তিনি একজন প্রয়াত রাষ্ট্রদূতের স্ত্রী। ওই আমলা মহোদয়ের অকাল মৃত্যুর পর তৎকালীন সরকার মানবিক দিক বিবেচনা করে তাকে সরকারি চাকরিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়। সন্তানরা লেখাপড়া অব্যাহত রাখার স্বার্থে রাষ্ট্রদূতের প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রত্যাশা ও যোগ্যতার চেয়ে বড় পদেই স্ত্রীটিকে পদায়ন করা হয়। শুধু তাই নয়, স্বামীর কর্মস্থল ফ্রান্সের বাংলাদেশ দূতাবাসেই তাকে প্রথম সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। যে চুক্তি নিয়মিত বাড়ানো হচ্ছে। তিনি ফ্রান্সের মতো একটি দেশে প্রথম সচিবের মর্যাদায় কনস্যুলার সেকশনের দায়িত্ব পালন করছেন। তার এই নিয়োগকে শুরুতে সাধুবাদ জানিয়েছিলেন ফ্রান্স প্রবাসী বাংলাদেশিরা। কিন্তু ধীরে ধীরে তার ‘এলিট সোসাইটি’র মানসিকতা প্রকাশ পেতে থাকে। যার প্রত্যক্ষ ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে ফ্রান্সের মতো দেশে বসবাস করতে আসা ‘অবৈধ বাংলাদেশিদের’ ওপর। তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে শুরু থেকেই যোগ্যতা ও মেধার সমন্বয় ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছেন। উন্নাসিক আচরনের কারণে অনেক প্রবাসী বাংলাদেশির স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে। আমলার বিধবা স্ত্রী আবার আমলার চেয়ারে বসেছেন তাই ভুক্তভোগীদের অনেকেই কিছু বলার সাহস পাননি। তবে দীর্ঘদিন পর মানুষের ক্ষোভ ও হতাশার প্রতিকার চেয়ে প্রতিবাদ করেছেন ফ্রান্স প্রবাসী একজন সাহসী মানুষ।
গত ২২ জুন সোমবার ফ্রান্স সফররত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সামনে দূতাবাসের কনস্যুলার সেকশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রথম সচিব পদমর্যাদার (চুক্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত) আনিসা আমিনের উন্নাসিক আচরণের বিবরণ তুলে ধরে এর প্রতিকার চেয়েছেন ফ্রান্স আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দেলওয়ার হোসেন কয়েছ। রাজনৈতিক একটি সভায় তার প্রতিবাদের ভাষা হয়তো একটু রুক্ষ মনে হতে পারে কিন্তু সার্বিক দিক বিবেচনায় এর প্রয়োজনীয়তাকে খাটো করে দেখার কোনো উপায় নেই। যদিও বিভিন্ন অনলাইন সংবাদ মাধ্যমে বিষয়টি বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে কিন্তু বাস্তবতা তা সমর্থন করে না।
ফ্রান্সে রাজনৈতিক আশ্রয় লাভের জন্য আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি আমাদের এশিয়া মহাদেশের ও বেশ কিছু দেশ থেকে প্রচুর উদ্বাস্তু বিভিন্ন রুটে প্রবেশ করছেন। ইউরোপ তথা বিশ্বজুড়ে শরণার্থী সমস্যা ব্যাপক আকার ধারণ করায় ফ্রান্স সরকারও তা নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বৈধভাবে যারা বসবাসের অনুমতি পাচ্ছেন না তাদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন পন্থায় থেকে যাচ্ছেন। ফ্রান্স অভিবাসন আইনের আওতায় এদের অনেকেই পরবর্তীতে বৈধভাবে থাকার অনুমতি পান। বিশেষ করে সমাজবাদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই হার আগের বছরগুলোর তুলনায় অনেক বেড়েছে। যাদের বৈধভাবে থাকার অনুমতি নেই তাদের অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে আটক করেন। আটককৃতদের ডিপোর্টেশন সেন্টারে নেয়ার পর শুরু হয় তাদের জাতীয়তা নির্ধারণের বিষয়। কারণ জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী একজন দেশহীন নাগরিককে কোথাও ফেরত পাঠানোর সুযোগ নেই। জাতীয়তা নির্ধারণের জন্য আটককৃতদের সংশ্লিষ্ট দূতাবাসে নেয়া হয়। যেহেতু তাদের কাছে কোনও বৈধ কাগজ থাকে না এ কারণে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের প্রত্যয়ন পত্রের ভিত্তিতে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়। যার বিরুদ্ধে সেদিন প্রতিবাদ করেছেন দেলওয়ার হোসেন কয়েছ, সে মহিলার অদক্ষতার কারণে অনেককেই প্রত্যয়ন পত্র দিয়ে দেশে ফেরত পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে কয়েছ বলেছেন, জনৈক তরুনকে ফরাসী অভিবাসন কর্তৃপক্ষ জাতীয়তা যাচাইয়ের জন্য দুতাবাসে আনার প্রক্রিয়ার সময় আনিসা আসিনকে অনুরোধ করা হয় প্রত্যয়নপত্র না দেবার জন্য। এ সময় তাকে বলা হয় লাখ লাখ টাকা খরচ করে তরুণটি ফ্রান্সে এসেছিলো। দূতাবাস কর্তৃপক্ষের একটি প্রত্যয়নপত্রের জন্য তাকে খালি হাতে ফেরত পাঠানো হবে। জবাবে আনিসা আমিন বলেন, কে তাকে বলেছিলো লাখ লাখ টাকা খরচ করে ফ্রান্সে আসার জন্য? সঙ্গত কারণেই দেলওয়ার হোসেন কয়েছ বলতে পারেন প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থে আজ বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুর্বের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে এবং তাদের প্রেরিত অর্থের রাজস্ব দিয়েই উনাদের মতো উন্নাসিক ও চুক্তিতে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের বেতন ভাতা দেয়া হচ্ছে। এটা কোন ধরণের মানবিকতা।
আনিসা আমিন চুক্তিতে নিয়োগ পাবার কারণে তার মাঝে রয়েছে পেশাদারিত্বের অভাব। একজন পেশাদার কুটনীতিক কোনও সিদ্ধান্তে আসার আগে নানা কৌশল প্রয়োগ করবেন। অভিযুক্ত মহিলা সে ক্ষেত্রে অসহায় ও আবেগ তাড়িত হয়ে দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত নেন। মহিলার অপেশাদার মনোভাবের কারনে অনেক বাংলাদেশী যুবককে খালিহাতে দেশে ফিরে যেতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এরকম একজন দায়িত্বজ্ঞানহীন মহিলাকে ফ্রান্স থেকে অপসারণের প্রস্তাব উত্থাপন করে যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন দেলওয়ার হোসেন।
এর আগে ২০১১ সালে কনস্যুলার সেকশনের বিরুদ্ধে সচিত্র প্রতিবেদন হয়েছিলো বাংলাদেশী একটি বেসরকারী টেলিভিশনে। সে প্রতিবেদনে অর্থের বিনিময়ে অনেক ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশী পাসপোর্ট প্রদানের বিষয়গুলো প্রমানসহ উপস্থাপন করা হয়েছিলো। সে সময় ও এ সেকশনের দায়িত্বে ছিলেন আনিসা আমিন।
প্রসঙ্গত, ২০০৮ সালের ৩ জানুয়ারী ফ্রান্সে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদুত রুহুল আমিন মস্তিষ্কে রক্তক্ষনের কারনে মৃত্যুবরন করেন। পররাষ্ট্র সার্ভিসের ১৯৮৪ ব্যাচের এ কর্মকর্তা মাত্র ৪৮ বছর বয়সে মারা যান। রাষ্ট্রদুত রুহুল আমিনের মৃত্যুর পর তার সহধর্মীনী আনিসা আমিনকে মানবিক কারণে চুক্তি ভিত্তিতে প্রথম সচিব পদমর্যাদায় নিয়োগ দেয়ার পর থেকে তিনি ফ্রান্সস্থ বাংলাদেশ দুতাবাসে অদ্যাবধি বহাল আছেন।
ইউরোপ ব্যুরো, প্যারিস
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।




Leave a Reply