটির কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত্ব কোম্পানি বাংলাদেশ সরকারের কাছে এসব প্রস্তাব পাঠিয়েছে। কখনও সরাসরি চীনা রাষ্ট্রদূত, আবার কখনও সংশ্লিষ্ট কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরকারের কাছে এসব প্রস্তাব তুলেছেন। কিন্তু অজানা কারণে চীনা এই প্রস্তাবগুলো সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না সরকার। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) অতিরিক্ত সচিব আসিফ-উজ- জামান বলেছেন, চীন বাংলাদেশ সরকারের কাছে একটার পর একটা প্রস্তাব দিয়ে যাচ্ছে। এসব প্রস্তাবের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও অর্থমন্ত্রী যৌথ সিদ্ধান্ত দেবেন।
বর্তমানে দেশের বড় কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্প বিভিন্ন চীনা কোম্পানির হাতে রয়েছে। চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কোম্পানি পদ্মা সেতুর মূল কাঠামো নির্মাণ এবং সিনোহাইড্রো করপোরেশন নদীশাসনের দায়িত্বে রয়েছে। কর্ণফুলীর নদীর তলদেশে ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে দেশের প্রথম টানেল নির্মাণে সম্প্রতি চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানির সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।
পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের বিষয়ে চীনের আগ্রহের কথা আলোচনায় রয়েছে বহু আগে থেকেই। ঢাকা-চট্টগ্রাম ‘হাই-স্পিড’ রেলওয়ে, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল নির্মাণ এবং ইস্টার্ন রিফাইনারি দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপন নিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের আগ্রহের কথা সরকারকে জানিয়েছে।
গত ২০ মে ‘চায়না এয়ারপোর্ট কনস্ট্রাকশন গ্রুপ করপোরেশন’ এরকম একটি প্রস্তাব সরাসরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবরে পৌঁছায়। চীনা এই কোম্পানি তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণসহ ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আধুনিকায়নের কাজ পেতে চায়। বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী তৃতীয় টার্মিনাল, ডোমেস্টিক টার্মিনাল ও কার্গোভিলেজ তৈরিসহ বিমানবন্দরের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণে ১৩০ কোটি ডলার বা ১০ হাজার ১৪০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে বলে তাদের প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
চায়না এয়ারপোর্ট কনস্ট্রাকশন গ্রুপ করপোরেশন বলছে, বাংলাদেশ সরকার রাজি থাকলে তারা চীন সরকারের কাছ থেকে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থাও করে দেবে। প্রকল্পের বাস্তবায়ন হবে তিন বছরে। এরকম আরেকটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে ‘চায়না এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড (জিপিইসি)’। তাদের ওই প্রস্তাব ২১ এপ্রিল বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ে পৌঁছায়। এতে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে জিপিইসি, যার মধ্যে দুটি হবে কয়লাভিত্তিক এবং একটি গ্যাসভিত্তিক। এ প্রকল্পের জন্য চীন থেকে তুলনামূলক কম সুদে দুই দেশের সরকারের আলোচনার ভিত্তিতে ঋণের ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথাও বলেছে তারা। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি ওই প্রস্তাবের অনুলিপি অর্থ মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা, প্রধামন্ত্রীর মুখ্যসচিব ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগেও (ইআরডি) পাঠানো হয়।
চীনা ওই কোম্পানি দিনাজপুরের পার্বতীপুরে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের দুই ইউনিটের একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে চায়। প্রতি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ৬৬০ মেগাওয়াট করে। সরকার চাইলে দেশের অন্য কোনো জায়গায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণেও জিপিইসি রাজি। তারা কয়লাভিত্তিক আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র করার প্রস্তাব দিয়েছে বরগুনায়। সেখানেও ৬৬০ মেগাওয়াটের দুই ইউনিটে উৎপাদন ক্ষমতা হবে মোট ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট।
প্রস্তাবে তৃতীয় প্রকল্প করার কথা বলা হয়েছে মেঘনাঘাট অথবা খুলনায়, যার ক্ষমতা হবে ৭৫০ মেগাওয়াট থেকে ৮৫০ মেগাওয়াট। এ কেন্দ্রটি হবে প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক। জিপিইসি বর্তমানে দেশের শাহজীবাজার ৩৩০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। এছাড়া ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠানটি হাটহাজারি ও দোহাজারিতে ১০০ মেগাওয়াটের দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করেছে।
চীন থেকে আরেকটি প্রস্তাবে আসে গত ফেব্রুয়ারিতে। বাংলাদেশের রেল খাতের উন্নয়নে দেড় থেকে দুই হাজার কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব দেন ঢাকায় চীনা দূতাবাসের শার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স কিউ গুয়ান ঝু। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রস্তাবটি তোলা হয়। ওই প্রস্তাবের খুঁটিনাটি বিশ্লেষণে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শশী কুমার সিংহকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হলেও কোনো সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি।
বিশেষ প্রতিনিধি
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।
১৭০৫ ঘণ্টা, জুন ৩, ২০১৫



Leave a Reply