মঙ্গলবার ৩ নভেম্বর ২০২৬

দিপীকা পড়ুকোন এবং বাংলাদেশে সাংবাদিকতা

Depika-Dhakaঢাকায় গত ৩০ মে ঘুরে গেলেন দিপীকা পড়ুকোন। বলিউডের নায়িকা। লাক্স তাকে নিয়ে এসেছিল, তাই তারা মাতোয়ারা হবেই। কিন্তু তাই বলে সাংবাদিকতাতেও একই অবস্থা। বুঝলাম এটা বিনোদন সাংবাদিকতা। কিন্তু তাই বলে, এভাবে কি সম্ভব। বৃহস্পতিবার দৈনিক প্রথমআলোতে আদর রহমানের একটি লেখা নিয়ে এই প্রশ্নই ঘুরপাক খেয়েছে কিছু মানুষের মধ্যে। এদের মধ্যে একজন লেখক-সাংবাদিক মাহবুব মোর্শেদ। তার ফেসবুক পেজে বৃহস্পতিবার রাতে তিনি লিখেছেন- ‘দোষ শুধু প্রথম আলোর নয়, আমাদের জাতিগত দেউলিয়াপনার একটি উদাহরণ এটি। শেয়ার করে রাখলাম।’

আসলে কী লিখেছিল প্রথমআলো? পড়ে দেখুন।

লেখাটির শিরোনাম এক শব্দের সাক্ষাৎকার!

না, সাংবাদিক হিসেবে দীপিকার মুখোমুখি হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। কাকতালীয়ভাবে তাঁর সামনে পৌঁছানোর সুযোগ হলো যখন, তখন একটি প্রশ্নই করা গেল, তা–ও সাংবাদিকের চোখা প্রশ্ন নয়। কিন্তু তার উত্তরে দীপিকা যা বললেন, তাতেই পরিস্কার হলো, কতোটা বিচক্ষণ তিনি।

প্রশ্নটি ছিল, ‘একবাক্যে বর্ণনা করুন বাংলাদেশী ভক্তদের।’ দীপিকার উত্তরটি যথা সময়েই বলা হবে। তার আগে এই এক প্রশ্নকে ঘিরে ঘটে যাওয়া নাটকীয়তাগুলো জেনে নেওয়া যাক।

২.
পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চি লম্বা এক নায়িকার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। উচ্চতার পার্থক্য কত তা দেখার চেষ্টা চলছে। সামনে বসা হাজারো দর্শক বোঝার চেষ্টা করছেন, আসলে এখানে হচ্ছেটা কী? অনুষ্ঠানের সঞ্চালক সংগীতশিল্পী ও অভিনেতা তাহসান মাইক্রোফোন বাড়িয়ে দিতেই হাত বাড়িয়ে নিয়ে নিলাম। কারণ, এর মানেই তো হলো, প্রিয় অভিনেত্রীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ। বলিউডের এ সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও শীর্ষ অভিনেত্রী দীপিকা পাড়ুকোন সামনে দাঁড়িয়ে। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে নিয়ম মেনেই শুরু হয় প্রশ্ন-উত্তর পর্ব। কারণ, একজন সাংবাদিক আর তারকার মধ্যে এই প্রশ্ন-উত্তর ছাড়া বিনিময়ের আর কী আছে? তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। এখানে সাংবাদিক আর তারকার কথোপকথন হচ্ছে না। একজন ভক্ত কথা বলছেন তাঁর প্রিয় অভিনেত্রীর সঙ্গে। সময় খুব অল্প। তাই তাহসানের হাত থেকে মাইক্রোফোন নিয়েই দীপিকার সঙ্গে সখ্য গড়ার চেষ্টা। গানে, সুরে, ছন্দে ভুলিয়ে যদি কিছু কথা বের করা যায়। এবার দীপিকা ঢাকায় কোনো ধরনের পরিবেশনায় অংশ নেননি, দেননি সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের জবাব। তিনি শুধু কথা বলেছেন তাঁর ভক্তদের সঙ্গে, যাঁরা ইউনিলিভারের পণ্য লাক্স ব্যবহার করে অংশ নেন বিশেষ এক প্রচারণায়।

৩.
দীপিকা পাড়ুকোনের চেন্নাই এক্সপ্রেস ছবিতে একটা সংলাপ আছে, ‘ডোন্ট আন্ডারএস্টিমেট দ্য পাওয়ার অব এ কমনম্যান।’ আমজনতার শক্তিকে উপেক্ষা করা ঠিক না। কথাটার আসল মর্ম বোঝা গেল ৩০ মে সন্ধ্যায় বসুন্ধরা ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটির মিলনায়তনে। দীপিকার প্রথম ঢাকা সফরে কোনো সাংবাদিক কিংবা তারকা সান্নিধ্য পাননি তাঁর। দীপিকা এ যাত্রায় শুধুই আমজনতার তারকা হয়ে এসেছিলেন। আমজনতার একজন হয়ে যখন দীপিকাকে ছুঁয়ে দেখার সুযোগ মিলল, তখন সাংবাদিক পরিচয়কে আড়ালে রেখে আমজনতার পরিচয়টিই হয়ে উঠল মুখ্য।
দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রঙের মধ্যে লাল হলো সবচেয়ে আকর্ষণীয়। এ রঙের পোশাক পরলে তা চোখে পড়বেই পড়বে। হাজার খানেক ভক্তের মধ্য থেকে যখন সঞ্চালক তাহসান বললেন, ‘লাল পোশাকের আপনি উঠে আসুন, হ্যাঁ হ্যাঁ আপনিই!’ তখন মনে হচ্ছিল, গবেষকেরা মোটেও ভুল বলেননি।

৪.
ওম শান্তি ওম ছবির শেষ দৃশ্যে ‘শান্তি’র বিদায়বেলায় গাল গড়িয়ে পড়া এক ফোঁটা জল থেকে শুরু করে পিকু ছবিতে বাবার মৃত্যুর পর তাঁর বিছানার পাশে বসে মুখ চেপে কান্নার দৃশ্য, কিংবা ককটেল ছবিতে বিগড়ে যাওয়া মেয়ের চরিত্র থেকে শুরু করে চেন্নাই এক্সপ্রেস-এর শাড়ি পরা মীনা—দীপিকা মানে শুধু গ্ল্যামারের মোড়কে জড়ানো শরীর প্রদর্শন নয়। দীপিকা মানে যেন স্বচ্ছতা, একটা খোলা বই। তাই তো তাঁর পাশে দাঁড়াতেই চোখে পড়ল, ‘আরে, সত্যিই তো দীপিকার গালের টোলটা দারুণ!’ তাহলে এই টোলের গভীরতায়ই অনেক তরুণ হারায় নিজেদের?

৫.
নাহ্, যতটা লম্বা দীপিকাকে ভেবেছিলাম, ততটা তিনি নন! পাশে দাঁড়িয়ে যখন তাঁর সঙ্গে নিজের উচ্চতা মেপে দেখার আবদার করলাম, এক গাল হেসেই রাজি হয়ে গেলেন তিনি। মেপে দেখা গেল আঙুল চারের তফাত! তবে উচ্চতার এই মাপজোখ দিয়ে এ অভিনেত্রীর বিচক্ষণতার উচ্চতা মাপা যাবে না। পুরো অনুষ্ঠানেই আমাদের সংগীত তারকা তাহসানের সঙ্গে যেভাবে বাক্য বিনিময় হয়েছে দীপিকার, তাতে দিব্যি বোঝা যায়, এ মেয়ে শুধুই রং মাখা চকচকে পুতুল নন। তাঁর ভেতর সৌন্দর্য আর বিচক্ষণতা সমপরিমাণে ঠাসা। তা না হলে দুপুর ১২টায় বাংলাদেশে নেমে মাত্র নয় ঘণ্টার ব্যবধানেই বাংলাদেশিদের এত ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা তো চাট্টিখানি কথা নয়!

৬.
একটি মাত্র প্রশ্ন করার সুযোগ আছে তাঁকে। একটা প্রশ্নই ছুড়ে দিলাম দীপিকার দিকে, ‘এক বাক্যে বর্ণনা করুন বাংলাদেশি ভক্তদের।’ সেই এক প্রশ্নের জবাবেই এই নায়িকা নিজের বিচক্ষণতার প্রমাণ দিয়ে দিলেন। বাংলাদেশি ভক্তদের প্রসঙ্গে বললেন, ‘তাঁরা অনেক উদার।’

সত্যিই তো উদার। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার অনুষ্ঠান রাত সাড়ে আটটায় শুরু হওয়ার পরও ‘উদার’ দর্শকদের চোখে ছিল না আক্ষেপের ছায়া। এ জন্য বাংলাদেশি ভক্তদের কৃতজ্ঞতা না জানিয়ে থাকতে পারলেন না দীপিকা। সেই সঙ্গে আরও বলে গেলেন এরপরের বার কোনো কাজের বাহানায় নয়, সময় নিয়ে বেড়াতে আসবেন বাংলাদেশে। ঘুরবেন দেশটা, আর এ উদার মানুষদের উদারতাকে দেখবেন আরও কাছে থেকে।

মিডিয়া ডেস্ক
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *