রিটেইল স্টোর স্থাপনের লক্ষ্যে জমি কিনে ভারতে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে পোশাক শিল্প মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ। এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবনাও দেয়া হয়েছে। তবে তাদের এ প্রস্তাবনাকে ‘অবাস্তব’ বলে আখ্যা দিয়েছেন খোদ সংগঠনের সদস্যরাই।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ব্যবসায়ীদের একটি প্রতিনিধি দল। ওই প্রতিনিধি দলে থাকা বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম নরেন্দ্র মোদির কাছে ভারতে এক হাজার রিটেইল স্টোর স্থাপনে জমি প্রাপ্তির প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। যদিও সে সময় আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো লিখিত প্রস্তাবনা দেননি তারা।
গণমাধ্যমে ব্যবসায়ীদের এ আগ্রহের বিষয়ে জানতে পারলে ভারতীয় হাইকমিশন থেকে বিজিএমইএর কাছে লিখিত প্রস্তাবনা চাওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৪ জুন দুই পৃষ্ঠার এক লিখিত প্রস্তাবনা দেয় বিজিএমইএ।
এদিন বিকেলে ঢাকার গুলশানে ভারতীয় হাইকমিশনে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাবনা জমা দিয়েছে বিজিএমইএ।
প্রস্তাবনার প্রথম রূপরেখায়ই বিজিএমইএ বলেছে, বিনিয়োগ বাস্তবায়নে জমি কিনবে একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি গঠন করা হবে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও অন্যদের মাধ্যমে। প্রাথমিকভাবে পোশাকপণ্য গুদাম ও সরবরাহ (ওয়্যারহাউজ ও ডিস্ট্রিবিউশন) কেন্দ্র স্থাপনই হবে এ প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য। গুদাম ও সরবরাহ কেন্দ্র স্থাপনে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার বিনিয়োগ সংকল্পের কথাও বলা হয়েছে দ্বিতীয় রূপরেখায়।
প্রস্তাবনার তৃতীয় রূপরেখায় বলা হয়েছে, ‘আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে প্রায় এক হাজার রিটেইল স্টোর স্থাপন করা, যার মাধ্যমে কয়েক বছরের মধ্যে ভারত থেকে ১ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয় করা।’ চতুর্থ রূপরেখায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সব অনুমোদন নেয়া হবে।
বিজিএমইএর প্রস্তাবনাকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে মনে করলেও তাদের প্রক্রিয়াগুলো নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অনেকে। তাদের মতে, বাংলাদেশের পোশাক শিল্প মালিকদের রিটেইল স্টোর স্থাপন ও পরিচালনার অভিজ্ঞতা খুবই সীমিত। বেক্সিমকো গ্রুপের ইয়েলো, ব্যাবিলন গ্রুপের ট্রেন্ডজ, এজে গ্রুপের ডোরসসহ অল্প কিছু প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা রয়েছে রিটেইল স্টোরের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনার। এ রকম বাস্তবতায় ভারতের মতো বৃহৎ একটি দেশে রিটেইল স্টোর স্থাপন বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করছেন অনেকে।
এছাড়া যে বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলেছেন, সেটা হলো সংগঠন হিসেবে বিজিএমইএর প্রতিষ্ঠান গঠন। সংগঠন অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে রিটেইল স্টোর স্থাপন করতে পারে কিনা, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন পোশাক শিল্প মালিকরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পোশাক শিল্পের বৃহৎ এক প্রতিষ্ঠানের মালিক বলেন, বিজিএমইএর উদ্যোগটি ভালো। তবে এটি বাস্তবসম্মত নয়। আমার কাছে কিছু বিষয় ‘বোকা বোকা’ ও অনেকটা আজগুবি মনে হয়েছে।
শিল্প বিশ্লেষক অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের বাইরে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রথমেই সব ধরনের আইনি প্রক্রিয়াগুলো সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করার প্রয়োজন আছে। কারণ বাংলাদেশ বিদেশীদের জমি কিনতে দেয়ার বিষয়ে অনেক উদার হলেও বিদেশীরা বিশেষ করে ভারতীয়রা এতটা উদার নয়। সেখানে জমি ইজারা নিয়ে ব্যবসা করা যেতে পারে। তার পরই আছে বিজিএমইএর কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন। সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের ব্যাপ্তি কী হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। সবশেষে আছে বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিয়ম-কানুন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে পুঁজি স্থানান্তরের অনুমোদন নেয়ার বিষয়গুলো।
ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক ড. সাজ্জাদ জহির বলেন, ভারতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা একটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলেই আমি মনে করি। তবে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে সব ধরনের আইনি বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই ও বাজার গবেষণার মাধ্যমে করা উচিত।
ভারতে বিনিয়োগ প্রস্তুতির বিষয়ে জানতে চাইলে বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, একেবারে প্রস্তুতি ছাড়া আমরা প্রস্তাব করেছি, এটা ঠিক নয়। এরই মধ্যে সংগঠনের অনেক সদস্য আমাদের কাছে ভারতে ওয়্যার হাউজ সুবিধা ও রিটেইল স্টোর স্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সংগঠন হিসেবে সে আগ্রহের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে চাইছি। এ প্রক্রিয়ায় আইনি বিষয়গুলোসহ যত ধরনের বাধা আছে, তা পর্যায়ক্রমে নিষ্পত্তি করেই আমাদের প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন করা হবে।
বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।



Leave a Reply