মঙ্গলবার ৩ নভেম্বর ২০২৬

ওমরাহ’র নামে মানবপাচার: ৫০ এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল চায় সৌদি আরব

omrahবাংলাদেশ থেকে গত কয়েক মাসে ওমরাহ ভিসায় সৌদি আরবে গিয়ে মেয়াদ শেষে দেশে ফেরেননি এমন যাত্রীর সংখ্যা ১১ হাজার ৪৮৩ জন। এ কারণে ২২ মার্চ থেকে বাংলাদেশীদের ওমরাহ  ভিসা দেয়া বন্ধ করে দেয় সৌদি কর্তৃপক্ষ। জেদ্দার বাংলাদেশ হজ অফিস থেকে সম্প্রতি কয়েক দফায় ধর্ম মন্ত্রণালয়কে বাংলাদেশের অভিযুক্ত এজেন্সিগুলোর তালিকা পাঠানো হয়েছে। এখন ঈদের আগে এই ভিসা খুলবে কি না তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষরা।

জানা গেছে, সৌদি সরকার মানব পাচারে সহযোগিতা করার অভিযোগে তাদের দেশেরও ৭টি বড় ধরনের হজ ও ওমরা এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ৫০টি এজেন্সির লাইসেন্স বাতিলের জন্য তালিকা তুলে দিয়েছে বাংলাদেশের ধর্ম মন্ত্রণালয়কে।

সৌদি আরব লাইসেন্স বাতিল করতে বাংলাদেশের কাছে সুপারিশকৃতদের মধ্যে রয়েছে হাব সভাপতি ইব্রাহীম বাহারের মালিকানাধীন এজেন্সি মেগাটপ ট্রাভেল, সিনিয়র সভাপতি হেলাল উদ্দিনের মুনা ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুর, সহসভাপতি ফরিদ আহমদ মজুমদারের গোল্ডেন বেঙ্গল ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেল, যুগ্ম মহাসচিব মোজাম্মেল হোসেন কামালের হাসিম এয়ার ইন্টারন্যাশনাল, সিনিয়র নেতা আবু খালেদ মাসুদের ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরস ও আবুল কাশেমের রয়েল এয়ার সার্ভিসেস। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওমরা ভিসার নামে অবৈধভাবে মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত হয়ে কিছু কিছু এজেন্সির মালিক রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন। কেউ কেউ আছেন শত শত কোটি টাকার মালিক।

সৌদি আরব সূত্রে জানা গেছে, কিছু এজেন্সি আছে যারা প্রতিবছর গড়ে ২ হাজারের ওপর ওমরাহ যাত্রী পাঠায়। এদের কেউ আর ফেরত আসে না। তবে তালিকায় কিছু এজেন্সির নাম এসেছে যারা গড়ে ৫ হাজারের ওপর ওমরা যাত্রী পাঠায়। তাদের মধ্যে গড়ে ২০-২৫ জন ফেরত আসে না।

এদিকে লাইসেন্স বাতিলের তালিকায় যেসব এজেন্সির নাম রয়েছে তার মালিকদের মধ্যে অনেকেই রাঘববোয়াল। ইতিমধ্যে তারা সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে তদবির শুরু করেছে। অনেকের বিরুদ্ধে মোটা অংকের টাকা আন্ডারহ্যান্ড ডিলিংয়ের অভিযোগও আছে। মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা তাদের পক্ষ হয়ে লাইসেন্স বাতিলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান বলেছেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ হবে তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হবে।

ধর্ম মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ওমরা পালনে যেতে পুলিশি ভেরিফিকেশন ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অনুমতি লাগে না বলে কিছু হজ এজেন্সি ওমরা ভিসায় লোক পাঠাচ্ছে। ওমরা ভিসায় গেলেও তারা কাজের জন্য যাচ্ছেন। ওমরা পালনের নামে গিয়ে তারা সৌদি আরবে থেকে যাচ্ছেন।

পাচারকারীর তালিকায় আরও রয়েছে- এলাইট ট্রাভেলস (ফেরত আসেনি ৯৯২), জেমিনি ট্রাভেলস লি. (৯৩৯), রওশান ট্রাভেলস ইন্টারন্যাশনাল (২৫৩), ফ্লাই হোম (২১৫), রব্বানী ওভারসিজ (৩১১), ইজিওয়ে ট্রাভেলস (৩৩৮), ইউনাইটেড স্টারস ট্যুরস (২১৩), থ্রিস্টার ট্রাভেলস(২৪১), আনজান এয়ার ট্রাভেলস (১৮২), টপকন ওভারসিজ লিমিটেড (৩৭১) কেএসপি ট্রাভেলস (১৮২), মল্লিক ট্রাভেলস (৩১৮), এডমাইর এয়ার ট্রাভেলস (২১৯), মারুফ ট্রাভেলস (৫৮১), গালফ ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস (১৪১), আলহাজ্জ ট্রাভেলস ট্রেড (৯), এয়ার এক্সপ্রেস ইন্টারন্যাশনাল (১৯৮), আভিয়া ওভারসিজ লি. (১৮৬), বাংলাদেশ ওভারসিজ সার্ভিসেস (১১৮), কনকর্ড ইন্টারন্যাশনাল (২০৮), লাব্বাইক ওভারসিজ লি. (১৯৭), এমএমআর এভিয়েশন (প্রা.) লি. (২১২), এমপি ট্রাভেলস লিমিটেড (১৭৯), পারাবত ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস লি. (২১৫), উইংস ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস লি. (১০৩), ওয়েসিস এয়ার সার্ভিসেস (১৮৭), সিটি নিওন ট্রাভেলস (২১৩), পারপল এভিয়েশন সিস্টেমস (১৯৯) এবং এভারগ্রিন ট্রাভেলস (২৮৭), রাজশাহী ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস (৩৭), হাসিম ওভারসিজ (৯৬), ইস্টার্ন ট্রাভেলস (৫৯), ফারহান এভিয়েশন সার্ভিস (৬০), কানিজ ট্রাভেলস (১৬), লর্ড ট্রাভেলস (৭৭), মদিনা এয়ার ট্রাভেলস লিমিটেড (৬৩), মিমস ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস লি. (৩) ও শরিফ এয়ার সার্ভিস লি. (৩৬)।

এছাড়া মানব পাচারে জড়িত অভিযোগে সৌদি আরবের যে ৭টি এজেন্সির কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে সেগুলো হচ্ছে- দাল্লাহ জেনারেল সার্ভিস কোং, নজদ গ্রুপ কোং, সাগদিফ ট্রান্সপোর্ট কোং, আল-মুসালি ফর ওমরা ইস্ট, মুতলাক আল-হারবি লাইবলিটি কোং, ফায়েজ ট্রেডিং অ্যান্ড সার্ভিস কোং এবং শায়ের ট্যুর ডেভেলপমেন্ট ইনক।

জানা গেছে, চলতি বছর পবিত্র ওমরা পালন শেষে দেশে ফেরেনি ৫০ এজেন্সির ১১ হাজার ৪৮৩ জন। তবে বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা আরও বেশি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওমরা করার নামে তাদের পাচার করা হয়েছে। আর এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে সৌদি আরবের স্থানীয় ও বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট ওমরা এজেন্সির একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। পাচার হওয়া এসব ব্যক্তিকে দেশে ফেরত না আনা পর্যন্ত ওমরা পালনে কোনো ভিসা দেবে না সৌদি আরব। জেদ্দার হজ কাউন্সিলর (হজ) মো. আসাদুজ্জামান সম্প্রতি চিঠি দিয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছেন।

জানতে চাইলে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব চৌধুরী বাবুল হাসান জানান, ওমরা শেষে মোট কতজন দেশে ফেরেনি এবং তারা কারা, তাদের পাসপোর্ট নম্বরসহ একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন চেয়ে আমরা সৌদি আরবের হজ মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী ঈসা বিন মোহাম্মদ রাওয়াসকে চিঠি দিয়েছি। তাদের প্রতিবেদন ও তালিকা পাওয়ার পর আমরা নিজেরাও বিষয়টি যাচাই-বাছাই করব। এর পর সংশ্লিষ্ট ওমরা এজেন্সির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেব। অভিযোগ প্রমাণিত হলে কি ধরনের শাস্তি হতে পারে জানতে চাইলে ধর্ম সচিব বলেন, ওমরা নীতিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। এর বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ আমাদের নেই। ধর্ম সচিব জানান, ওমরা যাত্রীদের পাঠানোর ক্ষেত্রে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের তেমন কোনো ভূমিকা নেই বললেই চলে। ওমরা করতে যেতে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অনুমতিও নিতে হয় না। এ বিষয়টি সরাসরি ওমরা এজেন্সি ও সৌদি দূতাবাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। আবার পুলিশি ভেরিফিকেশনও লাগে না।

প্রসঙ্গত, বিদ্যমান জাতীয় হজ ও ওমরা নীতিমালা অভিযোগ প্রমাণ হলে সরকার সংশ্লিষ্ট এজেন্সির সমুদয় জামানত বাজেয়াপ্তসহ লাইসেন্স বাতিল করতে পারবে।

কোন এজেন্সির কতজন ফেরেনি : জেদ্দার বাংলাদেশ হজ অফিস থেকে পাঠানো তালিকা অনুযায়ী, হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব) সভাপতি মো. ইব্রাহিম বাহারের মালিকাধীন এজেন্সি মেগাটপ ট্রাভেল ইন্টারন্যাশনাল (প্রা.) লিমিটেড (১০৪ জন ফেরত আসেনি), সিনিয়র সহসভাপতি মো. হেলালের মুনা ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস (২১৪ জন), সহসভাপতি ফরিদ আহমদ মজুমদারের গোল্ডেন বেঙ্গল ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস (৬৭) এবং যুগ্ম মহাসচিব মোজাম্মেল হোসেন কামালের হাসিম এয়ার ইন্টারন্যাশনাল (১৮), আবু খালেদ সায়েমের মাসুদ ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস (৬৮৯) ও আবুল কাশেমের রয়েল এয়ার সার্ভিসেস সিস্টেমসহ (১৫৬) বেশকিছু হাব নেতার এজেন্সি মানব পাচারের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এ তালিকায় আরও রয়েছে হাবের নির্বাহী সদস্য এনএমএইচ খাদেম দুলালের খাদেম এয়ার সার্ভিস (৮৬), আবু বকর সিদ্দিকীর আল নূর ইন্টারন্যাশনাল (২১৯), আবুল মালেকের সবুজ বাংলা ইন্টারন্যাশনাল (৬২২), হাব চট্টগ্রামের সহসভাপতি মো. ইলিয়াসের গোল্ডেন বেঙ্গল ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস (৪২০) এবং হাব সভাপতির জামাতা হাবের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব মান্নানের টাইমস এভিয়েশন (৩৬৮ জন)।

জানতে চাইলে হাব সভাপতি মোহাম্মদ ইব্রাহিম বাহার বলেন, আসলে আমরা তো ওমরা করতে লোক পাঠিয়েছি, পাচার করতে নয়। কেউ যদি ওমরার নাম করে সৌদি আরবে থেকে যেতে চায় তার মনের কথা আমরা জানব কি করে। তারপরও আমারটিসহ যেসব এজেন্সির ওমরাকারীরা দেশে ফেরেননি তাদের বিষয়ে আমরা খোঁজ নিচ্ছি। আইন অনুযায়ী সরকার অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে। এখানে বলার কিছু নেই। তবে আমাদের মানব পাচারকারী বলা হলে অন্যায় করা হবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *