বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বাড়িতে যা করলেন রবি শাস্ত্রী

Ravi-Shastri-Dhaka-Newsworldbdএর আগে বহুবার বাংলাদেশে এসেছেন। সময়-সুযোগ হয়তো হয়ে ওঠেনি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের স্মৃতিধন্য ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাড়িতে যাওয়ার। এবার যেন প্রতিজ্ঞা করেই এসেছিলেন। ফতুল্লা টেস্টের ম্যাড়মেড়ে সময় কাটিয়ে হাতে সময় পেতে সোমবার গেলেন ইতিহাসের পাঠ নিতে, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে।

সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লেন শাস্ত্রী। একেবারে ট্যুরিস্ট মুডে। সঙ্গে ভারতীয় দলের কয়েকজন সাপোর্ট স্টাফ-সাবেক ক্রিকেটার সঞ্জয় বাঙ্গার, শ্রীধর, ভারত অরুণ আর ভারতের টিম ম্যানেজার বিশ্বরূপ দে। সবারই লক্ষ্য ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডে গিয়ে বাংলাদেশের জনককে জানা।

ইতিহাস-সচেতনতা বোধ হয় একেই বলে। বাংলাদেশের মাটিতে নামবেন আর বাংলাদেশের স্থপতির ঐতিহাসিক বাড়িটিতে যাবেন না, এমন তো হতে পারে না। ভারতীয় ক্রিকেট দলের টিম ডিরেক্টর রবি শাস্ত্রীর ভাবনাটাও ছিল ঠিক এমনই।

বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে এসেই স্তব্ধ শাস্ত্রী। ঘুরে ঘুরে দেখলেন বাড়ির প্রতিটি কোণ। কুখ্যাত সেই সিঁড়িটির কাছে এসে কিছুটা আবেগীও হয়ে উঠলেন। অস্ফুট স্বরেই স্বগোতক্তি করলেন, এমন একজন মানুষকে গুলি করে মারতে খুনিদের হাত এতটুকু কাঁপল না! বুলেটের দাগগুলো নিজে দেখলেন, দেখালেন অন্যদের। বঙ্গবন্ধুর জীবনের বিভিন্ন সময়ের ছবিগুলো দেখতে দেখতে হারিয়ে গেলেন ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকে।

মন্তব্য খাতাতেও আবেগ ধরে রাখতে পারেননি শাস্ত্রী। লিখেছেন, ‘আমি প্রথমবার এখানে এলাম। ফিরে যাচ্ছি অসাধারণ অভিজ্ঞতা নিয়ে। বুঝতে পারলাম কেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে একজন মহৎ মানুষ বলা হয়।’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘এখানকার সবকিছুই আমার হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। বাংলাদেশের যাঁরাই আসবেন এই জায়গাটিতে তাঁরা সবাই অবশ্যই আসবেন।’

ভারতীয় দলের ম্যানেজার কোলকাতার এক বাঙালী বিশ্ব রূপ দে-কে ডেকে দেখালেন সাদ্দাম-গাদ্দাফি’র সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ছবি। অনেকক্ষণ ধরে ছবিগুলো দেখতে দেখতে দাঁড়িয়ে গেলেন একই ফ্রেমে বঙ্গবন্ধু আর ফিদেল ক্যাস্ট্রোকে দেখে। এবার অন্যরকম এক শাস্ত্রী। বিষাদাচ্ছন্ন শাস্ত্রী যেন হালকা হতে চাইলেন অন্যরকম এক শাস্ত্রীয় বচনে; ‘একজনের পাইপ আরেক জনের সিগারেট। জমে যেতো নিশ্চয়ই!’

ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ছবিটা দেখিয়ে বঙ্গবন্ধু জাদুঘরের কিউরেটর শাস্ত্রীকে মনে করিয়ে দিলেন ক্যাস্ট্রোর সেই ঐতিহাসিক উক্তি; ‘আমি হিমালয় দেখিনি। শেখ মুজিবকে দেখেছি।’ শাস্ত্রীর প্রশ্ন ছিল; হিমালয় কেন? বঙ্গবন্ধু কতো উঁচু মাপের মানুষ ছিলেন, সেটা বোঝাতেই ক্যাস্ট্রো হিমালয়কে টেনে এনেছিলেন। সেটাও জেনে গেলেন রবি শাস্ত্রী। জেনে গেলেন ’৭১ এর ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানিরা তাঁকে গ্রেপ্তার করার আগে কিভাবে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই রাতে পাকিস্তানি সেনারা কিভাবে গণহত্যা চালিয়েছিল। কিভাবে  এদেশের নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করেছিল পাকসেনারা।

ইতিহাসের পাতা উল্টানোর মতো এক একটা ছবি দেখে জেনে গেলেন,  গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়া থেকে উঠে আসা একটা লোক কোলকাতায় পড়াশোনা করার সময় গান্ধী, সোহরাওয়ার্দী-র সংশর্স্প পেয়ে একজন ছাত্র নেতা থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়ে একটা রাষ্ট্রের জন্ম দিলেন কিভাবে। কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ, বেকার হোস্টেলের ছবি দেখতে দেখতে শাস্ত্রীর মন্তব্য; ‘তার মানে কোলকাতার সঙ্গে ওঁর সম্পর্ক ছিল পুরনো।’বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার প্রতিটি দফা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন। তিন নম্বর দফা যেখানে পূর্ব-পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ভিন্ন অথচ বিনিময়যোগ্য মুদ্রার কথা বলা হয়েছিল, সেটা পড়ে রবি শাস্ত্রী বলেই ফেললেন; ‘ওটা হলে ইতিহাসটা বোধহয় অন্যরকম হতো।’

বাংলাদেশের ইতিহাস খুঁজবেন আর বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বাদ যাবে তা কি করে হয়! ৭ মার্চের ভাষণের ভিডিওটা অনেকক্ষণ ধরে দেখলেন। শুনলেন। চোখ রাখলেন পর্দার নিচে সাব টাইটেলে। শাস্ত্রীরও বুঝতে বাকি থাকলো না ঐ ভাষণটাকে কেন ‘রাজনৈতিক কাব্য’ বলা হয়। কেন শেখ মুজিবকে রাজনীতির কবি বলা হয়। যে কবির জীবন শেষ হয়েছে বিশ্বাসঘাতকদের বুলেটে।

বত্রিশ নম্বরে শাস্ত্রী দেখলেন ফ্রেমবন্দী এক ‘স্টুডেন্ট লিডার-কেও। পরবর্তীতে যাকে বহুবার দেখেছেন। দেখেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। জানলেন ১৫ আগস্টে কিভাবে বেঁচে গিয়েছেন তিনি এবং তাঁর বোন। জানলেন কি নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর তিন ভাইকে। অথচ তাঁর জানা হলো না এবং জানানো হলো না এই বাড়ির সাথে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের ক্রীড়াইতিহাসেরও অনেক ঘটনা।

বাংলাদেশে কোনোদিন যদি ক্রীড়া জাদুঘর তৈরি হয়, তাহলে এ বাড়িরও কিছু কিছু জিনিস সেখানে জায়গা পাওয়া উচিত। বঙ্গবন্ধু শুধু রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী-ই ছিলেন না। ছিলেন অসম্ভব ক্রীড়াপ্রেমী। আর এই বাড়িটায় ছিল ক্রীড়াঙ্গনের মানুষের অবাধ যাতায়াত। সেই বাড়িটার অনেক কিছু দেখলেন সাবেক ক্রিকেটার রবি শাস্ত্রী। দেখলেন ঐ বাড়ির দোতলার একটা ঘরে সংরক্ষিত আছে পুরনো একটা ক্রিকেট বল। অন্য ঘরে আছে গোটা চারেক ক্রিকেট ব্যাট।

শাস্ত্রী জানলেন না, এই বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন ক্রিকেটারের অনেক স্মৃতি। যিনি ক্রিকেট খেলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে। খেলেছেন উদিতি, আবাহনীর মতো ক্লাবের হয়ে। যিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আবাহনীর মতো জনপ্রিয় ক্লাবের। এবং যিনি প্রচণ্ডভাবে বিশ্বাসী ছিলেন ক্রিকেট নামক খেলাটার স্পিরিটে। তাই আবাহনীর হয়ে একটা লিগ ম্যাচ খেলার সময় অধিনায়ক আলিউল ইসলাম  দু’ওভার বল করিয়ে-ই তাঁকে যখন বলেছিলেন; ‘যাও টুয়েলভম্যানকে মাঠে পাঠাও, ম্যাচ ফিটনেসে ঘাটতি থাকলে মাঠে নামা ঠিক না।’ ক্যাপ্টেনের কথাই শেষ কথা মেনে নিয়ে মাঠ ছেড়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামাল। এই বত্রিশ নম্বরে বঙ্গবন্ধু পরিবারের প্রথম শহীদও সেই শেখ কামাল। তাঁর জীবনের ইনিংসটা শেষ হলো রক্তাক্ত বত্রিশে! এখনো সেখানে পড়ে আছে তাঁর ব্যাট-বল।

ক্রীড়া প্রতিবেদক, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *