বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

মন্ত্রী হয়ে আশরাফের সম্পদ কমেছে

Maskwasaith-Ahsanমাসকাওয়াথ আহসান॥

মুক্তিযুদ্ধ অর্জনের পর বঙ্গবন্ধু যেদিন বন্দী অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম পা রাখলেন, সেদিন বিমান বন্দরে তিন-চারজন তৎকালীন গ্যাং লিডার (মুশতাকসহ) বঙ্গবন্ধুর কানের কাছে ফিসফিস করে বলেন, তাজউদ্দীন বেশী কড়া লোক; কর্মীরা আশাহত, পথের বাধা সরিয়ে নিন। বঙ্গবন্ধু যুদ্ধাহত একটি দেশে নানা ষড়যন্ত্রের মাঝে খুবই বিপন্ন বোধ করছিলেন। বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে কিছু ঋণ জরুরি ছিলো। তাজউদ্দীন একরোখা মানুষ; উনি আত্মনির্ভর উন্নয়ন কৌশলে আগ্রহী ছিলেন। এই দ্বৈতদ্বন্দ্বের মাঝে মুশতাক অতিশয় আনুগত্যমলিন ভক্তিনেত্রে বঙ্গবন্ধুকে প্রতিদিন নিয়ম করে ‘কানপড়া’ দিয়ে যেতেন। ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতিতে কানপড়া এক সফল মন্ত্র কৌশল। ফলে সরে যেতে হয় তাজউদ্দীনকে; এই যে যেমন সৈয়দ আশরাফ সরে গেলেন। ইতিহাসের ভ্রান্তি থেকে শিক্ষা নেয়া যে আমাদের ধাতে নেই।

সৈয়দ আশরাফের দিন শুরু হয় অনেক ভোরে। প্রথমেই উনি অনলাইন পত্রিকাগুলোতে চোখ বুলিয়ে নেন। ওনার মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত রিপোর্টের ক্লিপিংস ফাইলের জন্য অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। দেখে নেন মিডিয়ায় দল সম্পর্কিত আর কী গুজব আছে, পশ্চিমা মানবাধিকার ও নৈতিকতার দোকানীদের খেলাধূলার গতি প্রকৃতিও দেখে নেন। কারণ মিডিয়া আর পশ্চিমা শক্তির এক্কা দোক্কা খেলাটি সম্পর্কে উনি যথেষ্ট জানেন। সে কারণেই টকশোতে বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিবেশন, অপসাংবাদিকতা এবং নোবেল পুরস্কার বাগিয়ে পশ্চিমা মদদে ক্ষমতায় বসে যাবার সাপলুডু খেলা সম্পর্কে তিনিই বারবার জাতিকে সাবধান করেছেন।

একটা মিথ্যা কথা কয়েকশোবার বললেই সত্যি হয়ে যায় গ্রামাঞ্চলে। সুতরাং উনি এখন দপ্তর বিহীন মন্ত্রী। অথচ এই সৈয়দ আশরাফ মন্ত্রীত্বে এসে উনার ব্যক্তিগত সম্পদ কমেছে। বেতনের বাইরে একটি পয়সা, একটি সুবিধা নেয়া উনার জীনে নেই, পারিবারিক শিক্ষায় নেই। অথচ মন্ত্রী হলে স্বাভাবিকভাবেই কিছু হাই প্রোফাইল অতিথি আপ্যায়ন করতে হয়। একে বলা হয় নেটওয়ার্কিং। এটা অন্যেরা নিজেদের জন্য করে; সৈয়দ আশরাফ করেছেন দেশের জন্য। ফলে বেতনের অর্থে কুলায়নি; ব্যক্তিগত সঞ্চয়ে হাত পড়েছে। তবে দক্ষিণ এশিয়া তন্ন তন্ন করে খুঁজে আজকের এই অন্ধকার যুগে সৈয়দ আশরাফের মত সৎ মন্ত্রী পাওয়া যাবে না; এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।

কারণ ভারত-পাকিস্তানের সাম্প্রতিক-তম সব স্থানীয় সরকার মন্ত্রীরা গড়েছে টাকার পাহাড়। যে কারণে ভারতে কংগ্রেস ও পাকিস্তানে  পিপলস পার্টি ক্ষমতাচ্যুত। বর্তমানে উভয় রাষ্ট্রের মৌলবাদী সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রীরাও সম্পদের এভারেস্ট ও কে-টু গড়তে ব্যস্ত।  সৈয়দ আশরাফ অন্ধকার অরণ্যে সততার দ্যুতি হয়ে রয়ে গেলেন আমাদের মানসপটে।

সব হেরে যাওয়াই হেরে যাওয়া নয়। কখনো কখনো হেরে যাওয়াই জিতে যাওয়া। আর সৈয়দ আশরাফতো জীবনকে কোন রেসই মনে করেননি।তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের বারান্দায়-টকশোতে-শোবিজে আইকন খুঁজে কী লাভ?

সততা আর শিষ্টতার অনিবার্য আইকন সৈয়দ আশরাফ। হোক এখন কাজ করছি কাজ করছি কাজ দেখানোর ছাগল নাইয়া থিয়েটার। নিভৃতে অন্তর্মুখিতার নৈঃশব্দে কাজ আজকের পলিটিক্যাল গ্যাং-বাজারে অচল। সার্বিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক নিমজ্জনের সময়ে এই বেশ ভালো। পচা ডিম বিক্রি বা পচা ডিম দিয়ে উন্নয়নের পাউরুটি তৈরির এই সার্কাসে জোকারেরাই নাকে লাল বল লাগিয়ে নৃত্য করুক।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *