বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

যে গ্রামে মহিলারা যৌনকর্মী পুরুষরা দালাল

201506191746344251_Nat-Purwa-Village-where-women-are-forced-into-prostitution_SECVPFভারতের উত্তরপ্রদেশের রাজধানী লখনউ থেকে মাত্র ২ ঘণ্টার রাস্তা । গ্রামের নাম নটপূর্বা । তবে গ্রাম বলতে আমরা যা বুঝি – সবুজ ধানক্ষেত, মাটির বাড়ি, সরল গ্রামবাসী, সবুজঘেরা সাদামাটা জীবন, নটপূর্বা কিন্তু তেমন নয় । এখানে সহজ সরল কোনও বিষয় নেই। এই গ্রামের প্রত্যেকটি পরিবারের প্রত্যেকটি পুরুষ দালালের ভূমিকায় । প্রত্যেকটি মহিলা পতিতা । বংশপরম্পরায় চলছে পতিতাবৃত্তি ।

তবে আরও একটা ব্যাপারে নটপূর্বা ভিন্ন। এখানে কন্যাভ্রূণ হত্যা করা হয় না। বাড়িতে মেয়ে জন্মালে মাথা ঠুকে মরে না বাড়ির লোক। বরং উৎসব চলে ঢাকঢোল পিটিয়ে। এই মেয়েই কিনা রোজগারপাতির যাবতীয় দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেবে ! নেমে পড়বে চিরাচরিত দেহব্যবসায়। তাই ছোট্ট বয়স থেকেই মেয়ের তালিম শুরু হয়। মেয়ের সাজগোজ, হাঁটাচলার ট্রেনিং চলে । বহু পুরুষকে কীভাবে একসঙ্গে মাতিয়ে রাখতে হয়, শিখিয়ে দেন মা নিজে । বাবা-ভাইরা খদ্দের খুঁজে আনেন মেয়ের জন্যে । যে মেয়ের যত রোজগার, তার তত বেশি কদর । সেই মেয়েকে বিয়ে করতে লম্বা লাইন লেগে যায় গ্রামে । শিশুকাল পেরিয়ে কৈশোরে প্রবেশ করা মাত্রই “তাওয়াইফ” বনে যায় বাড়ির মেয়েরা। এটাই রীতি। এভাবেই এতকাল চলে এসেছে। এখনও চলছে। তবে কেউ কেউ এর প্রতিবাদ শুরু করেছেন। কিন্তু সেই প্রতিবাদের আগে একবার দেখে নেওয়া যাক, কীভাবে শুরু হয়েছিল এই প্রথা।

অতীতের কথা…
নটপূর্বা গ্রামের মানুষ দলিত সম্প্রদায়ের “নট” আদিবাসী । তাদের কাজ ছিল লোকের মনোরঞ্জন করা । ১৮৭১ সালে ব্রিটিশ শাসনকালে “দা ক্রিমিনাল ট্রাইবস্ অ্যাকটস্” পাশ হওয়ার কারণে মনোরঞ্জনের সমস্ত পাট চুকে যায় নটদের। নেচে গেয়ে বিনোদন জুগিয়ে রোজগারপাতির পথ বন্ধ হয়ে যায় তাঁদের। নটপূর্বা গ্রামে চাষবাস শুরু করেন তাঁরা। কিন্তু ঠাকুর ও জমিদারদের অত্যাচারে সমস্ত টাকা চলে যেত খাজনায়। শেষে উপায় না দেখে পুরুষরা বাড়ির মেয়ে বউদের ভেট দিতে শুরু করেন ঠাকুরদের কাছে। বিনিময় আসে অর্থ। ধীরে ধীরে সেটাই হয়ে যায় রেওয়াজ। ঘরে ঘরে পতিতাবৃত্তিই মেয়েদের একমাত্র পেশা হিসেবে দাঁড়ায়। পুরুষদের তো কোনও কাজই নেই। তাঁদের কাজ শুধু খদ্দের ধরে আনা। বড় বড় রেইস পার্টির খোঁজ লাগানো। একেবারে প্রথায় পরিণত হয়।

বদল চাই…
এভাবেই হয়তো কেটে যেত আরও কয়েকশো বছর। কিন্তু হঠাৎই মুখ খুললেন তাঁদেরই একজন, চন্দ্রলেখা। বয়স বর্তমানে ৫০-এর সামান্য বেশি। ঠাকুমার গুঁতো খেয়ে মাত্র ১৫ বছর বয়সে এই লাইনে আসেন। নাতনির আপত্তিতে আমল দেননি ঠাকুমা। বলেছিলেন, “গ্রামের বাকি মেয়েরাও তো করছে। তুই কেন পারবি না ?” প্রথম দিকটাই মেনে নিতে অসুবিধা হয়নি তা নয়। একের পর পুরুষ আসে জীবনে। তারপর সংখ্যাটাই হারিয়ে যায় মাথা থেকে। সম্পূর্ণরূপে পতিতা হয়ে ওঠেন তিনি। সমাজের চাপে নিজের ইচ্ছেগুলো তলিয়ে যায়।

বাকিদের মতো হয়তো কাটিয়ে দিতে পারতেন । কিন্তু দেহ বেচার কারবারে আর পেরে উঠলেন না মনের কাছে। এই কুৎসিত প্রথার বিরুদ্ধে তিনিই প্রথম মুখ খোলেন। বলেন, “পতিতা হওয়ার জন্য জন্মাইনি। কোনও মেয়ে পতিতা হওয়ার জন্য জন্মায় না। এই অসম্মানের জীবনের চেয়ে মৃত্যু ঢের ভালো।” চন্দ্রলেখার শব্দ প্রতিধ্বনিত হয় বাকিদের মনে। অনেকেই সরে আসার চেষ্টা করেন। সবাই সফল হয়েছেন, এমন নয়। কিন্তু শুরুটা তো হয়েছে কোথাও। পায়ের উপর পা তুলে এতকালের পরিশ্রমহীন জীবন পুরুষরা ছাড়বে কেন ? ঘরে বসে মে-বউয়ের ইনকামে মৌজমস্তি করার এহেন “সুব্যবস্থা” কেউ ছাড়তে চায় ? ফলে বাধা এসেছে ঘরের ভিতর থেকেই, বাবা-দাদার কাছ থেকেই।

তবে মেয়েদের এই অসহায়তার সময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকটি NGO। তাদের প্রয়াসে নতুন সূর্যোদয়ের আভাস আকাশে। ছোটো ছোটো মেয়েরা আজ স্কুলে যাচ্ছে। লেখাপড়া শিখছে। অন্যের ভোগ্যবস্তু না হয়ে, নিজের পরিচয় তৈরির প্রথম পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। গ্রামের ৬০ শতাংশ মেয়েই এখন স্কুলে যায়। জিজ্ঞেস করলে আর পাঁচটা বাচ্চার মতোই বলে, “ডাক্তার হব; ইঞ্জিনিয়র হব; টিচার হব।” “পতিতা হব”, কেউ বলে না।

ডেস্ক রিপোর্ট

নিউজওয়ারর্ল্ডবিডি ডটকম

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *