সারা দেশে ছোট-বড় মিলে ওষুধের দোকান প্রায় চার লাখ। এর মধ্যে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর থেকে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ফার্মেসির সংখ্যা এক লাখের কিছু বেশি। বাকি সবই অনুমোদনহীন। এসব ফার্মেসির কোনোটিতেই ফার্মাসিস্ট নেই, যদিও ফার্মাসিস্ট ছাড়া ওষুধের দোকান পরিচালনা করা যাবে না বলে নির্দেশনা রয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের।
আর ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার ৮ জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে খুচরা পর্যায়ে অ্যালোপ্যাথিক ওষুধের লাইসেন্স রয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৩৩০টি। এ হিসাবে দেখা গেছে, প্রায় তিন লাখ ওষুধের দোকানের লাইসেন্স নেই। অর্থাত এসব দোকানে কোনো ফার্মাসিস্টও নেই। এছাড়া যেসব দোকানে লাইসেন্স রয়েছে, সেখানেও ফার্মাসিস্ট নেই। অর্থাত প্রায় ৮৫ শতাংশ দোকানই চলছে ফার্মাসিস্টবিহীন।
ওষুধবিদ্যা বিশেষজ্ঞরা জানান, একটি ফার্মেসিতে রোগীরা অনেক ধরনের সেবা পাবেন। রোগীর ব্যবস্থাপত্র পরীক্ষা, বয়স অনুযায়ী ওষুধের মাত্রা ঠিকমতো দেয়া হয়েছে কিনা, তা যাচাই, কোন অবস্থায় রোগী ওষুধ খাওয়া চালিয়ে যাবেন এবং কোন ধরনের সমস্যা হলে ওষুধ বন্ধ করে দিতে হবে, সে বিষয়ে পরামর্শ, ব্যবস্থাপত্রে লেখা থাকলেও একটি ওষুধের সঙ্গে অন্যটির কোনো বিরোধ রয়েছে কিনা, তা দেখাসহ বিভিন্ন ধরনের সেবা ফার্মেসি থেকে পাওয়ার কথা। আর রোগীদের এসব সেবা দেয়ার জন্য প্রতিটি ফার্মেসিতে থাকা চাই অন্তত একজন ফার্মাসিস্ট। কিন্তু দেশে যেসব ফার্মেসি রয়েছে, সেখানে এসব বিষয়ে জ্ঞান রাখে এমন ফার্মাসিস্ট নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের ওষুধের দোকানগুলোকে ফার্মেসি বলা ঠিক হবে না। কারণ ফার্মেসিতে অবশ্যই একজন ফার্মাসিস্ট থাকবেন। যিনি চিকিত্সকের ব্যবস্থাপত্র পর্যবেক্ষণ করে রোগীকে ওষুধ দেবেন। যার থাকবে ওষুধের গুণাগুণ, ব্যবহার, প্রয়োগবিধি, কার্যকর বা ক্ষতি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা।
দেশে ফার্মাসিস্ট রয়েছে তিন ক্যাটাগরির। ‘এ’ ক্যাটাগরির ফার্মাসিস্টরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্মেসি বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রিধারী। ‘বি’ ক্যাটাগরির ফার্মাসিস্টরা চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা কোর্সধারী। আর ‘সি’ ক্যাটাগরির ফার্মাসিস্টরা তিন মাসের কোর্সধারী, যাদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা মাধ্যমিক পাস। এই ‘সি’ ক্যাটাগরির ফার্মাসিস্ট দিয়ে চলছে ওষুধের দোকান। আর তারাই বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির সহায়তায় তৈরি করেছে ফার্মেসি কাউন্সিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে ‘এ’ ক্যাটাগরির ফার্মাসিস্ট রয়েছেন ছয় থেকে সাত হাজার, ‘বি’ ক্যাটাগরির আট থেকে ১০ হাজার ও ‘সি’ ক্যাটাগরির ৭০ থেকে ৮০ হাজার। এদের মধ্যে ‘এ’ ক্যাটাগরির অধিকাংশই ওষুধ কোম্পানি কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানে উচ্চ বেতনে কর্মরত। আর ‘বি’ ক্যাটাগরির অনেকেই সরকারি চাকরিতে নিযুক্ত। তবে হাতেগোনা কয়েকজন নিজে দোকান নিয়ে ওষুধের ব্যবসা করছেন। ‘সি’ ক্যাটাগরির ফার্মাসিস্টরা মূলত ওষুধের দোকান পরিচালনা করে থাকেন। কিন্তু অধিকাংশ দোকানে তা-ও থাকছে না।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক বণিক বার্তাকে বলেন, ওষুধের দোকানে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট থাকা জরুরি। কিন্তু এ দেশে তা নেই। দেশে ফার্মেসির নামে যেসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা হচ্ছে, সেগুলো মূলত ড্রাগ স্টোর। কারণ বিক্রেতা শুধু ওষুধ বিক্রি থেকে মুনাফাই বোঝেন, ওষুধের সুফল বা কুফল সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই।
তবে সরকারের উচিত, ‘সি’ ক্যাটাগরির যেসব ফার্মাসিস্ট রয়েছেন, তাদের ওষুধের গুণাগুণ সম্পর্কে প্রশিক্ষিত করে তোলা।
বিষয়টি নিয়ে সরকারি পর্যায়েও আলাপ-আলোচনা চলছে। গত ১০ মে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সভাপতিত্বে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ‘বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের উন্নয়ন’ বিষয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভার সিদ্ধান্তে বলা হয়, ‘ফার্মাসিস্ট ছাড়া ওষুধের দোকান পরিচালনা করা যাবে না এবং ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরকে প্রতিটি ওষুধের দোকান পরিদর্শনপূর্বক ফার্মাসিস্ট রয়েছে কিনা, তা নিশ্চিত করতে হবে। ফার্মাসিস্টবিহীন ওষুধের দোকানের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নিতে হবে।’
সভায় এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয় ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর, বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিল ও বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতিকে।
বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে সারা দেশে ওষুধের দোকান রয়েছে প্রায় চার লাখ। এদের মধ্যে গ্রামগঞ্জে যেসব দোকান রয়েছে, তার প্রায় শতভাগেরই লাইসেন্স নেই। এসব দোকানে মূলত নকল, ভেজাল, মেয়াদোত্তীর্ণ ও মানহীন ওষুধ বিক্রি করা হয়।
এ বিষয়ে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের পরিচালক গোলাম কিবরিয়া বলেন, দেশের বিভিন্ন ওষুধের দোকানে ফার্মাসিস্ট রয়েছে কিনা, তা নিশ্চিত করতে ড্রাগ সুপারদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। ড্রাগ সুপাররা ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করছেন কিনা, তা তদারকির জন্য পরিচালক ও উপপরিচালকদের সমন্বয়ে দায়িত্ব বণ্টন করে দেয়া হয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।



Leave a Reply