বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

জাতীয় পতাকা জায়নামাজ হলে সেক্যুলারদের লাগে কেন?

Badhan____123456789_0বাধন অধিকারী।

বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাকে জায়নামাজ হিসেবে ব্যবহার করে ধর্মপ্রাণ একজন মুসলমান নামাজ আদায় করছেন; সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর তা নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা সমালোচনা। স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে গিয়ে নামাজ আদায়ের সময় তিনি জায়নামাজ হিসেবে পতাকাটি ব্যবহার করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

একটি ছবিই বলে দিতে পারে অনেককিছু; একটি ছবির অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকতে পারে না বলা অনেক কথা। একটি ছবির টেক্টট বিচার করে খুঁজে পাওয়া সম্ভব এর কনটেন্ট। না, এইসব তাত্ত্বিক আলাপ এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আলাপের উদ্দেশ্য, ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটা ছবি।

‘সেক্যুলার’ বলে পরিচিত এক পক্ষের দাবি, এতে জাতীয় পতাকার অবমাননা হয়েছে। তবে আরেক দলের মতে, জাতীয় পতাকা পবিত্র জায়নামাজের মতো করে ব্যবহৃত করলে পতাকার মর্যাদক্ষুণ্ন হতে পারে না। যাই হোক, দ্বিতীয় পক্ষ আমার আলোচ্য নয়।

(আমার আলোচনা প্রথম পক্ষকে নিয়ে, যারা ‘সেক্যুলার’ বলে পরিচিত। উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে সেক্যুলার ব্যবহারের কারণ একটি বিশেষ শ্রেণীর সেক্যুলারদের কথা বলছি, সবার কথা না।)

‘সেক্যুলার’ পক্ষ জাতীয় পতাকার মর্যাদা রক্ষায় সদা সচেষ্ট। এই মর্যাদার রাজনীতিটা বুঝতে চেষ্টা করাই এই ছোট্ট লেখার উদ্দেশ্য।

আমরা কে না জানি, সেক্যুলার জাতিরাষ্ট্রের ধারণা ধর্ম আর রাষ্ট্রের পৃথকীকরণ চায়। তারা চায় রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিতে ধর্মের কোনো স্থান থাকবে না। রাষ্ট্রীয় নীতিপদ্ধতি হবে স্বতন্ত্র। কিন্তু সেই স্বতন্ত্র রীতিপদ্ধতি বানাতে গিয়ে জাতিরাষ্ট্রের কারিগরেরা আরেকটা ধর্ম খাড়া করেছে। সুবিখ্যাত নৃবিজ্ঞানী তালাল আসাদ তার ধর্ম ও জাতিরাষ্ট্র নামের প্রবন্ধে কার্লটন হায়েসের বরাতে জানান, জাতীয়তাবাদের বিশেষ কিছু দ্বান্দ্বিক ক্ষেত্র থাকলেও সামগ্রিকভাবে এটি বিশ্ব-ধর্মের নতুনতম ও নিকটতম দৃষ্টিভঙ্গি। ১৯২৬ সালেই নাকি হায়েস এ কথা বলে গিয়েছিলেন।

পূর্বসূরীদের প্রেরণাসমেত আসাদ তার রচনায় আমাদের সামনে যে বাস্তবতা হাজির করেন, তার সরল পাঠ নিলে আমরা টের পাব; আদতে আধুনিক জাতিরাষ্ট্র ধর্মশাস্ত্রকে ছাড়তে পারেনি। ধর্মীয় অনুশাসনের যে ধরন, যে প্রথা আর কায়দাকানুন; জাতিরাষ্ট্রও গড়ে উঠেছে তার আদলে। ধর্মে সর্বময় ক্ষমতা মহান আল্লাহতালাহর। সার্বভৌম ক্ষমতার নামে জাতিরাষ্ট্র সেই ক্ষমতা দখল করেছে। ধর্মে জীবন-মৃত্যুর একমাত্র মালিক আল্লাহ। আর জাতিরাষ্ট্রে এই ক্ষমতা রাষ্ট্রের নিজের, আইন-আদালতের মাধ্যমে। এমনি করেই কিন্তু ধর্মে যেমন প্রতিক হিসেবে জায়নামাজ পবিত্র, জাতিরাষ্ট্রে তেমনি প্রতিক হিসেবে পতাকা পবিত্র! একারণেই রাষ্ট্র আর ধর্মে পার্থক্য থাকলেও আধুনিক জাতিরাষ্ট্র আদতে ধর্মের শাস্ত্রীয় পাটাতনের আদলেই গড়ে উঠেছে। ‘সেক্যুলার’রাও সেই আদলের মাঝেই বিরাজিত। বাংলাদেশও ওই কথিত পবিত্রতার ফাঁদে পড়েছে। ‘সেক্যুলার’রাও সেই ধর্মীয় ফাঁদে পা দিয়েছে!

তালাল আসাদের সুবাদেই জেনেছি ক্লিফোরড গিয়ারজ নামের একজন নৃবিজ্ঞানী জাতীয়তাবাদী বা জাতীয়তাবাদ-পূর্ব কিংবা আধুনিক বা আধুনিকতা-পূর্ব সকল সমাজে ধর্মীয় অনুভূতি থেকে শুর“ করে রাজনৈতিক জীবনের সকল ক্ষেত্রেই পবিত্র প্রতীকের প্রতি কেন্দ্রিমুখিতা চিহ্নিত করে গেছেন। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রথা পদ্ধতি (কুচকাওয়াজ, সেলাম গ্রহণ ইত্যাদি ইত্যাদি) কে তিনি পবিত্র প্রতিকের প্রতি কেন্দ্রিমুখিতা আকারে ব্যাখ্যা করতে সমর্থ হয়েছেন। আমাদের পবিত্রতার মামলা জায়নামাজ আর জাতীয় পতাকা নিয়ে।

হুম, উপরের আলাপের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই ‘সেক্যুলার’ জাতীয়তাবাদীরা চরম রেগে গেছেন জাতীয় পতাকাকে জায়নামাজ হিসেবে ব্যবহার করায়। ধর্মীয় ফতোয়াবাজদের মতো করে রাষ্ট্রীয় ফতোয়াবাজীর সুরে তারা বলতে চাইছে ‘পবিত্র জাতীয় পতাকা’কে জায়নামাজ হিসেবে ব্যবহার করা অন্যায়। খেয়াল করে দেখছেন না, নামাজরত ধর্মপ্রাণ ওই ব্যক্তির আল্লাহর প্রতি নিষ্ঠার যে ধরন, জাতিরাষ্ট্রের প্রতি তাদের নিষ্ঠার ধরনটাও অনুরূপ। ওই ব্যক্তির কাছে জায়নামাজ তো পবিত্র, আবার জাতীয়তাবাদীদের কাছে পতাকা পবিত্র। তাহলে কি আমরা বলতে পারি না, ধর্মপ্রাণ মুসলমানের ধর্ম ইসলাম আর ধর্মপ্রাণ সেক্যুলারের ধর্ম জাতিরাষ্ট্র!

কিন্তু প্রসঙ্গ এখানেই শেষ নয়। আমাদের পরিসরে দৃশ্যমান আরেকটি প্রবণতা আছে। পাঠক খেয়াল করে দেখেছেন কিনা, ‘সেক্যুলার’দের পবিত্র প্রতিকের প্রতি যে প্রেম, তা যখন ধর্মীয় প্রতিক দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়; তখন তাদের বেশি লাগে। এই বেশি লাগার ফলাফল স্বরূপ গণজাগরণ মঞ্চের একজন সংগঠক ছাত্রনেতা বাপ্পাদিত্য বসু নাকি নামাজ আদায়কারী ওই ব্যক্তির ফাঁসিই চেয়ে বসেছেন। কিন্তু এই ‘সেক্যুলার’রা কি গেলো বছর বিজয়ের মাসে জাতীয় পতাকা হাতে সুপ্রিম কোর্টে শিশ্ন প্রদর্শনকারী যুবকের বিরুদ্ধে একই সমান সরব হয়েছিলেন? কিংবা জাতীয় পতাকা উৎসবের দিন সময় যে শত শত পতাকা পদদলিত হয়েছিলো, তখন তাদের জাতীয় চৈতন্য একই সমান নাড়া দিয়েছিলো কিনা।

তাহলে কি আসল সমস্যাটা ইসলামকে নিয়েই? আপাতত তাই। আর হুম, বিষয়টি কোনোমতেই ধর্মীয় নয়, রাজনৈতিক। রাজনীতিটা সেকুল্যার বনাম ইসলামের রাজনীতি। যে রাজনীতিটা জোর করে দিনকে দিন আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। হেফাজত বনাম শাহবাগ, ব্লগার বনাম ইসলামপন্থী এইসব বিভাজনের রাজনীতির মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের ক্রীড়ানকরা খেলে যাচ্ছে। এই খেলায় নতুন অনুষঙ্গ হয়ে হাজির হয়েছে পতাকা বনাম জায়নামাজ ইস্যু। খেয়াল করে দেখেছেন কি পাঠক, যেখানে চাইলে ‘প্রাণের চেয়েও প্রিয় জাতীয় পতাকাকে’ জায়নামাজ হিসেবে ব্যবহুত হতে দেখে ধর্ম আর রাষ্ট্রের ঐক্যের চৈতন্য শাণিত করতে ওই ইমেজ ব্যবহার করা হবে, উল্টো এটা দিয়ে উস্কানি তৈরী করা হচ্ছে।

এই উসকানিতে সেক্যুলার রাজনীতিক আর তার উচ্ছিষ্টভোগীদের লাভ। এই রাজনীতিতে কাঠমোল্লাদেরও লাভ। তবে এই দুই পক্ষ লাভবান হলে ক্ষতি সেই তাদের; আমরা যারা সাধারণ মানুষ। রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিক। রাজনীতি যাদের শুধু বলিই বানায়। আচ্ছা, জাতীয় পতাকা নিয়ে যারা সরব হলেন, তাদের দেশপ্রেম কোথায় থাকে সীমাহীন লুটপাট-দূর্নীতি-গুম-খুন-মানুষ পুড়িয়ে মারা অব্যাহত থাকতে দেখে? সুমহান একাত্তরের জনযুদ্ধে অর্জিত আমাদের এই বাংলাদেশ, যেখানে ন্যায়বিচার আর সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবার কথা ছিলো, যেখানে জনগণের প্রকৃত অর্থে প্রজাতন্ত্রের মালিক হবার কথা ছিলো, সেই দেশে আমরা কী কায়েম করেছি?

কারওয়ানবাজারের এক পথশিশুকে দেখেছিলাম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া এক ছবিতে, ফুটপাতে বঙ্গবন্ধুর ছবিওয়ালা কোনো এক পোস্টার পেতে শুয়ে আছে। ভাগ্যিস এরজন্য ওকে জেলে যেতে হয়নি। ভাগ্যিস কেউ ওর ফাঁসির দাবি তোলেনি। এবার তাই ভয়ে ভয়ে সেক্যুলারদের প্রশ্ন করি, আচ্ছা, কারওয়ান বাজারের ওই পথশিশুরা, এই জাতিরাষ্ট্র যাদের বাসস্থানের নিশ্চয়তা দিতে পারেনি আজও, যদি হাতের কাছে একটি পতাকা পেয়ে তা পেতে শুয়ে রাত কাটিয়ে দেয়; আপনারা কি তাদের ফাঁসির দাবি তুলবেন? হুম আপনারা তা তুলতেই পারেন। কেননা বাসস্থান দিতে না পারলেও রাষ্ট্র আনুগত্য চায়। সত্যিকারের দেশ দিতে না পারলেও জাতীয় পতাকা সম্মান চায়!
(সূত্র:প্রিয়)

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *