আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ, আমরা গেঁথেছি শেফালিমালা-/ নবীন ধানের মঞ্জুরি দিয়ে সাজিয়ে এনেছি ডালা।/ এসো গো শারদলক্ষ্মী, তোমার শুভ্র মেঘের রথে,/ এসো নির্মল নীলপথে…। এসেছে শরত। আজ ১ ভাদ্র । প্রিয় ঋতু শরতের প্রথম দিন। আনুষ্ঠানিক শুরু।
আশ্বিনের শেষ দিনটি পর্যন্ত শরতের কাল বলে বিবেচিত। ষড়ঋতুর বাংলাদেশে প্রতিটি ঋতুই ভিন্ন ভিন্ন রূপবৈচিত্র্য নিয়ে হাজির হয়। শরতেও নতুন করে সাজে প্রকৃতি। গ্রামে যেমন, শহরেও তাই। এখন গ্রামের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে কাশফুলের দোলা আর শহরের নীল আকাশে ভেসে বেড়ায় সাদা মেঘের ভেলা। একটু খেয়াল করলে চোখে পড়বে। শরতের প্রকৃতির বর্ণনা দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, আজি ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি খেলা রে ভাই, লুকোচুরি খেলা-/ নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা রে ভাই- লুকোচুরি খেলা…।
প্রেমের কবি নজরুলকেও আলোড়িত করেছিল শরতের প্রকৃতি। বিশেষ করে শরতের শিউলী তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। সে মুগ্ধতার কথা জানিয়ে কবি লিখেছিলেন, এসো শারদপ্রাতের পথিক এসো শিউলি-বিছানো পথে।/ এসো ধুইয়া চরণ শিশিরে এসো অরুণ-কিরণ-রথে…। শরতের মিষ্টি সকালের বর্ণনাও পাওয়া যায় তাঁর লেখায়, যেখানে তিনি লিখেছেন, শিউলিতলায় ভোরবেলায় কুসুম কুড়ায় পল্লী-বালা।/ শেফালি ফুলকে ঝরে পড়ে মুখে খোঁপাতে চিবুকে আবেশ-উতলা…।
শরতে শুধু প্রকৃতি নয়, মনও বদলে যায়। পরিবর্তিত হয়। সেই পরিবর্তনের কথা জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, শরতের মনের আনন্দও কম নয়। তাঁর কথায় শরতে আজ কোন অতিথি এলো প্রাণের দ্বারে।/আনন্দগান গা রে হৃদয়, আনন্দগান গা রে…। নজরুল শরতে হারানো প্রিয়াকে অনুভব করেছেন। লিখেছেন, শিউলি ফুলের মালা দোলে শারদ-রাতের বুকে ঐ/ এমন রাতে একলা জাগি সাথে জাগার সাথি কই…। একইরকম বিরহ আক্রান্ত হয়ে কবি লিখেছেন, দূর প্রবাসে প্রাণ কাঁদে আজ শরতের ভোর হাওয়ায়।/ শিশির-ভেজা শিউলি ফুলের গন্ধে কেন কান্না পায়…।
প্রায় অভিন্ন অনুভূতির প্রকাশ ঘটিয়ে কবিগুরু লিখেছেন, আজি শরততপনে প্রভাতস্বপনে কী জানি পরান কী যে চায়।/ ওই শেফালির শাখে কী বলিয়া ডাকে বিহগ বিহগী কী যে গায় গো…।
সব মিলিয়ে একটু ভিন্নতরই হয় শরত। প্রতিবারের মতো এবারও নানা আয়োজনে প্রিয় ঋতুকে বরণ করে নেবে বাঙালী। প্রকৃতিপ্রেমীরা বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে। এর মাধ্যমে চমৎকার ফুটিয়ে তোলা হবে শরতের রং রূপ। প্রিয় ঋতুকে গানে কবিতায় নৃত্যের ছন্দে বরণ করে নেয়া হবে। চলবে বন্দনা।
রবীন্দ্রনাথ শরেক স্বল্পায়ু বলেছেন। শরেক চেনা যায় প্রকৃতির মাঝে তার স্বল্প আয়োজনের জন্য। শরতের সম্ভার ওই শিশিরাশ্রু শেফালিকা, কাশমেঘ; আর আগমনী উত্সবে তার সমাপ্তি। শরত্ হচ্ছে আকাশ ও মাটির মিলন। একদিকে নীলাকাশ, আরেকদিকে কচি ফসলের দুরন্তপনা; একদিকে সোনা রোদ, আরেকদিকে সবুজের কচি মুখ; সঙ্গে আকাশ ও মৃত্তিকার যে হূদয়াবেগ, তা আমাদের হূদয়কে নাড়া দিয়ে যায়। ভাদ্র মনকে উদ্বেলিত করে। প্রকৃতির সবুজ ছড়িয়ে পড়ে মাঠে-ঘাটে। এই স্নিগ্ধরূপ তারুণ্যকে উচ্ছ্বসিত আনন্দে ভাসতে উদ্বেল করে তোলে। প্রকৃতি তার ভালোবাসা দিয়ে আপন করে নিতে চায় সকল মনকে। শরত্ সেই ভালোবাসার মনে দোলা দিয়ে যায়। তাই বুঝি মহাকবি কালিদাস শরতের বন্দনা করেছেন: ‘প্রিয়তম আমার! ঐ চেয়ে দেখো, নববধূর ন্যায় সুসজ্জিত শরত্কাল সমাগত।’
ঋতু পরিক্রমায় শ্রাবণ বিদায় নিলো। বর্ষায় খেয়ালি প্রকৃতি প্রসন্ন ছিল না। প্রত্যাশিত বৃষ্টিপাত হয়নি। তাই বলে দিন তো আর বসে থাকে না। ঋতুচক্র নানা বর্ণে-গন্ধের সমারোহে নিত্য আবর্তিত হয়ে চলে। কিন্তু ‘ইটের প’রে ইট, তার মাঝে মানুষ কীট’— এই শহরের বাসিন্দাদের অন্তর আজ আর শরতের নিমন্ত্রণ অনুভব করে না। প্রতিবারই শরত্ আসে। সাজে অপরূপ সাজে। কিন্তু শহুরে যান্ত্রিক জীবনে এর রূপ দেখার সময় কই?



Leave a Reply