মঙ্গলবার ৩ নভেম্বর ২০২৬

ভেন্টিলেটর না রাখায় ঘরের তাপমাত্রা কমে না

Ventilatorএমনিতেই বড় শহর, একটির পাশে আরেকটি বাড়ি উঠছে, যা-ও একটু ফাঁক আছে, সেখান দিয়ে বাতাস বাড়িতে ঢুকতেই পারে না। কারণ, শীতপ্রধান দেশগুলোর অন্ধ অনুকরণে এদেশের বাড়ি ঘরগুলোতে আর ভেন্টিলেটর রাখা হয় না। ফলে ঘরের ছাদের নিচের গুমোট বাতাস বাইরে যেতে পারে না। বাড়ে ঘরের তাপমাত্রা। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা শহরের বাইরের গ্রামের চেয়ে ঢাকার দিনের তাপমাত্রা প্রায় ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকছে। আবার সন্ধ্যায় শহরের ফ্ল্যাটবাড়ির বাইরের অংশের চেয়ে ভেতরের তাপমাত্রা ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকছে।

প্রকৃতি ধ্বংস করে নগরায়ণ এবং প্রকৃতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ভবন তৈরির কারণেই তাপমাত্রার এই পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি গবেষণায় এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক খন্দকার সাব্বির আহমেদ ১৫ বছর ধরে এ বিষয়ে গবেষণা করছেন। শহরে তপ্ত ভূখণ্ড তৈরির নানা কারণ হিসেবে গাছপালা ও জলাশয় ধ্বংস করে অপরিকল্পিত নগরায়ণের বিষয়টি চিহ্নিত করেছেন তিনি। গত বছর থেকে শুরু হওয়া আরেকটি গবেষণায় সাব্বির আহমেদের তত্ত্বাবধানে ওই বিভাগেরই দুজন শিক্ষক ঢাকার তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাম্প্রতিক কারণ চিহ্নিত করেছেন। এতে রাজধানীর তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে প্রকৃতি ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি ভবন নকশা পরিবেশবান্ধব না হওয়াকে দায়ী করা হয়েছে।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাইফুল ইসলাম ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢাকার তাপমাত্রা নিয়ে পিএইচডি গবেষণা করেন। এতে দেখা যায়, ভবন নকশার কারণে ঘরের ভেতরে ও বাইরের তাপমাত্রার পার্থক্য ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হয়। তাঁর গবেষণাতেই বেরিয়ে আসে, রাজধানীর সঙ্গে একটি গ্রামের তাপমাত্রার পার্থক্য অন্তত ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

যেকোনো এলাকার তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করলেই আবহাওয়াবিদেরা তাকে দাবদাহ বলেন। গত সোমবার রাজধানীর তাপমাত্রা ছিল ৩৫ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে এই তাপমাত্রা আবহাওয়া দপ্তর মেপেছে রাজধানীর আগারগাঁও ও হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায়। সেখানকার গড় তাপমাত্রা শহরের অন্য এলাকার চেয়ে ৩ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম। সেই হিসাবে এক সপ্তাহ ধরেই ঢাকার বেশির ভাগ এলাকার তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশিই ছিল, যা মাঝারি তীব্রতার দাবদাহের সমান।

নব্বইয়ের দশকে রাজধানীর বেশির ভাগ ভবনের প্রতিটি ফ্লোর বা তলার মেঝে থেকে ছাদের উচ্চতা ছিল ১১ থেকে ১৩ ফুট। ২০০০ সালের পর থেকে প্রতিটি তলার উচ্চতা কমে সাড়ে ৯ ফুট করা হচ্ছে। আগের ভবনগুলোর ছাদে ও জানালায় কার্নিশ দেওয়ার চল ছিল। এখনকার ভবনে তা উঠেই গেছে। ফলে বাইরের তাপ প্রতিটি ভবনকে একেকটি অগ্নিচুল্লিতে পরিণত করছে।

ওই গবেষণাতেই দেখা গেছে, ফ্ল্যাট বাড়িগুলোর রান্নাঘর ও টয়লেট এমনভাবে নির্মিত হচ্ছে যে সেখানকার তাপ বাইরে বের না হয়ে ঘরের মধ্যেই আটকে থাকছে। ঘরে আলো না থাকায় সারা দিন বাতি জ্বালিয়ে রাখা হচ্ছে। ঘরের তাপ কমাতে অনেকে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র স্থাপন করছেন। এতে ঘর ঠান্ডা থাকছে ঠিকই, কিন্তু শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র থেকে বের হওয়া তাপের কারণে ভবনের বাইরের তাপমাত্রা বাড়ছে, যা ভবনটিকেই আরও উত্তপ্ত করে তুলছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক সমরেন্দ্র কর্মকার দেশের তাপমাত্রার গতি-প্রকৃতি নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি রাজধানীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির হারকে আশঙ্কাজনক হিসেবে তুলে ধরে বলেন, নব্বইয়ের দশকের পর থেকে রাজধানীতে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংসের কারণে তাপমাত্রা অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে।

ঘরের ভেতরে তাপমাত্রা আটকে থাকার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সাইফুল ইসলাম বলেন, ১৯৯৬ সালের আগে রাজধানীর যেসব ভবন নির্মিত হতো, তার বড়জোর ২০ শতাংশ খালি রাখা হতো। শীতপ্রধান দেশগুলোর ভবন নির্মাণ অন্ধভাবে অনুসরণ করায় রাজধানীর ফ্ল্যাট বাড়িগুলো থেকে বাতাস প্রবাহের জায়গা বা ভেন্টিলেটর উঠিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৯৬ সালের আগে ভবনগুলোর ভেতরে প্রতি ঘণ্টায় ১২ বার বাতাস প্রবাহিত হতো। কিন্তু ২০০৮ সালে নতুন ভবন নির্মাণ আইন অনুসরণ করে যাঁরা ভবন তৈরি করেছেন, তাঁদের ঘরে ঘণ্টায় ২২ বার বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে। কিন্তু বাতাসের গতিবেগ ও প্রবাহের ধরন মাথায় রেখে যাঁরা ভবন তৈরি করেছেন, তাঁদের ঘরে বাতাস বইছে ৩০ বার।

নিজস্ব প্রতিনিধি
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *