মঙ্গলবার ৩ নভেম্বর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় বাংলা নাটক ঢেউ মঞ্চায়ন

এ্যন্থনী পিউস গমেজ, ভার্জিনিয়া (যুক্তরাষ্ট্র) থেকে॥

Virginia-Natok-Newsworldbdভার্জিনিয়ায় অত্যন্ত সফলতার সাথে মঞ্চস্থ হলো বহুল আলোচিত ও প্রতীক্ষিত মঞ্চ নাটক ঢেউ (The Wave-Life Before Death)। ৬ জুন শনিবার, সন্ধ্যা সাতটায় ওয়েস্ট স্প্রিংফিল্ড হাই স্কুল মিলনায়তনে অনেক দর্শক সমাগমে নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকার (বাই) দ্বিতীয় প্রযোজনা মঞ্চ নাটক ঢেউ। দর্শকদের অভিনন্দনের আলোয় নন্দিত ও প্রসংশার ছোঁয়ায় আনন্দ-গর্বে সার্থক হলো ঢেউয়ের মঞ্চায়ন। দর্শকদের হৃদয়ের মোহনা ছুঁয়ে দিল ঢেউ। এর মাধ্যমে পূর্ণ হলো আয়োজক ও সমস্ত নাট্যকর্মীদের বহুদিনের লালিত স্বপ্ন।

দীর্ঘ দিন ধরে মহড়া ও প্রস্তুতির পর অবশেষে নাটকটি মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হলো একঝাঁক উচ্ছল তরুণ-তরুণী ও প্রাণরসে সজীব প্রবীণদের স্বপ্ন-বিভোর প্রত্যাশার! আর সে প্রত্যাশা প্রাপ্তির পূর্ণতা পেয়েছে মিলনায়তন ভর্তি দর্শকদের করতালিতে। অভিনন্দনের আওয়াজ যেন ঝরে পড়ছিল মিলনায়তনের ভেতরে, প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল চারদিকের দেয়ালে! ঢেউ সত্যিই ঢেউ তুলেছিল দর্শকদের অন্তরে।

অনেক দিন থেকেই ঢেউয়ের প্রস্তুতি চলছিল। অনেক আশা ও আগ্রহ নিয়ে দিন গুনছিল নাট্যকর্মীরা। আয়োজকেরা নতুন আঙ্গিকে নতুন কিছু দেওয়ার প্রত্যাশায়। আর নতুন কিছু পাওয়ার ও দেখার প্রত্যাশায় দিন গুনছিল ওয়াশিংটন মেট্রো এলাকার সপ্রতিভ দর্শকেরা। অন্যান্য দর্শকদের মতো দিন গুনছিলাম আমিও। আর কর্মব্যস্ত জীবনধারায় দেখতে দেখতে শেষ পর্যন্ত এসেও গেল প্রতীক্ষিত ঢেউয়ের মঞ্চায়নের দিনটি।

পার্কিং লটে গাড়ি পার্ক করে ভেতরে ঢুকতেই দেখি মিলনায়তনের প্রবেশ দ্বারের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে প্রচুর লোক। সবাই একে অন্যের সঙ্গে আলাপচারিতায় ব্যস্ত। চারিদিকে বিভিন্ন স্টল—বিজ্ঞাপনদাতাদের স্টল, কাপড়-জুয়েলারির দোকান, খাবারের দোকান, টিকিট কাউন্টার। শুধু অপেক্ষা কখন নাটক শুরু হবে। ইতিমধ্যে দেখা হলো অনেকের সঙ্গে। কথাও হলো কারও কারও সঙ্গে। অনেক দিন পর আনিস স্যারের (আনিস আহমেদ, ভয়েস অব আমেরিকা, বাংলা বিভাগ) সঙ্গে দেখা হলো, স্বল্প সময় কথা হলো, খুব ভালো লাগল। কথা শেষ হতেই পেছনে ঘুরে দেখি আমার স্ত্রী নেই! চারিদিকে খুঁজে দেখি কাপড়-জুয়েলারির দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে। হাতে হ্যাঙ্গারে ঝোলানো একটি শাড়ি-ঘুড়িয়ে ফিরিয়ে দেখছে। পেছন থেকে পিঠে হাত রাখতেই চমকে উঠল বলল, কে?

শেষ পর্যন্ত খোলা হলো মিলনায়তনের দ্বার। দর্শকেরা ভেতরে ঢুকে যার যার সুবিধা মতো আসন নিয়ে বসে পড়লেন, বসলাম আমরাও। মিলনায়তনে বাতিগুলো ধীরে ধীরে নিভে গেল। অন্ধকার হতেই আমার স্ত্রী আলতো করে আমার হাতটা ধরে নিল। তারপর প্রতীক্ষা শুভারম্ভের। দেশে থাকতে অনেক মঞ্চ নাটক দেখেছি মহিলা সমিতি মঞ্চে, প্রবাসের মাটিতে এই প্রথম। তাই একটি ভিন্ন অভিজ্ঞতার জন্য উন্মুখ হয়ে ছিলাম।
শফি দেলোয়ার কাজলমাইক্রোফোনে উপস্থাপিকার প্রথম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে হলের ভেতরে নীরবতা নেমে এল। সবাই অপেক্ষমাণ একটি নতুন অভিজ্ঞতার জন্য। নাটক শুরুর প্রাক্কালে ভেসে এল নাটকের মূল কাহিনির বাংলা ও ইংরেজিতে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা বা কাহিনির পূর্বাভাস। গম গম শব্দে চারিদিক ভরিয়ে দিয়ে গুরু গম্ভীর কণ্ঠে ইংরেজি ধারাভাষ্যের যে শব্দ তরঙ্গ ভেসে এল, মনে হচ্ছিল কোনো থিয়েটার হলে বসে আছি! শুরু হলো নাটক ঢেউ।

প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয়—তিন পর্বে বিভক্ত নাটকটিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে আদিকাল, মধ্য যুগের মিসরীয় সভ্যতা ও শেষে বর্তমান কালের প্রতিফলন। আর বিভিন্ন সময় ও সভ্যতার প্রেক্ষাপটে উপস্থাপিত হলেও মূল বক্তব্য ছিল বৈষম্য। আদি থেকে বর্তমান যুগ পর্যন্ত মনুষ্য সমাজে বিদ্যমান বৈষম্য-শক্তির বৈষম্য, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য, শ্রেণি বৈষম্য, ধর্মান্ধতার বৈষম্য। সভ্যতার সাঁকো বেয়ে মানুষ বহু সময় পেছনে ফেলে এসেছে, কিন্তু সভ্যতার আলো বঞ্চিত সময় থেকে শুরু করে আজকের সময় পর্যন্ত আমাদের মাঝে এখনো এই বৈষম্য বিদ্যমান।

যা যুগ যুগ ধরে মানবতাকে, মনুষ্যত্বকে, সমাজকে করে এসেছে রক্তাক্ত, সৃষ্টি করেছে বিভেদের প্রাচীর। দুর্বল করেছে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, মলিন করেছে সভ্যতার গৌরবকে। নাটকটির মধ্য দিয়ে যে বক্তব্য দর্শকদের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা হলো—আমাদের সমাজ থেকে মানুষের সৃষ্ট এই সব বৈষম্য দূর করে একটি প্রগতিশীল উন্নত সমাজ গড়ে তুলতে হবে আমাদের জন্য, আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য।

ঢেউ নাটকের মূল কাহিনিকার ও পরিচালক ছিলেন এ কে লিংকন। নাট্যরূপ ও চিত্রনাট্য রচনা করেছেন শফি দেলোয়ার কাজল। নৃত্য পরিচালনায় ছিলেন রুমা খান। অত্যন্ত সময়োপযোগী সমাজভিত্তিক চিন্তা-চেতনা, সফল মঞ্চায়ন ও একটি ভিন্ন আঙ্গিকের পরিবেশনা ঢেউ সত্যি ভালো লেগেছে! এর জন্য এ কে লিংকন, শফি দেলোয়ার কাজল, রুমা খান, অভিনেতা-অভিনেত্রী ও কলাকুশলীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে অভিনন্দন!

নাটকটির উপস্থাপনায় ছিল আধুনিকতার ছাপ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, উন্নত মানের শব্দ নিয়ন্ত্রণ, চমৎকার আলোক সম্পাতের ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা, সুস্থ বিনোদন, সমাজ সচেতন চিন্তার খোরাক, অভিনয়শিল্পী ও কলাকুশলীদের নৈপুণ্য ও নবীন-প্রবীণের মেলবন্ধন। সকল অভিনেতা-অভিনেত্রী ও কলাকুশলীরা অপেশাদার ও কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়াই যে অভিনয়কলা প্রদর্শন করেছেন তা প্রশংসার যোগ্য, বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম।

শান্তনু বড়ুয়ার পেশাদার উঁচু মানসম্পন্ন শব্দ নিয়ন্ত্রণে ছিল অভিজ্ঞতা ও নৈপুণ্যের ছাপ। সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।

আলোক সম্পাতে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন তানজির রিফাত ও রাহাত। এটি ছিল একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ কিন্তু দক্ষতার সঙ্গে তারা তাদের দায়িত্ব পালন করে নাটকে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। তাদের অভিনন্দন!

আবহ সংগীতে ছিলেন পরিচালক কামরুল খান লিংকন । দক্ষতার সাথে তিনি সময় ও সভ্যতার মাপকাঠিতে সময়োপযোগী আবহ সংগীত ব্যবহার করেছেন। আবহ সংগীত অত্যন্ত ভালো লেগেছে।

লেখকনৃত্য পরিকল্পনা ও পরিচালনায় রুমা খান যেমন আধুনিকতার ছাপ রেখেছেন, তেমনি প্রতিটি পর্বে কাহিনীর সঙ্গে সংগতি রেখে চমৎকার কোরিওগ্রাফি করেছেন। তা ছিল অত্যন্ত চমৎকার ও দৃষ্টিনন্দন। রুমা খানকে অভিনন্দন তার সুন্দর, সাবলীল ও ব্যতিক্রমধর্মী নৃত্য পরিচালনার জন্য।

এ ছাড়া মেকআপে সাব্রিনা রেইন, ছোটদের মেকআপে মোহসিনা রিমি, কস্টিউম ডিজাইনে কামরুল খান লিংকন, রুমা খান ও মঞ্জুর রহিম, প্রপ ডিজাইনে রোমি ইসলাম ও ফারজানা মোল্লা মৌ প্রতিটি পর্বের সাথে সামঞ্জস্য রেখে স্বীয় দক্ষতা ও শৈলীর পরিচয় দিয়েছেন।

গান ও আবৃত্তি নাটকে প্রান্তরে যোগ করে এক ভিন্ন আবহের সৃষ্টি করেছিল। এ জন্য প্রশংসার দাবিদার তানিয়া সুলতানা, প্রভাতী দাস ও সিলিকা কনা।

ঢেউয়ের কাহিনিকার ও পরিচালক এ কে লিংকনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম সফলভাবে ঢেউ মঞ্চায়িত হলো, দর্শকনন্দিত হলো আপনাদের নাটক, আপনার অনুভূতি কি ও আপনি কতটুকু তৃপ্ত? উত্তরে এ কে লিংকন জানালেন, সফল মঞ্চায়নের জন্য আমি সত্যিই আনন্দিত ও গর্বিত। সবচেয়ে বড় কথা হলো এর কৃতিত্ব সংশ্লিষ্ট প্রতিটি নাট্যকর্মীর, আমার একার নয়। ভালো একটা নাটক ভিন্ন আঙ্গিকে দর্শকদের উপহার দিতে পেরেছি, এতেই আমি তৃপ্ত! আর কতটুকু তৃপ্ত, বলতে পারেন সম্পূর্ণভাবে তৃপ্ত। কারণ, যারা কাজ করেছেন তারা কেউ পেশাদার বা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নয়। কিন্তু তারা যেটুকু উপস্থাপন করেছেন, তাতে আমি অনেক খুশি এবং সন্তুষ্ট। সবাইকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

একইভাবে ঢেউয়ের চিত্রনাট্যকার শফি দেলোয়ার কাজল বললেন, নাটকটি একটি ভিন্ন আঙ্গিকের মৌলিক নাটক ছিল। সংশ্লিষ্ট সবাই দীর্ঘদিন যাবৎ অনেক অনেক পরিশ্রম করেছেন এর পেছনে। দর্শকনন্দিত হওয়ায় সবার পরিশ্রম সার্থক হয়েছে, সবাই পরিতৃপ্ত। তাই সম্ভবত ঢেউয়ের মঞ্চায়ন শেষে সবার একই অনুভূতি ছিল—শ্রান্ত দেহ, ক্লান্ত মন, কিন্তু সম্পূর্ণ পরিতৃপ্ত আত্মা সৃষ্টির আনন্দে, ভালোবাসার ছোঁয়ায়! এ ছাড়া দর্শক ও স্পনসর যারা যেভাবেই আমাদের সহযোগিতা করেছেন, আমি তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞ ও সবাইকে বাই-এর পক্ষ থেকে ও সমস্ত নাট্যকর্মীদের পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। ধন্যবাদ জানাই সকল দর্শকদের তাদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতির জন্য ও আন্তরিক প্রসংশার জন্য।

নাটক সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বাহন। ওয়াশিংটন মেট্রো এলাকায় বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে বাংলা সংস্কৃতির মূলধারার অন্যতম বাহন মঞ্চ নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে। এর ধারাবাহিকতায় মঞ্চস্থ হলো বাই-এর ঢেউ। শীঘ্রই আসছে একতারার মহুয়া ও সুরবিতানের সাত ভাই চম্পা। আজকের পরিবর্তনশীল সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এটা অত্যন্ত উৎসাহজনক, আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ ও ধারাবাহিকতা। শুদ্ধ দেশীয় সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পাচ্ছে আমাদের স্বদেশ ও সংস্কৃতির প্রতি আমাদের গভীর ভালোবাসা ও অনুরাগ। পাশাপাশি সেতুবন্ধন সৃষ্টি হচ্ছে নবীন-প্রবীণদের মাঝে। প্রতিফলিত হচ্ছে প্রবাসের জীবনধারায় দেশীয় শুদ্ধ সংস্কৃতির ছোঁয়া।

নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *