পৃথিবীর অন্যতম বৈচিত্রময় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবনে ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’ কমছে তো কমছেই; এখন নেমেছে মাত্র ১৭০টিতে। সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে এই বাঘ এখন সর্বসাকুল্যে ১০৬টি এবং ভারতের অংশে রয়েছে ৬৪টি। গত এক দশকে এই সংখ্যা অর্ধেকে নেমেছে। ক্যামেরা পদ্ধতিতে সুন্দরবনের বাঘ গণনা জরিপ-২০১৫-এর ফলাফলে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
ক্যামেরায় ছবি তুলে, খালে বাঘের পায়ের ছাপ গুনে ও তার গতিবিধির অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ ব্যাখ্যা করে এই সংখ্যা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছে বন বিভাগ। এই জরিপে বন বিভাগকে কারিগরি সহায়তা দিয়েছে ভারতের বন্য প্রাণী ইনস্টিটিউট। এতে অর্থায়ন করেছে বিশ্বব্যাংক। রবিবার ২৬ জুলাই জরিপের এই ফলাফল চূড়ান্ত করেছে বন বিভাগ।
জরিপের আগে আগের জরিপের হিসাবে বাংলাদেশ অংশে জীববৈচিত্র্য ও খাবারের ভিত্তিতে কমপক্ষে ২০০ বাঘ থাকার কথা। কিন্তু চোরা শিকারিদের বাঘ শিকার, বনের ভেতর দিয়ে নৌযান চলাচল এবং বনের পাশে শিল্প অবকাঠামো নির্মাণ বাঘের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর আগে ২০০৪ সালে বন বিভাগ জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহায়তায় বাঘের পায়ের ছাপ গুনে জরিপ করেছিল। এতে বাঘের সংখ্যা এসেছিল ৪৪০টি। এ বছর নতুন এই জরিপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের ওই জরিপটি যথেষ্ট বিজ্ঞানসম্মত ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে করা হয়নি। ফলে আগের ওই বাঘের সংখ্যা সঠিক নয়।
তবে ক্যামেরায় ছবি তুলে ২০০৬ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল হাসান খান ব্রিটিশ জুয়োলজিক্যাল সোসাইটির সহায়তায় সুন্দরবনে বাঘ গণনা জরিপ করেন। তাতে বাঘের সংখ্যা ছিল ২০০টি। সেই হিসাবে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা গত নয় বছরে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
এছাড়া ২০১০ সালে বন বিভাগ ও ওয়াইল্ড লাইফ ট্রাস্ট অব বাংলাদেশ যৌথভাবে সুন্দরবনের খালে বাঘের বিচরণ পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে একটি জরিপ করে। এতে বাঘের সংখ্যা ৪০০ থেকে ৪৫০টি বলে উল্লেখ করা হয়।
সুন্দরবনে মোট ৩৮টি পূর্ণবয়স্ক ও চারটি বাঘের বাচ্চার ছবি তুলতে পেরেছে বন বিভাগের জরিপ দল। বাকি ৬৮টি বাঘের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে খালে তাদের পায়ের ছাপ গুনে ও বিচরণের অন্যান্য তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে। ক্যামেরাবন্দী হওয়া ৩৮টি বাঘের ৩০ শতাংশ পুরুষ এবং বাকিগুলো নারী।
জরিপে দেখা গেছে, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের ৬ হাজার বর্গ কিলোমিটারের মধ্যে ৪ হাজার ৮৩২ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বাঘ বিচরণ করে। এদের বিচরণের প্রধান ক্ষেত্র বাগেরহাটের কটকা, কচিখালী ও সুপতি; সাতক্ষীরার মুন্সিগঞ্জ, দোবেকি ও কৈখালী এবং খুলনার নীলকমল, পাটকোষ্টা ও গেওয়াখালী। এই তিনটি অঞ্চলে ভাগ করে ওই জরিপটি চালানো হয়েছে। এর মধ্যে বাগেরহাটে ১৭টি, সাতক্ষীরায় ১৩টি ও খুলনায় আটটি বাঘের ছবি ধারণ করা হয়েছে।
বাঘের ছবি তোলার জন্য বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় ৭১টি করে এবং খুলনায় ১৩২টি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়।
বন বিভাগের ৩০ জন কর্মী ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালের নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত এ জরিপটি করে। এই সময়ে প্রতি দুই দিন পর পর ওই ক্যামেরা পরীক্ষা করে বাঘের ছবি দেখা হয়। এই তিনটি এলাকার মধ্যে বাগেরহাটে প্রতি ১০০ বর্গকিলোমিটারে ৩ দশমিক ৭টি, সাতক্ষীরায় ২ দশমিক ৭৭ ও খুলনায় ১ দশমিক ০৮টি করে গড়ে বাঘ বিচরণ করতে দেখা গেছে।
২০১০ সালে রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত বাঘ সম্মেলনে ২০২২ সালের মধ্যে বিশ্বে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ ওই ঘোষণায় স্বাক্ষরও করেছে। এতে বলা হয়েছিল, বিশ্বের ১৩টি বাঘসমৃদ্ধ দেশ প্রতি দুই বছর পর পর বাঘ গণনা করবে। বাংলাদেশ ওই ঘোষণার পাঁচ বছর পর বাঘগণনা শেষ করেছে। ভারত ২০১৩ সালে ও নেপাল ২০১৪ সালে ক্যামেরা পদ্ধতিতে বাঘ গণনা শেষ করে।
বাঘ গণনা জরিপ-২০১৫-এর প্রধান পরামর্শক ভারতের বন্য প্রাণী ইনস্টিটিউটের প্রধান রাজভেন্দর ঝালা বলেছেন, সুন্দরবনের ভারতীয় অংশের নদীতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেশি। এ ছাড়া বাঘের প্রধান খাবার হরিণের সংখ্যাও সেখানে কম। কিন্তু জরিপে দেখা গেছে, ভারতীয় সুন্দরবনে বাঘ বিচরণ এলাকায় প্রতি ১০০ বর্গকিলোমিটারে চারটি ও বাংলাদেশ অংশে দুটি বাঘ রয়েছে। এটা প্রমাণ করে বাংলাদেশ অংশে বাঘের অস্তিত্ব হুমকির মুখে।
রাজভেন্দর বাংলাদেশ অংশে বাঘ রক্ষার উদ্যোগে ঘাটতি থাকার কথা উল্লেখ করে বলেন, শ্যালা নদীতে নৌপথ চালু থাকার ফলে বনটি অবস্থাদৃষ্টে দুই ভাগ হয়ে গেছে। এতে বাঘের বিচরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আবার বনের পাশে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বিশাল স্থাপনা তৈরি হচ্ছে। এসব তৎপরতা বাংলাদেশ অংশে সুন্দরবনের অস্তিত্ব আরও হুমকির মুখে ফেলবে। বাঘ রক্ষা করতে হলে এসব বাধা দূর করতে হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।



Leave a Reply