শিতাংশু গুহ, নিউইয়র্ক॥
পনেরই আগস্ট জাতীয় শোক দিবস। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান-এর প্রতি আমার সশ্রদ্ধ শ্রধ্যার্ঘ। জাতীয় শোক দিবস এখন শক্তিতে পরিনত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর হাতেগড়া দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। দেশ দ্রুতলয়ে অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। একদা কথিত ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ অর্থাৎ যারা এই উপাধিটি দিয়েছিলেন, তারাই এখন বলছেন, ‘সম্বৃদ্ধির পথে’ বাংলাদেশ। এখানেই বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু, আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনার সরকার সফল।
বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়নি অনেকদিন। তখন সবাই বলতেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্য দিয়েই দেশে হত্যার রাজনতি শুরু এবং এই হত্যার বিচার নাহলে হত্যার রাজনীতি বন্ধ হবেনা। কথাগুলো সর্বাংশে সত্য। জাতির জনকের হত্যার বিচার হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের হত্যার বিচার চলছে। তবু হত্যার রাজনীতি কিন্তু বন্ধ হয়নি এবং এর সর্বশেষ শিকার নিলাদ্রী চট্টোপাধ্যায়। আমার ধারনায়, হত্যার রাজনীতি তখনই বন্ধ হয় যখন প্রতিটি হত্যার বিচার হয় এবং আইনের শাসন চালু থাকে।
বাবার মুখে শুনেছি, বৃটিশ আমলে নাকি একগ্রামে একটি গুলি হলে চৌদ্দ গ্রাম উজাড় হতো, যতক্ষণ না বন্দুকটি খুঁজে পাওয়া যেতো। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের যেমনি প্রয়োজন ছিলো, তেমনি প্রতিটি হত্যার বিচারের প্রয়োজন আছে। একজন আস্তিকের যেমন বাঁচার অধিকার আছে, একজন নাস্তিকের বাঁচার অধিকারও কেউ কেঁড়ে নিতে পারেনা। আর নিহত আস্তিকই হোক বা নাস্তিকই হোক, একজন মানুষ নিহত হয়েছে, এর বিচার হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু হচ্ছে কই? মিডিয়ায় এসেছে, ‘উনত্রিশ মাসে ১০ ব্লগার হত্যা, কিনারা হয়নি একটিরও’। ‘জাস্টিস ডিলেইড জাস্টিস ডিনাইড’- প্রশ্ন হলো, বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের মত যেকোন হত্যার বিচারের জন্যেই কি আমাদের সিকি শতাব্দী অপেক্ষা করতে হবে? নিলাদ্রী চট্টোপাধ্যায় বা শুধুই নীল্ খুন হলেন সাতই আগস্ট ২০১৫ নিজের বাসায়, প্রকাশ্য দিবালোকে। এই হত্যার জট খোলা বা ত্বরিত বিচার কি খুবই কঠিন? অন্যান্য ব্লগারদের হত্যার বিচার শ্লথ হয়ে যাওয়ার কারনটা কি? হয়তো এজন্যেই প্রফেসর অজয় রায় বলতে পেরেছেন, ‘ব্লগার হত্যাকান্ডের পেছনে সরকারের প্রচ্ছন্য মদত আছে’।
অজয় স্যার নিজেও জানেন, সরকারের ইন্দন নাই, কিন্তু তিনি একথা বলছেন হতাশা থেকে, কারণ পুত্র হত্যার সঠিক-দ্রুত তদন্ত তিনি দেখতে পাচ্ছেন না। নীলের পরিবারও ক’দিন বাদে একই কথা বলবেন না সেই গ্যারান্টি কোথায়? মিডিয়ায় সর্বত্র এখন নিহত ক’জন ব্লগার বা মুক্তবুদ্ধির মানুষের তালিকা পাওয়া যাচ্ছে, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০০৪ – হুমায়ুন আজাদ; ১৫ জানুয়ারী ২০১৩ – ব্লগার আসিফ মহিউদ্দীন; ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৩ – ব্লগার রাজীব হায়দার; ৯ এপ্রিল ২০১৩ – আরিফ রায়হান দীপ; ২৬ ফেব্রুয়ারী২০১৫ – ব্লগার অভিজিৎ রায়; ৩০ মার্চ ২০১৫ – ব্লগার ওয়াশিকুর বাবু; ১২ মে২০১৫ – ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ; ৭ আগস্ট, ২০১৫ – ব্লগার নিলয় চক্রবর্তী নীল । জাতি এদের হত্যার বিচার চায় এবং এই বিচারটি করার দায় সরকারের।
এরমধ্যে পুলিশ কমিশনার ব্লগারদের উপদেশ দিলেন সীমা লঙ্ঘন না করতে। উপদেশ না প্রচ্ছন্ন হুমকি ঠিক স্পস্ট নয়, তবে তিনি সীমা টেনে দিলে ভালো করতেন। তিনি ভুলে গেছেন, আকাশের যেমন সীমা নাই, মুক্তমনেরও কোন সীমা থাকেনা। পুলিশ কমিশনার বা আমরা যারা আস্তিক তারা সসীম হলেও মুক্তমনারা অসীম। পুলিশ কমিশনার অবশ্য উগ্রপন্থীদের কোন উপদেশ দেননি। বাংলায় একটি কথা আছে, ‘যার কাজ তারে সাঁজে-‘। পুলিশের কাজ অপরাধী ধরা, উপদেশ দেয়া নয়। নিউইয়র্কের সাংবাদিক সঞ্জীবন সরকার লিখেছেন, নিলয় থানায় জিডি করতে গিয়েছিল । পুলিশ তাকে পরামর্শ দিয়েছে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেশ ছেড়ে চলে যেতে।
শিতাংশু গুহ, কলাম লেখক।
নিউইয়র্ক। ১০ আগস্ট ২০১৫।



Leave a Reply