পরিবহন খাতে পুলিশের চাঁদাবাজি এতো বেড়ে গেছে যে তা নিয়ে রীতিমতো ক্ষুব্ধ পরিবহন মালিক শ্রমিকরা। রাস্তা ও মহাসড়কে পুলিশের বেপরোয়া চাঁদাবাজি পুলিশকে নিয়ে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কাছে অভিযোগও করেছেন তারা। মালিক ও শ্রমিক সমিতিগুলোর হিসাবে, দিনে পরিবহন থেকে শুধু পুলিশই কোটি টাকার চাঁদা তুলছে। এদিকে পুলিশের চাঁদাবাজির মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় ঈদ সামনে রেখে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের একটি অংশ ভাড়া বাড়ানোর ফন্দি আঁটছে। পুলিশের চাঁদাবাজির টাকা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের পকেট থেকেই যাচ্ছে।
বুধবার ২৪ জুন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে পরিবহন নেতারা পুলিশের চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে ঈদ মৌসুমে বাসভাড়া বাড়ানোর আভাসও দিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, চাঁদাবাজি বন্ধ হলে ভাড়া বাড়ানোর দরকার হবে না। বৈঠকে চাপের মুখে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অবশ্য পরিবহন নেতাদের কাছে পুলিশের চাঁদাবাজি কমানোর সুপারিশমালা চেয়েছেন।
পরিবহন নেতারা বলছেন, টানা অবরোধ ও দফায় দফায় হরতালে গাড়ি চালানো বন্ধ রাখতে হয়েছিল চলতি বছরের শুরুতেও। গাড়ি চলাচল পুরোদমে শুরুর পর থেকেই তাঁদের ‘সীমিত’ আয়ে ভাগ বসাচ্ছে পুলিশ। অবশ্য পুলিশের বড় কর্তারা দাবি করছেন, পরিবহনে পুলিশের চাঁদাবাজি আগের চেয়ে কমেছে। তবে নিচের দিকের এস আই বা সার্জেন্টদের মতো পুলিশরা বলছে, আসলে সবাইকে ভাগ দিতে গিয়েই তাদের চাঁদাবাজিতে বেশি আদায় করতে হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রমজান ও ঈদ সামনে রেখে ঢাকার বাইরে ৪৫ জন পুলিশ কর্মকর্তার বেপরোয়া চাঁদাবাজির খবর পাওয়া গেছে। এরা নদীতে মাছ ধরার মতো বসে থেকে মহাসড়কে ফ্রি স্টাইলে চাঁদাবাজি করে বলে গোয়েন্দা সংস্থার তৈরি করা একটি প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। ঢাকার বাইরে পরিবহনে বেপরোয়া চাঁদাবাজি হচ্ছে মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, পাবনা, নাটোর, বগুড়া, হবিগঞ্জ, রংপুর, দিনাজপুর, নীলফামারী, গাইবান্ধা, ঠাকুরগাঁও, বরিশাল, পিরোজপুর, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, বাগেরহাট, যশোর ও কুষ্টিয়া জেলায়। এর বাইরেও রয়েছে চাঁদা আদায়কারী পুলিশ কনস্টেবল।
ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে গত মঙ্গলবার ২৩ জুন ঢাকার বিয়াম ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও ঢাকা মহানগর পুলিশের উপস্থিতিতেই পরিবহন শ্রমিক নেতারা পুলিশের চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে তা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানান। এরপরদিন বুধবার পরিবহন নেতারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত বৈঠকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কাছে পুলিশের চাঁদাবাজি বন্ধের অনুরোধ করেছেন। দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে টানা তিন ঘণ্টা বৈঠকে বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে চাঁদাবাজি বন্ধের বিষয়টি প্রাধান্য পায়।
পরিবহন মলিক ও শ্রমিক সমিতি সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-মাওয়া, দৌলতদিয়া-ফরিদপুর-মাগুরা-খুলনা, ঢাকা-বগুড়া, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-বরিশালসহ বিভিন্ন মহাসড়কে জায়গায় জায়গায় বাস, মিনিবাস, ট্রাক থেকে শুরু করে সিএনজি অটোরিকশার মতো ছোট পরিবহন থেকেও চাঁদা নিচ্ছে পুলিশ।
পাটুরিয়া, দৌলতদিয়া, শিমুলিয়া, কাওড়াকান্দিসহ বিভিন্ন ঘাটে গাড়ির সিরিয়াল দেওয়ার নামেও পুলিশ চাঁদাবাজিতে নেমেছে।
রাজধানী ঢাকার সায়েদাবাদ, গাবতলী, ফুলবাড়িয়া, গুলিস্তানসহ বিভিন্ন টার্মিনাল ও স্ট্যান্ড থেকেও পুলিশ চাঁদা তুলছে। চাঁদা না পেলে গাড়ি আটকে রাখছে রাস্তায়। মামলা ও হয়রানির ভয় দেখিয়ে এই চাঁদাবাজি চলছে।
পরিবহন নেতারা বলছেন, রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে চাঁদাবাজির কারণে রাজধানী ও মহাসড়কে যানজটের মাত্রাও বেড়েছে।
পরিবহন শ্রমিকরা জানান, দেশের অর্থনীতির লাইফ লাইন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে পুলিশের চাঁদাবাজির বড় একটি উৎস। মহাসড়কের কাঁচপুর, দাউদকান্দি, গৌরীপুর, চৌদ্দগ্রাম, মিরসরাই, ধূমঘাট ব্রিজ, বড় দারোগারহাটে বেশি চাঁদাবাজি হচ্ছে। এই মহাসড়কে দিনে এখন গড়ে ৫০ হাজার যানবাহন চলাচল করছে। এর মধ্যে ৬০ শতাংশই পণ্যবাহী। পুলিশের প্রধান টার্গেট এই পণ্যবাহী গাড়ি। পাশাপাশি বাসসহ অন্যান্য পরিবহন থেকেও তোলা হচ্ছে চাঁদা। পুলিশ ধরলেই ৫০০ থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হচ্ছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের বাসচালক মনিরুল ইসলাম বলেন, কাঁচপুর থেকে পুলিশের চাঁদাবাজি শুরু হয়। গাড়ি থামিয়ে কাগজপত্র আছে কি না তা দেখার পর যেকোনো অজুহাতেই চাঁদা চাওয়া হয়। বাসে রাতের বেলা চাঁদা দিতে হচ্ছে বেশি।
২৪ জুন দুপুরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনসহ বিভিন্ন পরিবহন সংগঠনের নেতারা স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সঙ্গে বৈঠক করেন। এতে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী পরিষদের সভাপতি ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী, মহাসড়ক পুলিশের ডিআইজি মল্লিক ফখরুল ইসলামসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তারা।
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।


