জীবিতাবস্থায় আমি কমরেড অমল সেনকে কখনও দেখিনি। কিন্তু মৃত্যুর পর কি কোনো মানুষকে দেখা যায়? যায়। জীবিতাবস্থায় কোনো মানুষ যদি তাঁর কীর্তি দিয়ে মানুষের মনে পাকাপাকি স্থান করে নিতে পারেন, তবে তাঁর শরীরী মৃত্যু সত্বেও সেই মানুষের কাছে তাঁর কর্মের সন্ধান পাওয়া যায়, আর সেই কর্মের মধ্যেই তো আসল মানুষের খোঁজ থাকে। আমি প্রয়াত কমরেড অমল সেনকে সেভাবেই দেখেছি, মানুষের চোখ দিয়ে, একেবারে গেঁয়ো জল-কাঁদামাখা মাটির মানুষের চোখ দিয়ে। নাগরিক জীবনের কুটিল মানুষের চোখ ভুল দেখতে পারে, কিন্তু মাটির সরল মানুষেরা ভুল দেখেন না।
কমরেড অমল সেন। ঐতিহাসিক তে-ভাগা আন্দোলনের যশোর-নড়াইল অঞ্চলের প্রাণপুরুষ, বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম দিকপাল, এই প্রদর্শনবাদের যুগেও এক্কেবারে খাঁটি কমিউনিস্ট, বহু ভাঙ্গা-গড়ার স্রোত পেরিয়ে আজকের বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।
আমি তখন যশোরে ছাত্র মৈত্রীর রাজনীতির সাথে যুক্ত। রূপদিয়া আঞ্চলিক কমিটির একজন কর্মী। মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হলাম সিঙ্গিয়া আদর্শ ডিগ্রি কলেজে। আমাদের কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ছিলেন রমেশ চন্দ্র অধিকারী। সদ্য বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত হওয়া আমার চোখে ছিল বিপ্লবের স্বপ্ন। সে স্বপ্ন হয়তো আমার চালচলন, কথাবার্তায় ফুঁটে উঠত। রমেশ স্যার হয়তো সেটি খেয়াল করেছিলেন। তখনও জানতাম না, রমেশ স্যার পার্টি করেন কি না। কিন্তু কি যেন মনে হতে স্যার আমাকে একদিন ডেকে জিজ্ঞেস করেছিলেন আমি রাজনীতি করি কি না। স্যারকে বলেছিলাম আমার লাল দুনিয়ার স্বপ্নের কথা। তখন স্যার আমাকে শুনিয়েছিলেন একজন অকৃত্রিম লাল স্বপ্নের মানুষের গল্প। সেই মানুষটি কমরেড অমল সেন। তাঁর নাম আমি আগেই জানতাম। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির প্রাক্তন সভাপতি তিনি। এও জানতাম যে তিনি আমাদের অঞ্চলেরই মানুষ। কিন্তু তাঁর কীর্তিগাঁথা আমার কাছে অজানাই ছিল। রমেশ স্যারের মুখেই প্রথম জেনেছিলাম কমরেড অমল সেনকে। না, অমল সেনের জাতীয় রাজনীতিতে ভূমিকা কিংবা কমিউনিস্টদের ভাঙ্গা-গড়ায় তাঁর অবদান সম্পর্কে স্যার আমাকে বলেন নি। কিন্তু ঘরের মানুষ অমল সেন সম্পর্কে জেনেছিলাম, সেটা ছিল এক অনন্য মানুষের গল্প। বাস্তবে দেখা রাজনৈতিক নেতাদের সাথে তার অনেক কিছুই মেলে না। উল্লেখ্য, রমেশ স্যারের বাড়ি কমরেড অমল সেনের কর্মাঞ্চল এগারখানের মধ্যেই।
এরই মধ্যে একবার ছাত্র মৈত্রী ও ওয়ার্কার্স পার্টির যশোর জেলা নেতৃবৃন্দের কাছে জানলাম কমরেড অমল সেন ঢাকায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। মৃত্যু হয়তো সমাগত। এমনই খারাপ অবস্থা, যেকোনো সময়ে দুঃসংবাদ আসবে। সময়টা যত দূর মনে পড়ে ২০০২ সালের শেষ দিকে। কেন্দ্র থেকে যশোর জেলা পার্টিকে সম্ভবত প্রস্তুতি নেওয়ার বার্তা দেওয়া হয়েছিল। ছাত্র মৈত্রীর কর্মীদের নিয়ে ব্রিগেড গড়া হলো। জেলা পার্টি কার্যালয়ের পাশেই নবকিশলয় বিদ্যালয়ের মাঠে আমরা লাল সালাম জানানোর প্রস্তুতি নিয়েছিলাম দিন তিনেক। কি এক ভারাক্রান্ত অবস্থা! শুনতে খারাপ লাগবে নিশ্চয়ই, মানুষটির মৃত্যুর আগেই আমরা মৃত্যু-পরবর্তী লাল সালাম জানানোর শারিরীক কসরতের প্রস্তুতি নিলাম। খুব খারাপ লাগছিল। কিন্তু কিছু যেন করারও ছিল না। ছাত্র মৈত্রীর তৎকালীন জেলা সভাপতি মফিজউদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক মৌসুমী বিশ্বাসের নেতৃত্বে দিন তিনেক প্রস্তুতির পর হঠাৎ পলিটব্যুরো সদস্য ও জেলা পার্টির সম্পাদক কমরেড ইকবাল কবির জাহিদ জানালেন, কমরেড অমল সেনের অবস্থা উন্নতির দিকে। আমরা আনন্দের সাথেই প্রস্তুতি পর্বের সমাপ্তি টানলাম।
২০০৩ সালের ১৭ জানুয়ারি খুলনা মেডিকেল কলেজে আমার ভর্তিপরীক্ষা ছিল। পরীক্ষা শেষ করে রাস্তার ধারে একটি চায়ের দোকানে চা খেতে খেতে বেতারের খবর শুনছিলাম। চরম দুঃসংবাদটি জানলাম তখনই- কমরেড অমল সেন আর নেই! সে সময়ে মোবাইল ফোনের এতো চল ছিল না। তাড়াতাড়ি রূপদিয়া ফিরলাম। আমাদের আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি, আমার দাদা রাকেশ বসু এবং সাধারণ সম্পাদক মানবেন্দ্র ভট্টাচার্য্যরে কাছে জানলাম জেলা কমিটির নির্দেশ। আমরা তাৎক্ষণিক একটি শোকসভা সেরে সোজা যশোর জেলা কার্যালয়ে চলে গেলাম। সেখানে তখন শোকগ্রস্ত কমরেডদের আনাগোনা বাড়ছে। অন্যান্য পার্টির লোকজনও আসছেন খবর নিতে। লাল সালাম জানানোর সেই পুরনো শারিরীক কসরতের পুনঃপ্রস্তুতি শুরু হলো।
সম্ভবত ২০ জানুয়ারি কমরেড অমল সেনের শেষযাত্রা। ঢাকা থেকে মরদেহ নিয়ে একটি গাড়িবহর রওনা দিয়েছে যশোরের দিকে। আমরা লাল পতাকা হাতে নিয়ে বিশাল কর্মীবাহিনী শহরের প্রবেশমুখ খাজুরা বাসস্ট্যান্ডে পথের দুই ধারে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছিলাম। স্বাভাবিক সময়ের চাইতে অনেক বেশি সময় লাগছিল গাড়িবহর যশোরে পৌঁছাতে। ঢাকা থেকে যশোরমুখী বাসের লোকজন আমাদের খবর দিচ্ছিল আপনাদের কাক্সিক্ষত গাড়িবহর আসতে সময় লাগবে। কারণ রাস্তায় জায়গায় জায়গায় প্রচুর মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন একনজর দেখবেন বলে। একসময় গাড়িবহর পৌঁছালো। ততক্ষণে মানুষ আর মানুষ! খাজুরা বাসস্ট্যান্ড থেকে হাঁটার গতিতে গাড়িবহর পৌঁছালো টাউন হল মাঠে। সেখানে শতাব্দী বটতলায় মরদেহ রাখা হলো। এই শতাব্দী বটতলাতেই তে-ভাগা আন্দোলনের পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে কমরেড অমল সেন ও নাচোলের রাণীমা কমরেড ইলা মিত্রকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। আমরা প্রথমেই সেখানে লাল সালাম জানালাম। পরে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক গার্ড অব অনার। তারপর শ্রদ্ধা নিবেদনের পালা। কে আসেন নি সেখানে! সারা যশোর যেন ভেঙ্গে পড়লো। সেখান থেকে জেলা পার্টির কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হলো। সাতদিন পার্টি ও সকল গণসংগঠনের পতাকা অর্ধনমিত রেখে কালো পতাকা ওড়ানো হলো। যশোর থেকে এবার আমরা রওনা হলাম নড়াইলের পথে।
অমল সেনকে দেখার সেই আমার প্রথম সুযোগ। কিন্তু তখন আর তাঁর দেহটি ছাড়া প্রাণ নেই। আছে গল্প, পার্টি কমরেড আর অগুণতি মানুষের মুখে মুখে তাঁর গল্প। সে গল্পের মধ্য দিয়েই অমল সেনকে খুঁজে চলেছি আজও। যশোর থেকে যাত্রা করার সময় থেকে মরদেহবাহী খোলা ট্রাকের দায়িত্ব এবার আমাদের ওপর, যশোর জেলা পার্টির ওপর। আমার স্পষ্ট মনে আছে, সারাপথ সেদিন স্লোগান দিয়েছি- ‘কমরেড অমল সেন, লও লও লাল সালাম’, ‘দাদা তোমায় কথা দিলাম, লাল পতাকা ছাড়ব না’ …। আর বারেবারে দাদার কফিনের দিকে তাকিয়েছি। ট্রাকভর্তি ফুল আর ফুল, সে ফুলে অগুণতি মানুষের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা মেখে আছে। নড়াইলে আরেকদফা শ্রদ্ধা নিবেদন, পুলিশের গার্ড অব অনার প্রদান।
তারপর যাত্রা শুরু হলো অমল সেনের নিজের মাটিতে, বাপের জমিদারি আর বিত্তবৈভব ছেড়ে মানুষের সংগ্রাম আর মানুষের জীবন ও জীবনবোধ পাল্টে দেওয়ার লড়াইয়ে শরিক হতে তিনি যেখানে নতুন জীবনের ঘর বেঁধেছিলেন, সেই প্রান্তিক মানুষের মাটিতে, যশোর-নড়াইলের সীমান্তে বিস্তৃত এগারখানে, যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলাধীন বাকড়ী গ্রামের বাকড়ী হাইস্কুলের পাশেই সমাধিস্থ হবেন কমরেড অমল সেন। এখানে তিনি নেতামাত্রই নন, ওই মাটির সন্তানদের নিতান্তই আপনজন, বাসুদা। সেই আমার জীবনবোধ প্রকৃতই পাল্টে দেওয়ার দিন। অমল সেনকে দেখার, অমল সেনকে চেনার, অমল সেনকে বোঝার সেই কয়েকটি ঘণ্টা আমার সারাজীবনের সঞ্চয় হয়ে থাকবে। এ কাহিনী অনেকবার ছাত্র মৈত্রীর ছেলেমেয়েদের বলেছি। যতবার বলেছি, বারবার আমার শরীরের রোমকূপগুলো দাঁড়িয়ে গেছে; যতবার বলেছি, আবেগে আমার চোখ ভিজে গেছে। যে মানুষটিকে কোনোদিন জীবিতাবস্থায় দেখি নি, তাঁর জন্য এতো আবেগ স্বভাবতই বাড়তি শোনায়, কিন্তু তাঁকে দেখা মানুষগুলোকে তো দেখেছি, তাদের চোখে তো তাদের বাসুদা এখনো জীবিত! যারা অমল সেনকে দেখেন নি, একবার এগারখানে গিয়ে ওই মাটির মানুষগুলোর চোখে তাঁকে দেখে আসলে এই আবেগ তাদেরকেও ছুঁয়ে যাবে নিশ্চিত।
নড়াইল থেকে মরদেহবাহী গাড়িবহর এগিয়ে চলল, তুলারামপুর পেরিয়ে এবার এগারখানের পথ। মালিয়াট মোড়। তখনও তিন কিলোমিটার মতো যেতে হবে বাকড়ী পৌঁছাতে। কিন্তু বেশকিছু মানুষের জটলা সেখানে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। তাদের হাতে ধুপ-ধুনো-প্রদীপ। এখানে উল্লেখ্য, এই অঞ্চলটি নিম্নবর্গীয় হিন্দু অধ্যুষিত আর কমরেড অমল সেন ছিলেন বর্ণহিন্দু। জমিদার পরিবারের সুখ- স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে, বর্ণগৌরব বিসর্জন দিয়ে তিনি এই মানুষদের একান্ত ঘরের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। মালিয়াটে সমবেত মানুষেরা গাড়িবহরের পথরোধ করে দাঁড়ালেন- ‘বাসুদাকে এখানে নামাতে হবে, আমরা কাঁধে করে নিয়ে যাব বাকড়ী পর্যন্ত’। পার্টি নেতৃবৃন্দ রাজী ছিলেন না। পার্টির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক কমরেড বিমল বিশ্বাস নেমে গেলেন, তাদের বোঝালেন, কাজ হলো না। পার্টির সভাপতি কমরেড রাশেদ খান মেনন কথা বললেন, কাজ হলো না। এদিকে ওই মানুষেরা মরদেহবাহী ট্রাকের কাছে এলেন, নামিয়ে নিতে চাইলেন তাদের বাসুদাকে। স্বাভাবিক। আমরা তো আসলেই বাইরের মানুষ, বাসুদার নিজের জন তো তারাই। তাদের জন্য কেবল রাজনৈতিক সংগ্রামই তো করেন নি বাসুদা, তাদের জীবনবোধকে পাল্টে দিয়েছেন, রান্না করা থেকে শুরু করে পাকা পায়খানার ব্যবহার- সবই শিখিয়েছেন, শিখিয়েছেন কী করে শ্রমে-ঘামে ফলানো ফসলের ন্যায্য ভাগ আদায় করে নিতে হয়। বাসুদা তো তাদেরই। কিন্তু পথ তখনও আরো বাকি। বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে, কফিনেরও ওজন আছে। ‘কী! আমাদের বাসুদা আমাদের কাছে আজ ভারি হয়ে গেল, আমরা এমনই নিমকহারাম নাকি!’ হ্যাঁ, তাদের বাসুদা তাদের কাছে ভারি হবেন না কখনই। কিন্তু সবদিক বুঝিয়ে কমরেড বিমল বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত দিলেন, এখানে নামানো হবে অল্প সময়ের জন্য, তারপর আবারো গাড়িতে করেই বাকড়ী যাওয়া হবে। এখানে শুধু নারীরাই শ্রদ্ধা জানাবেন। পুরুষেরা বাকড়ী যাবেন। আমরা অমল দাকে নামালাম। হাতে হাত দিয়ে বেষ্টনী করে রাখলাম। শহরে আমরা যেমন নাম লিখে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাই, তাতে শ্রদ্ধার চাইতে ব্যক্তি বা সংগঠনের নাম প্রচার করার তাগিদ থাকে বেশি, ওখানকার মানুষগুলো তেমন নন, তারা ফুল দিলেন, নাম নেই, সাথে আছে ধুপ-ধুনো-প্রদীপ আর উলুধ্বনি। যেমন পুজো শেষে দেবতার বিসর্জনের সময় থাকে। দেবতা! মানুষ কি কখনও দেবতা হয় নাকি! হয়, সারাজীবন মানুষের জন্য নিবেদন করে মানুষকে পুজো করলে, মৃত্যুর পরে সেই মানুষই তাঁকে দেবতা বানায়।
কমরেড অমল সেন এগারখানের প্রান্তিক মানুষগুলোর কাছে দেবতাই ছিলেন বটে! নারীদের অর্চনা শেষে দাদাকে আবারও গাড়িতে তোলা হলো। চলেছি বাকড়ীর পথে। পথ যেন আর শেষ হয় না। পথের দুই ধারে মানুষ, সন্ধ্যা নেমে যাচ্ছে, তাতে কি! আজ তো আর বিশ্রামের দিন নয়, আজ দেবতার বিসর্জন যাত্রার দিন। পথের দুই ধারে মানুষ, আবালবৃদ্ধবনিতা, তাদের হাতে ফুল, তাদের হাতে ধুপ-ধুনো-আগরবাতি-প্রদীপ, কোথাও কোথাও ঢাক-ঢোল-কাসর, বিসর্জনের বাদ্য বাজছে, দুইচোখে জলের ধারা মানুষের, স্লোগান ‘বাসুদা কথা দিলাম, লাল পতাকা ছাড়ব না’। মানুষেরা প্রদীপ, মোমবাতি, আগরবাতি, ফুল তুলে দিচ্ছেন আমাদের হাতে, ‘কমরেড, বাসুদা’র কাছে এগুলো দিয়ে দ্যান’। যত এগোচ্ছি, ততই অভিভূত হচ্ছি। এ এক নতুন শিক্ষা, মানুষের কাছে মানুষের নেতাকে চেনার শিক্ষা। রাজনীতির ক্লাসে বক্তৃতা দিয়ে এ শিক্ষা হয় না, যেতে হয় মানুষের কাছে।
ধীরে ধীরে একসময় বাকড়ী হাইস্কুলের সামনে পৌঁছল গাড়িবহর। ট্রাক থেমেছে মাত্র, আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি দাদাকে নামানোর। কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমরা হারিয়ে গেলাম মানুষের স্রোতে। ঢাকা বা যশোর থেকে যারা এসেছিলাম, মুহূর্তেই কে কোথায় হারিয়ে গেলাম! কথা ছিল, আমরা দাদাকে নামিয়ে মূল মঞ্চ পর্যন্ত নিয়ে যাব। পারি নি। দাদার স্বজন যে মানুষেরা, তারাই নিয়ে গেলেন। আমরা পরে একত্রিত হয়ে শুধু স্লোগান দিতে পেরেছি। স্কুলমাঠ ছাপিয়ে চারিদিকে শুধু মানুষ আর মানুষ, এই মানুষেরাই কমরেড অমল সেন এর নিজের ঠিকানা। এক সময়ে জাতীয় পতাকা ও পার্টি পতাকায় মুড়ে বাসুদাকে সমাহিত করা হলো বাকড়ী স্কুলের পাশে। আজ সেখানে স্মৃতিস্তম্ভ হয়েছে। পরিকল্পনা চলছে অমল সেন কমপ্লেক্স গড়ে তোলার, সেখানে সংগ্রহশালা থাকবে, পাঠাগার থাকবে। ভাবতে পারেন, যে এগারখান অঞ্চল ছিল একেবারেই প্রান্তিক মানুষের বাস, সেখানে আজ একটিও বাড়ি পাবেন না, যেখানে উচ্চশিক্ষিত মানুষ নেই! এ তো তাদের বাসুদার কারণেই।
আমি এ যাবৎ প্রায় প্রত্যেক মৃত্যুবার্ষিকীতেই বাকড়ী-এগারখান গিয়েছি। সেখানে প্রতিবছর ১৭ ও ১৮ জানুয়ারি মেলা বসে, অমল সেন স্মরণমেলা। কৃষিমেলা, লোকজ মেলার পসরা বসে, নেতাদের বক্তব্য শুনতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন দলে দলে, বাদ্য-বাজনা বাজিয়ে, স্কুল-কলেজের ছাত্র-শিক্ষক আসেন শোভাযাত্রা করে, পল্লী চিকিৎসকরা সেখানে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দেন। আমরা যারা ঢাকা থেকে যাই, তাদের খাবার ব্যবস্থা হয় গ্রামের কোনো না কোনো মানুষের বাড়িতে, কি সেই আয়োজন! নিজেদের সবটুকু উজাড় করে তারা অতিথিসেবা করেন, বাসুদার পার্টির লোক এসেছে! মাঘ মাসের গ্রামের শীত উপেক্ষা করে তারা রাত পর্যন্ত স্মরণসভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গণনাটক করেন, মেলা করেন। বারবার সেখানে গিয়েছি শুধু মানুষের নেতা অমল সেনকে মানুষের কাছ থেকে চিনতে। আমি তো নিজের চোখেই দেখেছি বিষ্ময়াবিভূত হয়ে- প্রৌঢ় মানুষেরা বাসুদার সমাধিতে মাথাকুটে কাঁদছেন, ‘আমাকে না নিয়ে বাসুদাকে নিলে কেন ভগবান?’ একে আমরা কোন আবেগ দিয়ে বিশ্লেষণ করব? অমল সেনের লেখাতেই তো পড়েছি- ‘মানুষের কাছে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পনই হচ্ছে বিপ্লবী জীবনের একমাত্র কাজ’। ওখানকার মানুষের কাছেই দেখেছিÑ কমরেড অমল সেন সেই আত্মসমর্পন করেই মানুষের দেবতায় রূপান্তরিত হয়েছিলেন। জীবিত অমল সেনকে দেখি নি, কিন্তু তাঁর বিসর্জনযাত্রায় থেকে তাঁকে দেখেছি অন্য এক দৃষ্টিতে।
নড়াইলের আফরার জমিদার জিতেন সেন ও চন্দ্রমুখী দেবীর ঘরে অমল সেন ১৯১৪ সালের ১৯ জুলাই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ২০১৪ সালের ১৯ জুলাই থেকে বছরব্যাপী আয়োজনে কমরেড অমল সেন জন্মশতবর্ষ পালন করা হচ্ছে। সেদিন ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে আলোচনা সভার মধ্যদিয়ে এ আয়োজন শুরু হয়েছিল। বাংলাদেশের বাম প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ সে আয়োজনে ছিলেন। সারাদেশের প্রায় সকল জেলায় বিভিন্ন অনুষ্ঠান হয়েছে এ আয়োজনের অংশ হিসেবে। গত ২৯ মে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ‘দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্রাজ্যবাদ ও মৌলবাদবিরোধী লড়াই’ শীর্ষক একটি আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠত হয়। এতে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলংকার কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দ অংশ নেন। বছরব্যাপী এ আয়োজনের সমাপনী কর্মসূচি আগামী ২৮ জুলাই নড়াইলের শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হবে। এখানে অমল সেন স্মারকগ্রন্থ প্রকাশিত হবে। থাকবে আরো অন্যান্য আয়োজন।
জন্মশতবর্ষে আমার না দেখা সেই কমিউনিস্ট কমরেড অমল সেনকে লাল সালাম।
বাপ্পাদিত্য বসু: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক নতুন কথা; প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী।




Leave a Reply