লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান॥
বাংলা মায়ের হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ মহাজ্ঞানী মহাজন সন্তান অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। চীন ও বাংলার মধ্যে হিমালয়ের উচ্চতায় মৈত্রীর যুগোত্তীর্ণ সেতু তিনিই বাংলাদেশ থেকে প্রথম নির্মাণ করেন।
অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। একটি নাম, একটি দিগন্ত জোড়া ইতিহাস। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী সব মানুষ, বিশেষ করে তিব্বতের গণমানসে তিনি হাজার বছর ধরে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের মতো ভাস্কর, দীপ্যমান। তার অমৃততম অহিংসার ধর্মবাণী ফল্গুধারার মতো প্রবাহিত হয়ে তিব্বতিদের জাতীয় জীবনে বিশাল দিগন্ত মেলে দেয়। প্রশান্তির ও প্রগতির প্রলেপ বুলিয়ে দেয়।
অতীশ দীপঙ্কর দশম শতাব্দীর শেষভাগে ৯৮০ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা জেলার বিক্রমপুর পরগনার বজ যোগীনি গ্রামে এক রাজবংশে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাংলার সন্তান। পূর্ববাংলার সন্তান। ঢাকার সন্তান। হাজার বছরেরও আগে বাংলার জ্যোতির্ময়, মহাজ্ঞানী মহাজন এ সন্তান শুধু বাংলা নয়- সমগ্র ভারতবর্ষ, শ্রীলংকা তথা দক্ষিণ এশিয়া; জাভা, সুমাত্রা, বর্ণিও তথা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া; চীন, জাপান, কোরিয়া তথা পূর্ব এশিয়া অর্থাৎ সমগ্র এশিয়াকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করেন, শান্তির অমীয় বাণী শোনান। অহিংসার মহিমা প্রচার করেন। প্রেমপ্রীতি, ভালোবাসা, সর্বজীবে দয়া, বিনম্রতা ও মানবতাই একমাত্র মুক্তির পথ- অতীশ এ শিক্ষাই দেন।
৩৭ বছর আগে ২৮ জুন, আজকের এই দিনে অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের পবিত্র দেহভস্ম চীন সরকার কর্তৃক বন্ধুত্বের নিদর্শনস্বরূপ বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়। বাংলা মায়ের অঞ্চলনিধি বাংলার সত্যসূর্য আবার ভস্মরূপে স্বদেশের মাটিতে ফিরে আসেন। ১৯৭৮ সালের ১০ জুন জেনারেল জিয়াউর রহমান তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক আসাফউদ্দৌলার নেতৃত্বে ৬ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দলকে চীনে প্রেরণ করেন। ১৬ জুন চীনা বৌদ্ধ সমিতির কার্যালয় কোয়াংশি বৌদ্ধ মন্দিরে সব আনুষ্ঠানিকতায় সম্পাদিত অনুষ্ঠানে পবিত্র দেহভস্মের আধারটি বাংলাদেশের বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের সভাপতি ঢাকা ধর্মরাজিক বৌদ্ধ বিহারের মহামান্য অধ্যক্ষ শ্রীমৎ বিশুদ্ধানন্দন গ্রহণ করেন। ১০ ভাদ্র ১৩৮৫ বাংলা, ২৩ জুন ১৯৭৮ পবিত্র দেহভস্ম আধার উন্মোচন করতে গিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সৈয়দ আলী আহসান বলেছিলেন- পাণ্ডিত্য ও প্রজ্ঞার জন্য শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর সর্বকালে সমগ্র বিশ্বে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। এমন অসাধারণ পাণ্ডিত্য, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং ভাষা জ্ঞানের অধিকারী শুধু সেকালের জন্য নয়, একালের জন্যও বিস্ময়কর।
অতীশ দীপঙ্করের জীবন, কর্ম ও শিক্ষা বর্ণনা করতে গিয়ে বলতে হয় মূলত তার তিব্বত অবস্থানের কথা। তিব্বত রাজ চ্যাং চুব বারবার রাজকীয় দূত প্রেরণ করে আমন্ত্রণ জানালে অবশেষে অতীশ তিব্বত যান। সেখানে তাকে সর্বোচ্চ সম্মান ও অভ্যর্থনা জানানো হয়। রাজা চ্যাং চুব প্রজাদের উদ্দেশে ঘোষণা করেন, দীপঙ্করকে তিব্বতের মহাচার্য ও ধর্মগুরু হিসেবে মান্য করা হবে। বাস্তবে দীপঙ্কর তার চেয়েও অনেক বেশি সম্মান পান।
তিব্বতে থো-লিং বিহার ছিল দীপঙ্করের মূল কর্মকেন্দ্র। এ বিহারে তিনি দেবতার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। এখান থেকেই তিনি তিব্বতের সর্বত্র ঘুরে ঘুরে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করেন। তার অক্লান্ত প্রচেষ্টায় তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্মের অনেক কুসংস্কার দূর হয় এবং বিশুদ্ধ বৌদ্ধ ধর্মাচার প্রতিষ্ঠিত হয়। তিব্বতে তিনি বৌদ্ধ ধর্মের ব্যাপক সংস্কার সাধন করেন। তিব্বতবাসীরা তাকে বুদ্ধের পরই শ্রেষ্ঠ গুরু হিসেবে সম্মান ও পূজা করে এবং মহাপ্রভু (জোবো ছেনপো) হিসেবে মান্য করে। তিব্বতের ধর্ম ও সংস্কৃতিতে দীপঙ্করের প্রভাব অদ্যাপি বিদ্যমান। তিব্বতে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে তিনি সেখানে নদীতে বাঁধ দিয়ে বন্যা প্রতিরোধের মাধ্যমে জনহিতকর কাজেও অংশগ্রহণ করেন।
দীপঙ্কর তিব্বতের ধর্ম, রাজনীতি, জীবনীগ্রন্থ, স্ত্রোতনামাসহ তাঞ্জুর নামে এক বিশাল শাস্ত্রগ্রন্থ সংকলন করে প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেন। তাই অতীত তিব্বতের যে কোনো বিষয়ে আলোচনা দীপঙ্করকে ছাড়া সম্ভব নয়। তিনি দুই শতাধিক গ্রন্থ রচনা, অনুবাদ ও সম্পাদনা করেন। তিনি তিব্বতি ভাষায় বৌদ্ধ শাস্ত্র, চিকিৎসাবিদ্যা ও কারিগরি বিদ্যা সম্পর্কে অনেক গ্রন্থ রচনা করেন। তিব্বতিরা তাকে সর্বজ্ঞানে শ্রেষ্ঠ, সর্ববিদ্যায় বিশারদ, সর্বশ্রেষ্ঠ, অতীশ উপাধিতে ভূষিত করেন। সুদীর্ঘ ১৩ বছর তিব্বতে অবস্থানের পর দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান ৭৩ বছর বয়সে তিব্বতের লাসা নগরীর কাছে লেথানপল্লীতে ১০৫৩ খ্রিস্টাব্দে দেহ ত্যাগ করেন।
ঊনবিংশ শতাব্দীর বরেণ্য ঐতিহাসিক, গবেষক ও সাহিত্যিক ড. দীনেশ চন্দ্র সেন অতীশ দীপঙ্কর সম্পর্কে লিখেছেন, এই একজন পূর্ববঙ্গের বাঙালি, যিনি তৎকালীন জগতে অদ্বিতীয় যশ অর্জন করিয়াছেন। নেপালের রাজা অনুগত পরিকরের মতো তাহার আজ্ঞার প্রতীক্ষা করিতেন। নেপালের যুবরাজ তৎ-কর্তৃক ভিক্ষুধর্মে দীক্ষিত হইয়া তাহার সঙ্গে ফিরিতেন। তিব্বতরাজ তাহাকে স্বদেশে আনিবার চেষ্টায় জলের মতো অর্থ ব্যয় করিলেন। সেই চেষ্টায় তাহার বহু অর্থ ও লোকক্ষয় হইল এবং সেজন্য