‘হাফিজুর রহমান মান্না, পিএস টু অনারেবল এমপি’-একটি ভিজিটিং কার্ডে এই পরিচয়ের নিচে একটু ছোট হরফে অনারেবল এমপির নাম লেখা, ‘শামীম ওসমান’। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সরকারদলীয় সাংসদের ব্যক্তিগত সচিবের পরিচয় জ্ঞাপক এই কার্ডে জাতীয় সংসদের মনোগ্রাম রয়েছে। বাগেরহাট-১ আসনের সাংসদ শেখ হেলাল উদ্দিনের ‘পিএস’ এম এম ওবায়দুর রহমানের ভিজিটিং কার্ডটিও জাতীয় সংসদের মনোগ্রামসহ এমনভাবে ছাপানো হয়েছে যে হঠাত্ করে দেখলে মনে হবে কোনো মাননীয় সংসদ সদস্যেরই ভিজিটিং কার্ড।
শুধু এরা দু’জন নন, তাদের মতো শতাধিক সাংসদের ‘পিএস’ বা পারসোনাল সেক্রেটারি এবং ‘পিও’ বা পারসোনাল অফিসার রয়েছেন যারা সাংসদদের মতোই জাতীয় সংসদের মনোগ্রাম বা লোগো সংবলিত ভিজিটিং কার্ড ছাপিয়েছেন। এই পদ ও সেই পরিচয়ে জাতীয় সংসদের মনোগ্রাম ব্যবহার দুটোই বেআইনি।
এদিকে শুধু ভিজিটিং কার্ড নয়, ‘বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ’ লেখা স্টিকার গাড়িতে লাগিয়ে দাপিয়ে বেড়ান সাংসদদের কথিত পিএস, পিও এবং পিএরা। এ ছাড়া সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও অনেকে ব্যবহার করছেন স্টিকার।
জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের প্রশাসন শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব হুমায়ুন কবির জানান, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, হুইপ এবং সংসদীয় কমিটির সভাপতিরাই কেবল একান্ত সচিব (পিএস) পেয়ে থাকেন। সংসদ সদস্যদের জন্য পিএস ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তার কোনো পদ নেই। বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা প্রিভিলেজ স্টাফ হিসেবে তৃতীয় শ্রেণির পদমর্যাদার একজন ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) পেয়ে থাকেন। সাংসদদের ইচ্ছা অনুযায়ী সংসদ সচিবালয়ের মানবসম্পদ শাখা থেকে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়, যাদের মাসে বেতন প্রায় ১৪ হাজার টাকা। তাদের চাকরির মেয়াদ হচ্ছে সাংসদ যতদিন মনে করবেন ততদিন।
সংসদের মানব শাখার কর্মকর্তারা জানান, তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হওয়ায় সাংসদদের পিএরা ভিজিটিং কার্ড ছাপানোর অধিকার রাখেন না। অন্যদিকে পিএস বা পিও হিসেবে সাংসদদের কোনো স্টাফ নিয়োগেরও সুযোগ নেই। তবে ব্যক্তিগতভাবে কোনো সাংসদ পিএস নিয়োগ দিলেও তারা সংসদ সচিবালয়ের স্টাফ না হওয়ায় জাতীয় সংসদের মনোগ্রাম সংবলিত ভিজিটিং কার্ড ছাপাতে পারেন না। কেউ ছাপিয়ে থাকলে তা অবৈধ। তা ছাড়া সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা ভিজিটিং কার্ড ছাপানোর সুযোগ পেলেও তাদের ভিজিটিং কার্ডে ‘বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়’-এর মনোগ্রাম থাকে। ‘বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ’-এর মনোগ্রাম কেবল সাংসদরাই ব্যবহার করতে পারেন। তাঁরা গাড়িতে এবং ভিজিটিং কার্ডে এই মনোগ্রাম ব্যবহারের অধিকার রাখেন। আর সংসদের কর্মকর্তারা সংসদ সচিবালয়ের মনোগ্রাম ব্যবহার করতে পারেন।
সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানান, তাঁদের কাছে প্রায়ই অভিযোগ আসে সাংসদদের পিএরা এলাকায় পিএস পরিচয় দিয়ে থাকেন। অনেকে পিএ পরিচয় দিতে লজ্জা পান বলেই পিএস পরিচয় দিয়ে সরকারি বিভিন্ন অফিসে নানা ধরনের তদবিরসহ দাপট দেখান। সংসদ সচিবালয়েও তাদের দাপটে তটস্থ থাকতে হয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। অনেক সাংসদের এই অবৈধ পিএসরা ন্যাম ভবনে সাংসদের নামে বরাদ্দকৃত ফ্ল্যাটে বসবাস করেন।
মহিলা সাংসদ শিরিন নাঈমের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা এএইচএম কামরুজ্জামান সুমন জাতীয় সংসদের মনোগ্রাম দিয়ে যে ভিজিটিং কার্ড ছাপিয়েছেন তাতে বাসার ঠিকানা উল্লেখ করেছেন ‘ভবন নং-৩, ফ্ল্যাট নং-১০২, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, শের-ই-বাংলা নগর, ঢাকা’-যা ন্যাম ভবনের ঠিকানা।
সম্প্রতি লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সাংসদ মোহাম্মদ নোমানের ‘পিএস’ জাকির হাওলাদারের বিরুদ্ধে কাবিখার বরাদ্দের টাকার কমিশন না দেওয়ায় সদর উপজেলা জাতীয় পার্টির সেক্রেটারি জাহাঙ্গীর হোসেনকে মারধর করার অভিযোগ সম্পর্কে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সিলেট-২ আসনের জাপার সাংসদ ইয়াহইয়া চৌধুরীর ‘পিএস’ তামিম আহমদ চৌধুরীর বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অনিয়ম সম্পর্কে বিশ্বনাথের সরিশপুর গ্রামের মোবারক আলীর ছেলে ফরিদ মিয়া থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। তবে সাংসদের ‘পিএস’ তামিম আহমদ চৌধুরী জানান, মোটরসাইকেল কেনা নিয়ে বিরোধের জের ধরে ফরিদ তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছেন।
নিয়ম অনুযায়ী একজন সাংসদ তাঁর গাড়িতে সংসদ সদস্যের একটি স্টিকার ব্যবহার করতে পারবেন। অপরদিকে সংসদ সচিবালয়ের পরিবহন পুলের গাড়িতে থাকবে সংসদ সচিবালয়ের স্টিকার। এসব নিয়ম কেবল কাগজ-কলমেই শোভা পাচ্ছে। হিসাব অনুযায়ী ৩৫০ জন সাংসদ, সংসদ পরিবহন পুলের ৬৩টি ও পরিবহন পুলের প্রায় ১০০টি গাড়ির জন্য থাকবে মোট ৫১৩টি স্টিকার। সেখানে শুধু রাজধানীতেই রয়েছে পাঁচ হাজারেরও বেশি গাড়ি যাতে ‘জাতীয় সংসদ’ লেখা স্টিকার লাগানো রয়েছে। সাংসদদের কথিত পিএস এবং আত্মীয়-স্বজনের গাড়িতেও ব্যবহার হচ্ছে সংসদ সদস্য অথবা জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের স্টিকার। এমনকি ভাড়ায় খাটানো গাড়িতেও স্টিকার লাগিয়ে আদায় করা হচ্ছে সুবিধা। এভাবে ঢালাও ব্যবহারের ফলে অপরাধমূলক কাজেও এসব গাড়ি ব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
এ বিষয়ে সাংসদ শামীম ওসমানের ‘পিএস’ হাফিজুর রহমান মান্নার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকারিভাবে সাংসদদের পিএস নিয়োগের সুযোগ নেই এ কথা ঠিক। তবে তিনি সাংসদের ব্যক্তিগত পিএস।
‘ব্যক্তিগত পিএস’রা জাতীয় সংসদের মনোগ্রামসহ ভিজিটিং কার্ড ছাপাতে পারেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাংসদের কাজে বিভিন্ন অফিসে যেতে হয়, এ কারণেই তিনি ভিজিটিং কার্ড ছাপিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জাতীয় সংসদের মনোগ্রাম ও স্টিকার কেবল সংসদ সদস্যরাই ব্যবহার করার অধিকার রাখেন। অবৈধভাবে কেউ এটা ব্যবহার করলে তা গুরুতর অপরাধ। এ বিষয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। স্পিকার জানান, এমপিদের গাড়ির জন্য বিশেষ হলোগ্রাম, ব্যবহূত গাড়ির নম্বর ও একটি বিশেষ সিকিউরিটি নম্বরসহ স্টিকার দেওয়া হবে। এই বিশেষ ধরনের স্টিকার নকল করা যাবে না। আর তাদের পরিবারের জন্য দেওয়া হবে এ থেকে আলাদা একটি স্টিকার। এ ছাড়া সংসদ ভবনের কর্মকর্তাদের গাড়ির জন্যও ভিন্ন রংয়ের একটি স্টিকার দেওয়া হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।



Leave a Reply