বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশের হৃদয় জয় করে নয়াদিল্লি ফিরলেন মোদি

Modi_Back_807448540ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শনিবার সকালে ঢাকা সফরে এসে রবিবার রাতেই আবার ফিরে গেলেন নয়াদিল্লি। এই স্বল্প সময়ের সফরেও তিনি যেন ‘এলেন, দেখলেন এবং জয় করলেন’ গোটা বাংলাদেশবাসীর মন। ফিরে যাওয়ার আগে উম্মুক্ত বক্তৃতায় মোহিত করে গেলেন বাংলাদেশকে। আবার ফিরে আসার ঘোষণাও দিয়ে স্পষ্ট করে বলে গেলেন, একাত্তরে রক্ত দিয়ে গড়া বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কখনোই কোন চাপে বা কোন কূটকৌশলে ছিন্ন হওয়ার নয়। বাংলায় বললেন, বাংলাদেশ তোমার সাথে আছি, সাথেই থাকবো। পাশে পাশে নয়, সাথে সাথেই আছি।

মোদি তার এই সফরে সরিয়ে ফেললেন ৪১ বছর ধরে জমা পাহাড়সম সীমান্ত বাধা, নতুন ও পুরনো মিলিয়ে চুক্তি-সমঝোতা করলেন ২২টি, উদ্বোধন করলেন ১৪ উন্নয়ন প্রকল্পের, শুনলেন বাংলাদেশের বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের কথা, ব্যবসায়ীদের সমস্যা। ঢাকার প্রতিটি অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে প্রকাশ পেল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা। জানালেন, বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের সমর্থনে লাখো ভারতীয়র সঙ্গে তিনিও নেমেছিলেন রাজপথে।

ফিরে যাওয়ার আগে তিস্তা চুক্তি শিগগির করতে পারবেন বলে নিজের আÍবিশ্বাসের কথাও জানিয়ে গেলেন। ‘বাংলাদেশের নতুন বন্ধু’ হিসেবে আখ্যা পাওয়া মোদি কথা দিলেন সীমান্তে নিরীহ দরিদ্র মানুষের হত্যা বন্ধ করার এবং বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য ভারসাম্য কমিয়ে আনার। দিয়ে গেলেন ৬৫ দফার একটি যৌথ ইশতেহারও।

নরেন্দ্র মোদি রবিবার দিন শুরু করেন ঐতিহ্যবাহী ঢাকেশ্বরী মন্দিরে পূজা অর্চণায় অংশ নেওয়ার মাধ্যমে। কথা বলেছেন, ছবি তুলেছেন মন্দিরের সেবায়েতদের সঙ্গে। ধর্মানুরাগী মোদি পরিদর্শন করেছেন ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশন। সেখানে হিন্দুধর্মের নেতাদের সঙ্গে কুশল বিনিময়ের পাশাপাশি উপস্থিত শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে হাত মেলান। উচ্ছ্বসিত মোদি জানান, ছোটবেলায় কেটেছে এমনই একটি মিশনের স্কুলে।

রবিবার সকালে ঢাকার পুরান এলাকায় মন্দির ও মঠে দুই কর্মসূচির পরই ঢাকার আরেক প্রান্তে চলে আসেন মোদি। বারিধারার কূটনৈতিক এলাকায় নবনির্মিত ভারতীয় হাইকমিশন ভবন বা চ্যান্সারি উদ্বোধন করেন। সেখানে ঢাকায় বসবাস করা ভারতীয় নাগরিকদের সঙ্গেও মতবিনিময় করেন। হাইকমিশনের কূটনীতিক ও অন্যান্য ভারতীয়দের শিশু সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটান। কূটনীতিক ও মিশন কর্মকর্তাদের কথা শোনেন, দেন কিছু নির্দেশনা। উদ্বোধন করেন ভারতের অনুদানে বাংলাদেশে বাস্তবায়নের জন্য নেওয়া সাত প্রকল্প ও হাইকমিশনের অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস। একটি গাছের চারা রোপন করেন নতুন চ্যান্সারি ভবনের মাঝবরাবর।

ঘন্টা দু’য়েকের এই কর্মসূচির পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী চলে যান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির কার্যালয় বঙ্গভবনে। রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ সেখানে মোদিকে স্বাগত জানান। সেখানে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও মোদির দল বিজেপির সাবেক সভাপতি অটল বিহারী বাজপেয়ীর পক্ষে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা গ্রহণ করেন।

সম্মাননায় অভিভূত মোদি উপস্থিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ সদস্য ও অন্যদের নতুন একটি তথ্যও জানান। মোদি বলেন, ‘১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমি ছিলাম তরুন। রাজনীতিতে এসেছি অনেক পরে। কিন্তু তখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন দেওয়ার দাবিতে অটল বিহারী বাজপেয়ীর ডাকে সত্যাগ্রহ আন্দোলনে যোগ দিতে গুজরাটের গ্রাম থেকে রাজধানী দিল্লীতে এসেছিলাম। অর্থাৎ সে সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা কোটি মানুষের আমিও একজন ছিলাম।’

ভাষণে মোদি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘৭১ সালে রক্ত দিয়ে বাংলাদেশ-ভারত বন্ধন তৈরি হয়। এই বন্ধন কারও চাপে, কোন কূটকৌশলে কখনোই ছিন্ন হবে না। আমি এই উপলব্ধি আগামি প্রজšে§র মধ্যে ছড়িয়ে দিবো।’ একই অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ভাষণে নরেন্দ্র মোদিকে বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে অভিহিত করেন।

বাজপেয়ীর যোগ্য উত্তরসুরি মোদির হাতেই সম্মাননা তুলে দেওয়া হলো বলেও উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী হাসিনা। পরে রাষ্ট্রপতির আয়োজনে রাষ্ট্রীয় মধ্যাহ্ন ভোজে অংশ নিয়ে মোদি ফিরে আসেন তার জন্য নির্ধারিত হোটেল সোনারগাঁওয়ে। সেখানে তার সঙ্গে একে একে দেখা করেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ব্যবসায়ী নেতারা।

মোদির সঙ্গে সাক্ষাত করেন বিরোধী দল জাতীয় পার্টির নেতা রওশন এরশাদের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের প্রতিনিধি দল। এর পর বিএনপি চেয়াপারসন খালেদা জিয়াও দেখা করেন নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে। কথা বলেন, একান্তে। মোদির সঙ্গে আরো দেখা করেন বেসামরিক বিমান-পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে ওয়ার্কাস পার্টির প্রতিনিধি দল এবং  জাসদ সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল। প্রত্যেক আলোচনায়ই বাংলাদেশের তারুন্য, সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন মোদি। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বিষয়ে প্রত্যেক দলের বক্তব্যও শোনেন মনোযোগ দিয়ে।

মোদি বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে অভিন্ন বার্তা দিয়ে বলেন, ভারত সরকার চায় বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে ভারতের জনগণের সম্পর্ক হবে। এখানে কোন সরকার কোন দেশে আছে সেটি মূখ্য নয়। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনায় ভারতের সঙ্গে ব্যবসা ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সমস্যাগুলো সমাধানের আশ্বাস দেন।

রবিবার সন্ধ্যায় মোদি বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজনে বাংলাদেশের সুধী সমাজের উদ্দেশ্যে প্রায় এক ঘন্টা বক্তব্য দেন। মোদি তার বক্তব্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের দিকগুলো তুলে ধরে কানেকটিভিটি স্থাপনে গুরুত্ব দেন। বলেন, নারী ক্ষমতায়নের, দারিদ্রতা দুরীকরনে বাংলাদেশের ভূমিকা অবিস্মরনীয়। ২২ চুক্তি শুধু কোনও সংখ্যা নয়, এটি একটি ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়া। যে জমির জন্য সবাই যুদ্ধ করে বাংলাদেশ-ভারত সেটিকে নিয়ে সমঝোতা করলো। উন্নত বিশ্বে এ ধরনের কাজ হলে নোবেল পুরষ্কার দেওয়ার জন্য লাইন লেগে যেত। মোদি বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমার ধ্যান ধারনা পুরোপুরি মিলে যায়। তিনিও চান উন্নয়ন, আমি চাই উন্নয়ন। বাংলাদেশ-ভারত সমান শক্তিতে এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশের আতিথেয়তা ভূলবার নয় উল্লেখ করে জীবনানন্দের ভাষায় বলেন, আবার আসিব ফিরে, এই বাংলার তীরে, ধানসিড়িটির পাড়ে। এ সময় তিনি বাংলাদেশের গর্ব প্রথম নারী এভারেস্ট জয়ী নিশাত, এভারেস্টজয়ী ওয়াসফিয়া, ক্রিকেটার সালমা, সাকিব আল হাসানের কথাও উল্লেখ করেন।

উম্মুক্ত বক্তৃতার এই অনুষ্ঠান শেষে মোদি সরাসরি চলে যান বিমানবন্দরে। রাত সাড়ে আটটার কিছু পরে মোদি ভারতীয় বিমান বাহিনীর বিশেষ বিমানে ঢাকা ত্যাগ করেন নরেন্দ্র মোদি। আগের দিনের মতো এবারও প্রটোকল ভেঙে হযরত শাহজালাল (রা.) বিমানবন্দরের ভিভিআইপি টার্মিনালে চলে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাত ৮টা ৩৬ মিনিটে বিমান বন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ থেকে নরেন্দ্র মোদিকে সঙ্গে নিয়ে বের হন শেখ হাসিনা। এরপর লাল গালিচা দিয়ে হেঁটে ৮টা ৪০ মিনিটে বিমানে চড়েন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। এ সময় সবার উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান নরেন্দ্র মোদি।

এর আগে, শনিবার সকালে নরেন্দ্র মোদি ঢাকায় আসেন। পৌঁছানোর আগে বিমানে বসে টুইটার বার্তায় বলেন, ভারতের জনগণের ভালোবাসা নিয়ে ঢাকায় আসছি। বিমানবন্দরে লাল গালিচায় সংবর্ধনা দেওয়া হয় তাকে। সম্মান জানান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি। শ্রদ্ধা জানান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের প্রতিকৃতিতেও। শুক্রবার রাতে ঢাকায় আসা পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে নজিরবিহীনভাবে সোনারগাঁও হোটেলে বৈঠক করেন মোদি। পরে মমতাকে নিজের গাড়িতে নিয়ে চলে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যালয়ে। সেখানে প্রথমেই দুই দেশের মধ্যে যাত্রীবাহি বাস চলাচল উদ্বোধন করেন শেখ হাসিনা, নরেন্দ্র মোদি ও মমতা ব্যানার্জি। ঐতিহাসিকভাবে চালু হয় ঢাকা-শিলং এবং কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা সরাসরি বাস সার্ভিস। পরে ঐতিহাসিক সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের সময়সীমা ও কার্যপদ্ধতি বিনিময় করে বাংলাদেশ ও ভারত। শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির স্বাক্ষর করা এই স্থল সীমান্ত চুক্তির অনুসমর্থনের দলিল বিনিময় করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক এবং ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর। এর মাধ্যমে অবরুদ্ধ জীবন কাটানো হাজারো মানুষের মুক্তির পথ আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে যায়। দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠকের পরই স্বাক্ষর হয় দুই দেশের মধ্যে ২২টি চুক্তি, প্রটোকল, সমঝোতা স্মারক ও বিনিময় পত্র। পরে দুই প্রধানমন্ত্রী চারটি স্মারকও বিনিময় করেন নিজেদের মাঝে।

বিশেষ প্রতিনিধি
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *