প্রভাষ আমিন।
একটা গল্প বলি, এক সাধারণ যুবক বলল, রাজকন্যার সঙ্গে তার বিয়ের ৫০ ভাগ অগ্রগতি হয়েছে। মানে? ‘মানে হলো, আমি রাজি।’ তারমানে ৫০ ভাগ অগ্রগতির মানেও আসলে শূন্য, ভালোবাসাটা একতরফা। প্রথম আলোর সঙ্গে আমার সম্পর্কটাও তেমন, ভালোবাসার, তবে একতরফা। প্রথম আলোকে একতরফা ভালোবাসার বিনিময়ে কিছু পাইনি কখনও, চাইওনি। প্রথম আলো হলো মস্ত হাতি, আমি সেখানে পিঁপড়ার চেয়েও ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র। এ ধরনের ভালোবাসা একতরফাই হয়। শর্তহীন ভালোবাসার বিনিময় না পেলেও একধরনের ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয়েছি। প্রথম আলো প্রকাশের পর প্রতিদিন আমার সকাল শুরু হয়েছে এর সঙ্গে। দেশের বাইরে থাকলেও অনলাইনে প্রথম আলোয় চোখ বুলিয়েই দিন শুরু করেছি। তাই প্রথম আলো যখন ভুল করে বা ইচ্ছা করে বেপথু হয়, তখন মন খারাপ হয়, তীব্র ভালোবাসা থেকে একধরনের অভিমান হয়। তখন কলম ধরি, ভুলটা ধরিয়ে দেই। আমি জানি, প্রতিদিন প্রথম আলোর ভুল ধরার জন্য বেতনভুক্ত লোক আছে। আর আমি যখন বিনা পয়সায় সেই ভুল ধরানোর কাজটা করি, তখন অনেকে আমাকে শত্রুপক্ষের লোক মনে করেন। এটা ঠিক, ভুলের তো কোনও চিরন্তন অবস্থান নেই। আমি যেটা ভুল মনে করি, প্রথম আলোর কাছে সেটা ভুল নাও মনে হতে পারে।
এটা ঠিক, প্রথম আলো নিছক একটি দৈনিক পত্রিকা নয়। তারা সাংবাদিকতার বাইরে নানা ইতিবাচক সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করে নিয়েছে। আমি বলি, মতিউর রহমান তার রাজনৈতিক জীবনের অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে চান প্রথম আলো দিয়ে। তাই প্রথম আলো নানা এজেন্ডা নিয়ে কাজ করে। এটাকেও আমি অন্যায় বলছি না। শুধু প্রথম আলো নয়, অধিকাংশ গণমাধ্যমই নানা এজেন্ডা নিয়ে কাজ করে। বিবেচনা করতে হবে, সেই এজেন্ডা সমাজের জন্য ইতিবাচক না নেতিবাচক। আবার একজনের জন্য যেটা ইতিবাচক, অন্যজনের জন্য সেটা ইতিবাচক নাও হতে পারে। প্রথম আলোর লাখ লাখ পাঠক। তাই তাদের সব এজেন্ডার সঙ্গে সব পাঠক একমত হবেন, এমন কোনো কথা নেই। এই যেমন প্রায়শই প্রথম আলোর অনেক উদ্দেশ্যের সঙ্গে আমি একমত হতে পারি না। তাদের অনেক আচরণে আমি কষ্ট পাই। বেশি কষ্ট পাই, যখন দেখি প্রথম আলোর কোনও-কোনও এজেন্ডায় সরাসরি জামায়াত সুবিধা পেয়ে যায়। সেই কষ্ট থেকেই কলম ধরি। গণজাগরণ মঞ্চের ব্যাপারে প্রথম আলোর অবস্থান, বহুল আলোচিত জরিপ, হাসনাত আবদুল হাইয়ের গল্প ছাপা, নরেন্দ্র মোদির জীবনীতে একাত্তরে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হয়েছে বলা থেকে শুরু করে সর্বশেষ মতিয়া চৌধুরীর সঙ্গে মতি ভাইয়ের বাহাস প্রসঙ্গেও লিখেছি। এসব লেখায় প্রথম আলোর অনেক সমালোচনা ছিল। কিন্তু নিজেকে সবসময় আমি বন্ধু সমালোচক হিসেবেই দাবি করি।
এ তো গেল রাজনৈতিক অবস্থান আর এজেন্ডার প্রশ্ন। কিন্তু সাংবাদিকতার প্রশ্নেও মাঝে মধ্যেই ভুল হয়ে যায়। এই যেমন কদিন আগে রাজশাহী প্রতিনিধির পাঠানো এক লোকের প্রতিদিন ৯০ কিলোমিটার দৌড়ে অফিসে যাওয়া-আসার আষাঢ়ে গল্প ছাপা হয়েছে প্রথম আলোতে। এর কোনও সংশোধনীও দেখিনি। প্রথম আলো শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে। শুধু প্রথম আলো নয়, বাংলাদেশের অধিকাংশ পত্রিকাই শামীম ওসমানের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে। কিন্তু বিরুদ্ধে বলেই তো আর সাংবাদিকতার নিয়ম-নীতি না মেনে রিপোর্ট করা উচিত নয়। শামীম ওসমানের আড্ডার ছলে বলা অফ দ্য রেকর্ডের কথা দিয়ে লিড রিপোর্ট করা সাংবাদিকতার এথিক্সের বাইরে বলেই মনে করি। এমনিতে সাংবাদিকদের রাগ-অনুরাগ-বিরাগের বশবর্তী না হয়ে সবার প্রতি সমান আচরণ করার কথা। কিন্তু প্রথম আলো মোটামুটি ঘোষণা দিয়ে কয়েকজনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে রাখে। ধরে নিলাম, প্রথম আলো যাদের বিরুদ্ধে লাগে, তাদের অধিকাংশই খারাপ। কিন্তু তাদের মতো আরও অনেক খারাপ লোক প্রথম আলোর নজরের আড়ালে থেকে যায়। নিয়ম হলো, যেই খারাপ কাজ করুক, তার বিরুদ্ধেই লেখা হবে। কিন্তু আগে থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে কারও বিরুদ্ধে লাগাটা শোভন নয়, ভালো সাংবাদিকতা নয়। মস্ত হাতি প্রথম আলো যখন মত্ত হাতি হয়ে যায়, তখনই সমস্যা। আর তখন পিঁপড়ারা কামড়াকামড়ি করি। তবে মস্ত হাতি প্রথম আলোর আমার মতো পিঁপড়ার কামড়ে সুড়সুড়িও লাগে না।
প্রথম আলোকে ভালোবাসার কারণ, অনেক ভুল-ভ্রান্তি সত্ত্বেও প্রথম আলো বাংলাদেশে সাংবাদিকতার একটা মান সেট করেছে। এই দৈনিকটি বদলে দিয়েছে বাংলাদেশের প্রচলিত সাংবাদিকতার অনেক ধারণা। উৎকর্ষের এক অনতিক্রম্য মান নির্ধারণ করেছে প্রথম আলো। আধুনিক ও পেশাদার সাংবাদিকতার ধারণায় যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে পত্রিকাটি। তবে ভালো বেতন, সুযোগ-সুবিধা দিয়ে প্রথম আলো সাংবাদিকদের সামাজিক মর্যাদা ও অবস্থান বাড়িয়েছে। তবে কারণে-অকারণে অনেকের বিরুদ্ধে লাগে বলে প্রথম আলোর শত্রুর অভাব নেই। নিয়মিত মামলা-মোকদ্দমাও সামলাতে হয়। এই যেমন কদিন আগে কৃষি মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ করায় এখন মতি ভাইকে ঝিনাইদহে গিয়ে হাজিরা দিতে হচ্ছে। এটা সাংবাদিকদের জীবনের অংশ। এটাকে নেতিবাচক ভাবে দেখার কিছু নেই। সংক্ষুব্ধ যে কেউ প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ জানাতে পারেন, বেশি সংক্ষুব্ধ হলে মামলা করতে পারেন। অনেক হয়রানিমূলক মামলা হলেও, এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তাই কোনও সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হলেই আমি তাতে সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ বলে মনে করি না।
তবে গত কয়েকদিন ধরে প্রথম আলো দেখে একটু খটকা লাগছে। হঠাৎ করেই প্রথম আলোর বিজ্ঞাপন যেন একটু কম কম লাগছে। আমার কাছে ভালোই লাগছিল। পয়সা দিয়ে প্রথম আলো কিনি। বিজ্ঞাপন যত কম হয়, আমার ততই লাভ। খটকাটা হলো, বিজ্ঞাপন কমে গেল কেন? প্রথম আলোর কি সার্কুলেশন কমে গেছে, না কি বিজ্ঞাপনদাতাদের বিজ্ঞাপন দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে? প্রথম আলোকে কেন নিজেদের বিজ্ঞাপন দিয়ে পাতা ভরতে হচ্ছে? খোঁজ নিয়েও এই প্রশ্নের কোনও সদুত্তর পেলাম না। যারা নিয়মিত প্রথম আলোতে বিজ্ঞাপন দিত, তেমন অনেক প্রতিষ্ঠানও বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিয়েছে। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান আগের বুকিং বাতিলও করেছে। এটা ঠিক কোন প্রতিষ্ঠান, কোন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেবে, না দেবে, সেটা তাদের ইচ্ছা। এখানে জোর করার কিছু নেই। তবে একসঙ্গে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানের হঠাৎ প্রথম আলোবিমুখ হওয়াটা একটু রহস্যজনক। কারও-কারও ধারণা, প্রথম আলোর কণ্ঠরোধ করতেই হয়তো কেউ কৌশলে বিজ্ঞাপনদাতাদের নিরুৎসাহিত করছে। এটা আমি বিশ্বাস করতে চাই না। বর্তমান সরকারের অনেক সমালোচনা আছে। আমি প্রায়শই সরকারের সমালোচনা করে লেখালেখি করি। কিন্তু বর্তমান সরকারের আমলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমি সন্তুষ্ট। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুযোগ পেলেই সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। তার মুখের ওপর যেকোনও প্রশ্ন করা যায়। সরকারের সমালোচনা করলে তিনি পাল্টা সমালোচনা করে উত্তর দেন। আমি এটাকেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সৌন্দর্য্য হিসেবেই বিবেচনা করি।
সাংবাদিকদের যদি শেখ হাসিনার সমালোচনা করার অধিকার থাকে, শেখ হাসিনারও সাংবাদিকদের সমালোচনা করার অধিকার আছে। শেখ হাসিনা প্রায়শই টক শো’র সমালোচনা করেন। করতেই পারেন। তিনি তো রাগ করে টক শো বন্ধ করে দিচ্ছেন না। এই যেমন কদিন আগে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী প্রথম আলোর এক রিপোর্ট নিয়ে তিনবার সংসদে বিবৃতি দিয়েছেন। মত তো শুধু সাংবাদিকদের নয়, মন্ত্রীদেরও আছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে তো শুধু সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা নয়। সংবাদপত্র যার বিরুদ্ধে লিখছে, তারও আত্মপক্ষ সমর্থন করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে।
বর্তমান সরকারের আমলেই তথ্যমন্ত্রীর মুখের ওপর বলে দেওয়া সম্ভব, সম্প্রচার নীতিমালা আমি মানি না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে পরমতসহিষ্ণুতাও। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার এমন চমৎকার পরিবেশে সরকার কৌশলে বিজ্ঞাপন বন্ধ করে প্রথম আলোর কণ্ঠরোধ করবে, এটা আমার বিশ্বাস হয় না। তবু, যদি এমন কিছু হয়েই থাকে, সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি, এটা বন্ধ না করার। সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা ভালো কিছু বয়ে আনবে না।
প্রভাষ আমিন: অ্যাসোসিয়েট হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।




Leave a Reply