তিনি শত্রু কর্তৃক কারাগারে নিক্ষিপ্ত হইয়া কারাগারেই প্রাণ ত্যাগ করিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি দীপঙ্করের কাছে আশীর্বাদ প্রার্থনার বাণী প্রেরণ করিয়াছিলেন। যবদ্বীপের (সুবর্ণ দ্বীপ) রাজা ধর্মপাল দীপঙ্করের কাছে জিজ্ঞাসু হইয়া ধর্মবিষয়ক নানা জটিল প্রশ্ন উত্থাপন করিয়া সুদীর্ঘ পত্র লিখিয়াছিলেন। গৌড়েশ্বর ন্যায়পালের সঙ্গে তাহার সর্বদা পত্র ব্যবহার চলিত। এক কথায় জীবিত কালের দীপঙ্কর সমস্ত এশিয়ার সম্রাটগণের পূজনীয়, অসীম ভক্তি ও শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন এবং এখনও বিশাল বৌদ্ধরাজ্যে তাহার প্রতিষ্ঠা অপ্রমেয়। কথিত আছে, চীন দেশের অমিত বিক্রম সম্রাটরা দীপঙ্করের নাম শুনিলেই সিংহাসন হইতে নামিয়া দাঁড়াইয়া শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করিতেন।
অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান বাংলার মহান গৌরব। বাংলার সভ্যতা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের মহান ধারক ও বাহক। তিনি চীন ও বাংলাদেশ মৈত্রীর প্রতীক, প্রাচীন সেতুবন্ধ। বাংলায় অতীশের জন্মগ্রহণ, চীনে মৃত্যুবরণ, এশিয়া মহাদেশজুড়ে তার পরিভ্রমণ আর জ্ঞানের আলো বিকিরণ। আজ হাজার বছর পরও তিনি সদা জাগ্রত, গভীরভাবে অনুভূত। অতীশ কখনও বিস্মৃত হওয়ার নয়। অতীশকে আমরা বাংলাদেশের মানুষ, চীন দেশের মানুষ বন্দনা জানাই, বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করি।
অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চীন ও বাংলাদেশের মৈত্রীর প্রাচীন সেতুবন্ধন। সহস্র বছর আগে তিনি মহাকালজয়ী মৈত্রী মিলনের যে বন্ধন রচনা করে গেছেন, তা যুগে যুগে শতাব্দীতে শতাব্দীতে দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর, ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর হয়ে আমাদের দুই দেশের সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে। আমাদের দুই দেশের জনগণকে আরও একত্রিত ও নিবিড় করেছে। বাংলাদেশ আজ স্বাধীন-সার্বভৌম এক গর্বিত দেশ। চীন ও বাংলাদেশের রাষ্ট্র পর্যায়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ৪০ বছর আগামী ৪ অক্টোবর উদযাপিত হবে। সেই উপলক্ষে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং বাংলাদেশ সফরে আসছেন। মহান অতীশের পথ ধরে তিনি চীন ও বাংলাদেশের মৈত্রী সুদৃঢ়করণে ভূমিকা রাখবেন। যা আগামী দিনে সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে, নতুন উচ্চতায় ঊর্ধ্বগগনে উত্থান ঘটাবে।
জয় হোক অতীশের, অতীশ চেতনার। হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বি থেকে দূরীভূত হোক সব সংঘাত আর হানাহানি। বিতাড়িত হোক যা কিছু অকল্যাণ, অমঙ্গল, অশুভ ও অসূচি।
লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান : সাবেক সেনাপ্রধান।
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।



Leave a Reply