বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

আব্বাসউদ্দীন কি বানের জলে ভেসে এসেছে?

mustafa-zaman-abbasiমুস্তাফা জামান আব্বাসী॥
পিতা আব্বাসউদ্দীনের মৃত্যুর পঞ্চাশ বছর পরও যখন লোকে আমার কাছে তার সম্বন্ধে নানা কথা জানতে আসে, অবাক হয়ে যাই। মসজিদে, বাসস্ট্যান্ডে, রেলের কামরায় হাজারো মানুষ এখনো জিজ্ঞেস করে তার কথা। ছেলে বুড়ো নির্বিশেষে। ভাবি, মানুষের জন্য যা কিছু সম্মানজনক, কার কাছ থেকে আসে সে সম্মান? কে তাকে দিলো এই সম্মান? দেশবাসী নিশ্চয়ই আব্বাসউদ্দীনকে ভালোবেসেছেন অমর সুরবাণীর কারণে, সেটাই কি শেষ কথা? সারা রাত ধরে ভাবছি এই কথা। অথচ তার নামে নেই কোনো রাস্তাঘাট, নেই কোনো হল বা খেয়াঘাট, তাকে নিয়ে নেই উচ্চবাচ্য। নামটি যেন ভেসে এসেছে বানের জলে। যারা সরকারে ছিলেন সেদিন, আজ আছেন এবং কালও থাকবেন, তারা গান শুনেই খালাস। টেলিভিশনে এদের বাহারি চেহারা দেখি, এরা কোথা থেকে এসেছেন তাও জানি। আমার পিতার জন্য এগুলোর প্রয়োজন হয়নি। তিনি সম্মান পেয়েছেন আসল স্থান থেকে। তা বলতেই আজকের লেখা।

‘বাংলার বুলবুল’ বলতে আমার পিতাকেই বোঝায়। তার মতো সুরসম্মত দরদী কণ্ঠ আর ক’জনের? সরকারি সম্মান না মিললেও মিলেছে কোটি মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত দোয়া ও নীরব সমর্থন। ‘শেরেবাংলা’ ফজলুল হক সম্পর্কে আজকাল তেমন কিছু শোনা যায় না। তা হলে কী হবে? ‘শেরেবাংলা’ একজনই। ‘মজলুম জননেতা’ বলতে একজনকেই বোঝায়। তিনিই মওলানা ভাসানী। এ সম্মান কেউ কেড়ে নিতে পারবে কি? কখনোই না। বঙ্গবন্ধুর সম্মান তার নামেই। তিনি মানুষের বন্ধু ছিলেন, বাংলার বন্ধু ছিলেন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সম্পর্কে একই কথা। এ সম্মান কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। যতই চেষ্টা করতে থাকুক।

এর কারণ কী? খুঁজে খুঁজে বের করলাম সুরা নিসার ১৩৯ আয়াত। স্পষ্ট করে আল্লাহ্ বলছেন, তোমরা কার কাছে সম্মান চাচ্ছ? মুনাফিকদের কাছে? কাফেরদের কাছে? এ সম্মান নিরর্থক। এ সম্মান টিকবে না। কারণ, সব ইজ্জতের মালিক আমি আল্লাহ্। আমি যাকে ইজ্জত দেবো না, সে কোনো দিন ইজ্জত পাবে না। হাজার বছর পরেও মুনাফিকদের ইজ্জতনামা কেউ খুঁজে পাবে না। অথচ মরুভূমির তলদেশ থেকে আল্লাহ্ যাদের ইজ্জত দিয়েছেন তাদের নাম খুঁজে বের করা হবে। আমি এটা আগে তেমন বুঝতাম না। নিফফারি ছিলেন আল্লাহ্তে নিবেদিত একজন পাগল মানুষ। সারা দিন আল্লাহ্র জিকিরে মত্ত। সারা দিন কী বলতেন বিড়বিড় করে কেউ বুঝতে পারেনি। তার ছেলে সেগুলো সংগ্রহ করেছিল বলেই আজ আমরা নিফফারিকে চিনতে পারি। সেগুলো ছিল প্রভুর সঙ্গে কথোপকথন।

যখন প্রথম ইংরেজিতে ছাপা হয়, পৃথিবী অবাক। লাখ লাখ কপি বিক্রি। বাংলাভাষায় প্রথম সেগুলোর অনুবাদ যখন প্রকাশিত হয়, মানুষ পাগল হয়ে আমাকে ফোন করতে থাকে। এগুলো কোথায় পেলেন? আমিও অবাক! বারবার পড়তে থাকি এবং হঠাৎ প্রভুর সামনে এসে হাজির হই। আমার ভাই মোস্তাফা কামাল যখন আমার লেখা বইটি পাঠ করেন, সঙ্গে সঙ্গে আমার বাসায় চলে আসেন এবং বলেন : এগুলো তুই কোথায় পেলি? তিনি বারবার পড়ছিলেন এবং মনে হচ্ছিল তিনি নিফফারির সাথে একাত্ম হয়ে গেছেন। এরই নাম সম্মান দেয়া। সবচেয়ে বড় সম্মান প্রভুর সামনে উপস্থিতি। যারা প্রভুর সাথে দেখা হওয়া অস্বীকার করেন, তাদের কাছে স্বীকৃতি চাই না।

প্রভুর স্বীকৃতি পেলে আর কারো প্রয়োজন নেই, সুইডেনে বা অন্যত্র যাওয়ার যেখানে আমরা বড়লোকদের কাছে নতজানু সম্মানের প্রত্যাশায়। ওটাও সম্মান, অস্বীকার করি না। কিন্তু আল্লাহ্কে যে পরিপূর্ণ সমর্থন করেছে সে কখনো পুবে বা পশ্চিমে গিয়ে ওই সম্মানের দ্বারবর্তী হবে না। ওই সম্মান অনেক বড়। যারা আমাদের দুই শ’ বছর শোষণ করেছে তাদের সঙ্গে গিয়ে ডিনার খাই, ওদের হ্যাট কোট টাই পরে বড় মানুষ সাজি। এগুলো সবই অর্জন। রবীন্দ্রনাথ ‘স্যার’ উপাধি কেন বর্জন করেছিলেন তা ভেবে দেখি না। গত বছর জালিয়ানওয়ালাবাগে একটি সকাল অতিবাহিত করার পর তা বুঝতে পেরেছি। ইংরেজরা শত শত নিরীহ মানুষকে গুলি করে মেরেছিল।

সূরা নিসার আয়াত ১৩৯-এর তাফসিরে সা’ল তুশ্তারি যা বলেছেন, তার অনুবাদ আগামী বছর প্রকাশিত করব। সংক্ষেপে : রাসূলুল্লাহ্ সা:-এর সময়ে যারা মুনাফিক ছিল তাদের সাথে ছিল ইহুদিদের যোগাযোগ। যত দিন পৃথিবী থাকবে তত দিন মুনাফিকরা ইহুদিদের সঙ্গ ছাড়বে বলে মনে হয় না। শয়তান প্রকাশ্য শত্রু। ইহুদিরা আমাদের মিত্র নয়। ওদের মন নরম হবে না। মমিনদের ওরা স্বীকৃতি দেবে না। তার প্রয়োজনও নেই। আল্লাহ্ যার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন, সে পাবে মহাসাফল্য [ফওজুল আজিম]।

যে মসজিদে সালাত আদায় করি, তারা জায়নামাজ বিছিয়েছেন একমাত্র আল্লাহ্র জন্য। দিনরাত কুরআন শরিফ পড়ছেন। এদিক-ওদিক কেউ তাকাচ্ছেন না, কেউ কাউকে চিনি না, কোনো দিকে কারো ভ্রুক্ষেপ নেই। কারো সমর্থন চাই না, শুধু চাই তার সমর্থন। এটাই সালাত আদায়কারীদের লক্ষ্য। সঙ্গীসাথীরা তদবির করে নানা তমগা আদায় করে নিয়েছেন রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে। তারা সবাই আমার বন্ধু। ওদের সম্মানে ঈর্ষান্বিত নই। এদের সবার প্রতি অক্ষুন্ন আমার ভালোবাসা ও সম্মান। কিন্তু ভাইসাব, তদবিরের ফসল টিকবে না। এ সম্মান শুধু আজকের দিনের। ক্ষণিকের সম্মান ক্ষণিক দিনের পরেই হবে অবসান। একমাত্র রাব্বুল ইজ্জতের খেয়াল করবেন যারা তাদের জন্যই চিরদিনের সম্মান। আজকের যেটুকু মূল্য পেয়েছেন সেটুকু নিয়ে খুশি থাকুন। চেষ্টা করে যাই যেন আল্লাহ্র সামনে খানিকটা সম্মান পাই, যেন আমাকে সেখান থেকে ছিটকে পড়তে না হয় আগুনে, যে শাস্তির অগ্নিকুণ্ডের ভয়ে আমরা কম্পিত।

লেখক: সাহিত্য-সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব।

নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *