বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

গণধর্ষণের শিকার মহিলা পুলিশের সঙ্গেও পুলিশের সেই পুরনো খেলা

Women-Policeনিজে একজন পুলিশ সদস্য হলেও খোদ পুলিশই তার বিরুদ্ধে ‘পুলিশের’ মতো আচরণই করছে। এর আগে ঢাকায় মাইক্রবাসে পাঁচ জন মিলে ধর্ষণ করা তরুণীর সঙ্গেও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তিনটি থানা একই আচরণ করেছিল। এবার মহিলা পুলিশের সঙ্গেও প্রায় একই ধরনের আচরণ করা হয়েছে। গণধর্ষণের শিকার ওই মহিলা পুলিশ সদস্য অভিযোগ এনেছেন এক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে, যিনি তার প্রাক্তন স্বামী। তিন বন্ধু সহ চারজনে মিলে ধর্ষণের প্লট সাজানো পুলিশের উপ পরিদর্শক (এ এস আই) কলিমুর রহমান চাকরি করেন ঢাকার খিলগাঁও থানায়। আর ধর্ষণের শিকার ওই মহিলা পুলিশ কর্মরত আছেন ঢাকারই উত্তর প্রান্তের তুরাগ থানায়। ধর্ষকের বিরুদ্ধে মামলা করতে গেলেও খিলগাঁও থানা পুলিশ তার মামলা গ্রহণ না করে টালবাহানা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মামলা না নিয়ে সময় ক্ষেপন করে ধর্ষণের আলামত নষ্টের পুরনো খেলাই পুলিশ খেলতে চেয়েছিল খোদ ওই মহিলা পুলিশের সঙ্গে।

‘ধর্ষণের শিকার’ পুলিশ সদস্যের ভাই শনিবার বিকেলে সাংবাদিকদের কাছে এমন অভিযোগ করেন। তবে খিলগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজ ভুঁইয়া অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ‘আগে প্রমাণ দেখি, এরপর মামলার বিষয়; তাই ওই পুলিশকে আগে হাসপাতালে পাঠিয়েছি।’

ওই নারী পুলিশ সদস্যের ভাই (নাম প্রকাশ করা হলো না) বলেন, ২০১১ সালে তাঁর বোনের বিয়ে হয় খিলগাঁও থানায় কর্মরত ওই এএসআইয়ের সঙ্গে। ২০১৪ সালে তাঁদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। তাঁদের ঘরে একটি সন্তানও রয়েছে। গত ১০ জুন বোন ঢাকার পুলিশ লাইন হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে যায়। সেই সময় বিকেল ৪টার দিকে এএসআই ফোন করে তার বোনকে সব ঝামেলা মিটিয়ে নতুন করে সংসার করার কথা বলেন। পরে তার বোন কথামতো সেদিনই ওই বাসায় গেলে এএসআই এবং তার কয়েকজন সহযোগী মিলে বোনকে ধর্ষণ করেন। এর পরদিন বৃহস্পতিবার ১১ জুন এ ঘটনায় খিলগাঁও থানায় অভিযোগ করতে গেলে পুলিশ মামলা নেয়নি।

এরপর শুক্রবার ১২ জুন রাজারবাগ পুলিশ লাইনস হাসপাতালে ভর্তি হলে ধর্ষণের আলামত পরীক্ষার জন্য তাঁকে শনিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এলে বিষয়টি এক কান দুই কান হতে হতে প্রকাশ হয়ে পড়ে।

এ ব্যাপারে ১৩ জুন বিকেলে খিলগাঁও থানার ওসি মোস্তাফিজ ভুঁইয়া বলেন, ‘এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদ করে মামলা দায়ের করা হবে। যারা দোষী তাদের গ্রেপ্তার করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে।’

মামলা না নেওয়া প্রসঙ্গে ওসি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এমন অভিযোগ শুনে আমি আশ্চর্য হয়েছি। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি নারী নির্যাতনের ঘটনার পর আমরা এসব ব্যাপারে অনেক সতর্ক। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমার পরিবারের কেউ নির্যাতনের শিকার হয়ে থানায় মামলা করতে এলে আমি সেই মামলা নেব না, এটা হতে পারে না।’

বিশ্বব্যাপী এতো সচেতনতা ও আইনের কড়াকড়ির মধ্যেও বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় গণধর্ষণের শিকার হলেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তুরাগ থানার একজন মহিলা পুলিশ সদস্য। শহরের খিলগাঁওয়ের তিলপাপাড়া এলাকায় একটি বাসায় ওই নারী পুলিশ সদস্যকে তার প্রাক্তন স্বামী তিন বন্ধুকে নিয়ে চারজনে মিলে গণধর্ষণ করেছেন। মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায় ওই মহিলা পুলিশ এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-১ এ পুলিশ ক্যাম্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক মোজাম্মেল হক ওই নারী পুলিশ সদস্যের হাসপাতালে ভর্তি ও চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

ওই নারী পুলিশ সদস্যের বড় বোন জানান, ধর্ষণের শিকার ওই নারী সদস্য তুরাগ থানায় কর্মরত। গাইনি সমস্যার কারণে গত ১০ জুন রাজারবাগ পুলিশ লাইনে তিনি চিকিৎসা নিতে যান। তখন তার সাবেক স্বামী পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক কলিমুর রহমান কৌশলে তাকে হাসপাতাল থেকে তিলপাপাড়ার ৮৬ / ৩ নম্বর বাসায় নিয়ে যান। এরপর রাতে ওই পুলিশ কর্মকর্তা ও তার তিন বন্ধু মিলে তাঁকে রাতভর গণধর্ষণ করেন। এই সময় ওই মহিলা পুলিশকে হাত-পা বেধে রাখা হয়েছিল।

ওই নারী পুলিশ সদস্যের বড় বোনের দাবি, গণধর্ষণের শিকার হওয়ার পর ওই বাড়ির মালিকের সহায়তার ১১ জুন তিনি বেরিয়ে আসেন। এরপর পরিবারের সবার কাছে বিষয়টি জানান। এর মধ্যে কী করা যায়, তা ভাবতে একদিন চলে যায়। পরে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

ওই নারী পুলিশ সদস্যের বড় বোন আরও জানান, চার বছর আগে পুলিশের ওই কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। দুই বছর আগে তাদের এক সন্তান হয়। কিন্তু পারিবারিক কলহের জেরে বছরখানেক আগে স্বামী তাকে তালাক দেন। এরপর তিনি তার ওই সাবেক স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করেন। তাই, মামলার জেরেই তাকে গণধর্ষণ করা হতে পারে বলে তাঁদের ধারণা।

এদিকে থানা থেকে ৫০০ গজের মধ্যে তিলপাপাড়ার ওই বাসায় কাউকে আটকে রেখে ধর্ষণের কোনো কথা শোনেননি বলে দাবি করেন অভিযুক্ত ধর্ষকের থানার ওসি।

খিলগাঁও থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, পুরো ঘটনাটি জেনে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ওকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পুলিশ পাঠিয়েছি। তাদের পুরো ঘটনাটি জেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছি। তিনি আরো বলেন, ওই নারী কনস্টেবল শনিবার দুপুরে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং তার সাবেক স্বামী খিলগাঁও থানার এক সহকারী উপপরিদর্শকের বিরুদ্ধে দল বেঁধে ধর্ষণের অভিযোগ আনেন।

ওসি বলেন, বিচ্ছেদের পর ওই পুলিশ দম্পতি পুনরায় বিয়ে করতে চেয়েছিলেন বলে তিনি জানেন। মেয়েটি ও তার স্বামী গত বৃহস্পতিবার খিলগাঁও জোনের সহকারী কমিশনারের দপ্তরে এসে জানায়, তারা আবার বিয়ে করতে চায়। এ সময় ওসি বলেছিলেন- পুলিশ তো কারও বিয়ে দেয় না। এটা তোমাদের নিজস্ব বিষয়, তাই নিজেরাই সমস্যার সমাধান করে নাও।

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *