প্রাণঘাতী ‘হেপাটাইটিস ভাইরাস’ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আজ ‘বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস’ পালিত হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) উদ্যোগে ২০১০ সাল থেকে প্রতি বছর ২৮ জুলাই ‘বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস’ পালিত হয়ে আসছে। হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে ৫০০ মিলিয়ন মানুষ হেপাটাইটিস ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্যÑ ‘হেপাটাইটিস প্রতিরোধ : এটা আপনার ওপর নির্ভর করছে’।
বিশ্বব্যাপী হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসজনিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ২শ’ কোটি। বর্তমান বিশ্বে প্রতি ১২ জনে একজন মানুষ এ ২টি ভাইরাসের যেকোনো একটিতে আক্রান্ত। বাংলাদেশে এ ২টি ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এ রোগ প্রতিরোধে সচেতনতার দরকার। মঙ্গলবার ২৮ জুলাই সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস। ২০০৮ সাল থেকে বাংলাদেশে ১৯ মে দিবসটি পালন করা হলেও ২০১১ সাল থেকে ২৮ জুলাইকে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস পালন করা হচ্ছে। এ দিবসকে কেন্দ্র করে সরকারের বেশি এগিয়ে আসার আহবান জানান তারা।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসজনিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ২শ’ কোটি। বর্তমান বিশ্বে প্রতি ১২ জনে একজন মানুষ এ ২টি ভাইরাসের যেকোনো একটিতে আক্রান্ত। বাংলাদেশে এ ২টি ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি। আর বিশ্বে প্রতি বছর ২ থেকে ৫ লক্ষ নবজাতক হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে জন্মগ্রহণ করে। যারা ভবিষ্যতে এ রোগের বাহক হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মতে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৫ শতাংশ হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের দীর্ঘমেয়াদি বাহক এবং এদের ২০ শতাংশ লিভার ক্যান্সার ও সিরোসিসের কারণে মারা যেতে পারে। বাস্তবে হেপাটাইটিস-বি এইডসের চেয়ে ১শ’ গুণ বেশি সংক্রামক এবং প্রতিবছর এইডসের কারণে বিশ্বে যত লোক মৃত্যুবরণ করে তার চেয়ে বেশি মৃত্যুবরণ করে হেপাটাইটিস-বি’র কারণে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বে ২শ’ কোটির বেশি লোক হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসে আক্রান্ত। এর মধ্যে ৩০ থেকে ৩৫ কোটি লোক এ রোগের জীবাণু দীর্ঘমেয়াদিভাবে বহন করছে। প্রতিবছর ২০ লক্ষ মানুষ এ ভাইরাসজনিত জটিলতায় মারা যাচ্ছে। আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, চীন, আফ্রিকা, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, প্যাসিফিক আইল্যান্ডসহ দক্ষিণ আমেরিকার কীয়দংশে এ রোগের সংক্রামণ খুবই মারাত্মক।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানিয়েছেন, নীরব ঘাতক এ সংক্রামক ব্যাধিটি প্রতি মিনিটে কেড়ে নেয় ২ জন নারী-পুরুষের প্রাণ। প্রতি বছর ১০-৩০ মিলিয়ন মানুষ নতুন করে হেপাটাইটিস ‘বি’ তে আক্রান্ত হচ্ছে। এ রোগ থেকে মুক্ত থাকতে সবার প্রতিষেধকমূলক ব্যবস্থা নেয়া উচিত।
লিভার বিশেষজ্ঞ বি আইএইচএস হসপিটাল অব ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন হেড অব গ্যাস্টোইনটেসটিয়াল অ্যান্ড হেপাটাইটিক ডিসওডার অধ্যাপক ড. মাহাবুব এইচ খান ব্রেকিংনিউজকে বলেন, রক্তের মাধ্যমে এ ভাইরাসটি বেশি ছড়ায়। রক্ত ছাড়াও মানুষের লালাতেও হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস পাওয়া যায়। হেপাটাইটিস ‘বি’ আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির রক্তমাখা সুইয়ের খোঁচায় ভাইরাসটি সংক্রমণের আশঙ্কা ৩০ শতাংশ। আর হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস আক্রান্ত মায়ের সন্তানের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রায় ৯০ শতাংশ, তবে মায়ের দুধের মাধ্যমে হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস ছড়ায় না।
তিনি বলেন, লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের জন্য প্রধানত দায়ী হেপাটাইটিস। ৫ ধরনের ভাইরাস হেপাটাইটিস রোগটির জন্য দায়ী। এগুলোকে ইংরেজি বর্ণ ‘এ’ ‘বি’ ‘সি’ ‘ডি’ এবং ‘ই’ দিয়ে চিহ্নিত করা হয়। সাধারণত দূষিত পানি বা খাবার, সিরিঞ্জ, রক্ত, চুলকাটার সিজার, রেজর, ব্লেডের মাধ্যমে এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার অনেক সম্ভাবনা আছে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন হেপাটাইটিস ‘সি’ চিকিৎসা না করিয়ে রেখে দিলে তার পরিণতি হতে পারে মারাত্মক। সিরোসিস বা লিভার ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকিই বেশি। রক্তর, লালা, বীর্য ও বুকের দুধ এক দেহ থেকে অন্য দেহে ভাইরাস বিস্তারে সহায়তা করে। সাধারণত আক্রান্ত মায়ের শিশু সন্তান, আক্রান্ত পরিবারের অন্যান্য সদস্য, বহুবার রক্ত গ্রহণকারী রোগী, মাদকাসক্ত ব্যক্তি, মানসিক অবসাদগ্রস্ত ব্যক্তি, স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান তথা হাসপাতালে কর্মরত ব্যক্তিবর্গ-যেমন চিকিৎসক, সেবিকা, ল্যাবরেটরিতে কর্মরত ব্যক্তি, দন্তরোগের চিকিৎসকেরা এ ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞ সূত্রে জানা যায়, ভ্যাকসিনেশন হেপাটাইটিস ‘বি’ প্রতিরোধে কার্যকর। হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসে আক্রান্ত মায়ের সন্তান, হেপাটাইটিস ‘বি’ রোগীর স্বামী বা স্ত্রী, স্বাস্থ্যকর্মী এবং থ্যালাসেমিয়া ও অন্যান্য হেমোলাইটিক এনিমিয়ার রোগীদের জন্য হেপাটাইটিস ‘বি’র ভ্যাকসিন নেয়া অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে হেপাটাইটিস ‘বি’র চিকিৎসা লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যান্সার হওয়ার আগে রোগটি শনাক্ত করা হলে রোগাক্রান্ত ব্যক্তির পূর্ণ নিরাময়ের সম্ভাবনা থাকে। বাংলাদেশেও এ ওষুধগুলো সহজলভ্য। এর মধ্যে আছে ইন্টারফেরন, ল্যামিভুডিন, এডিফোভির, এনটেকাভির, টেলবিভুডিন আর টেনোফোভির।
নিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডটকম



Leave a Reply