বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

যৌন হয়রানির শিকার বাংলাদেশি নারী কূটনীতিকের সঙ্গে প্রশাসনিক হয়রানি

Mofa_Newsworldbdজাপানে বাংলাদেশ দূতাবাসের পলিটিক্যাল কাউন্সিলর ও হেড অব চ্যান্সারি নূরে আলমের বিরুদ্ধে ওই মিশনেরই ফার্স্ট সেক্রেটারি মঞ্জু মনোয়ারার করা যৌন হয়রানির অভিযোগের তদন্ত চলছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। তদন্ত চলতে থাকলেও এরইমধ্যে মঞ্জু মনোয়ারার সঙ্গে প্রশাসনিক হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

একটি সূত্র এ তথ্য জানিয়ে বলে, তদন্তের জন্য এখনো কাউকে জাপানে পাঠানো না হলেও উভয়পক্ষের বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়েছে। দুইপক্ষই টোকিও থেকে তাদের বক্তব্য মন্ত্রনালয়কে জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে অভিযুক্ত নূরে আলমের শাস্তি দাবি করে জাপান প্রবাসী বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে টোকিও দূতাবাসে। তবে নিপীড়নের শিকার ওই নারী ক‚টনীতিক এখন আরেক ধরনের হয়রানিতে পড়েছেন।

মঞ্জু মনোয়ারা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে থাকলেও তার ছুটি অনুমোদন করা হচ্ছে না। পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার দায়ভারও চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে তার উপর। দেওয়া হয়েছে কারণ দর্শানোর নোটিশ।

এই ব্যাপারে জানতে যোগাযোগ করা হলে রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন বলেছেন, ‘পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগটি দেখছে। এখন আর বিষয়টি দূতাবাসের এখতিয়ারে নেই। মন্ত্রণালয় যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে সেটাই চূড়ান্ত হবে।’

 

মঞ্জু মনোয়ারার সঙ্গে যা হয়েছে:
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০১৩ সালের ২৮ জুন টোকিও মিশনে কাউন্সিলর ও হেড অব চ্যান্সারি পদে মোহাম্মদ নূরে আলম যোগ দেন। এরপর সেখানে আগে থেকেই কাজে নিয়োজিত থাকা ফার্স্ট সেক্রেটারি মঞ্জু মনোয়ারাকে নানাভাবে মানসিক নির্যাতন শুরু করেন।

এ ব্যাপারে এর আগে নূরে আলমের বিরুদ্ধে ঢাকায় পররাষ্ট্র সচিবের কাছে অভিযোগ করেছেন মঞ্জু মনোয়ারা। বলেছেন, ধারাবাহিকভাবে হয়রানির ঘটনায় আমার ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবন বিনষ্ট হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আমাকে গর্ভের যমজ সন্তানও হারাতে হয়েছে। লিখিত অভিযোগে বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলা হয়, নূরে আলম প্রথমদিকে বিভিন্ন ধরনের আদিখ্যেতা দেখানো কথা বলতেন এবং আশা করতেন যেন আমিও সে ধরনের কথা বলি। কিন্তু সাড়া না পেয়ে আমার ও আমার পরিবারের ওপর মানসিক নির্যাতন শুরু করেন।

শুরুর দিকে একদিন অসুস্থতার জন্য অফিস শেষ হওয়ার আধা ঘণ্টা আগে ছুটি চাইলে নূরে আলম বলেন, ‘যাও যাও বাসায় গিয়ে ঘুমাও, তুমি তো আর আমার কাছে আসবা না?’ নূরে আলম ওই নারী কর্মকর্তার অসুস্থতাকে তাচ্ছিল্য করে বলেন, ‘যতদিন তুমি তোমার স্বামী পরিবর্তন না করবে, ততদিন কোনো ডাক্তারের ওষুধ তোমাকে সুস্থ করতে পারবে না’।

২০১৩ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ থেকে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দল ‘মহুয়া পালা’ করতে টোকিও যায়। তখন সেই দলের দুই নারী সদস্য মঞ্জু মনোয়ারার বাসায় রাতে ছিলেন। তখন নূরে আলম বলেন, ‘আজ তো তোমার মহাবিপদ। মহুয়া সুন্দরী তার সখী নিয়ে তোমার বাসায় থাকবে। তোমার জামাই তো আর তোমার সাথে ঘুমাবে না।’

এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের এপ্রিলে ঢাকা থেকে নৃত্য নন্দন নামের আরেকটি সাংস্কৃতিক সংগঠন টোকিও সফরে গেলে দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি তার বাসায় নারী সদস্যদের পরিবর্তে পুরুষ সদস্যদের থাকার ব্যবস্থা করেন।

তখনো নূরে আলম বলেন, ‘মঞ্জু কি তোমার বাসায় মেয়েদের রাখা নিরাপদ মনে করছ না? নাকি এবার নিজের জন্য ব্যবস্থা করে নিলা?’ ২০১৩ সালের ৪ নভেম্বর দূতাবাসের একটি কাজে গাড়ি ব্যবহারের অনুমতি চাইলে নূরে আলম বলেন, ‘তুমি কি আমার ঘরের বউ নাকি যে তোমাকে আমার গাড়ি দেওয়া লাগবে?’ চলতি বছরের ৭ ও ৮ মে রাষ্ট্রদূত দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি মঞ্জু মনোয়ারাকে একটি কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করতে বলেন। তখন ওই নারী কর্মকর্তা অন্তঃসত্ত্বা থাকায় রাষ্ট্রদূত দূতাবাসের স্টাফ কার ব্যবহারের জন্য নির্দেশ দেন।

রাষ্ট্রদূতের নির্দেশ সত্ত্বেও হেড অব চ্যান্সারি নূরে আলম দূতাবাসের গাড়ি তাকে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, ‘তোমার জামাইয়ের তোমার ড্রাইভার হওয়া ছাড়া আর কী ঘোড়ার ডিমের কাজ আছে যে, তোমাকে নিয়ে যেতে পারে না’।

এ সময় মঞ্জু মনোয়ারার স্বামী মোহাম্মদ সাব্বির আহমেদ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। বিব্রত হন সাব্বির। এ অপমান সইতে পারেননি মঞ্জু। তার গর্ভে প্রচণ্ড ব্যথা হয় এবং তৎক্ষণাৎ গর্ভপাতও ঘটে। অবশ্য এখনো দূতাবাস থেকে চিকিৎসা বিল পাচ্ছেন না মঞ্জু মনোয়ারা।
অথচ নূরে আলম দূতাবাসের খরচে তার ব্যক্তিগত ডিনারের বিলও পরিশোধ করতে চান। চলতি বছরের ২৪ ফেব্র“য়ারি এমন একটি ডিনারের বিল স্বাক্ষর করতে মঞ্জুকে চাপ দেন নূরে আলম। স্বাক্ষরে অস্বীকৃতি জানালে নারী কর্মকর্তার উদ্দেশে অশ্রাব্য ভাষায় বলেন, ‘ওই খানে বসে আমি … কী করতাছি!’

সর্বশেষ গত ১২ জুন মিশনের কমার্শিয়াল কাউন্সিলরের ফাইনান্সিয়াল নোটের ওপর পর্যবেক্ষণ পছন্দ না হলে নূরে আলম ওই নারী কর্মকর্তার উদ্দেশে বলেন, ‘ওরে আমি লাত্থি মেরে সিঁড়ি দিয়ে নিচে ফেলে দিব’। এ সময় সেখানে দূতাবাসের কমার্শিয়াল কাউন্সিলর হাসান আরিফও উপস্থিত ছিলেন।

লিখিত অভিযোগে মঞ্জু মনোয়ারা বলেছেন, ‘সব মিলিয়ে আমি অত্যন্ত ভীত ও নিজেকে অনিরাপদ মনে করছি। এমন যৌন হয়রানির হুমকিতে আমি ও আমার স্বামী অত্যন্ত হতাশ। আর সন্তান হারানো সবচেয়ে বেশি কষ্টের’।

অভিযোগ প্রসঙ্গে মঞ্জু মনোয়ারার সঙ্গে জাপানে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। পরে তার স্বামী সাব্বির আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এসব ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন।

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *