উজানের ঢলে তিস্তার পানি ডালিয়া পয়েন্টে গত সোমবার ৬টা সকাল থেকে বিপদসীমার ৩২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সকাল ৯টায় ২ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ৩০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। রোববার সন্ধ্যায় তিস্তার পানি বিপদসীমার ১০ সেন্টিমিটার নিচে প্রবাহিত হলেও রাতে পানি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে থাকে। রাত ৩টায় তিস্তার পাড়ের অধিকাংশ বাড়ি কোমর পানিতে তলিয়ে গেলে এলাকার কয়েকশ’ পরিবার তিস্তার বামতীর বাঁধে আশ্রয় নেয়।
এদিকে পিরোজপুরের নদীগুলোর পানি স্বাভাবিকের চাইতে দু থেকে তিন ফুট উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় কাউখালি উপজেলার নদী তীরবর্তী ২৫টি গ্রাম বন্যাপ্লাবিত হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের বন্যা পূর্বাভাস ও সঙ্কেত কেন্দ্র জানাচ্ছে, পাহাড়ি ঢলের কারণে আগামী দুই দিনে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বের জেলা সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও জামালপুরের কিছু অংশ এবং উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রাম ও নীলফামারীতে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হবার সম্ভাবনা রয়েছে।
আজ সকালেও তিস্তা নদীর ডালিয়া পয়েন্টের পানি বিপদসীমার ৩২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে বইছিল বলে জানাচ্ছেন পূর্বাভাস কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আমিরুল হোসেইন। তবে বড় নদীগুলো বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, গঙ্গা ও পদ্মা তীরবর্তী এলাকায় পানি আগামী দশ দিন পর্যন্ত কমবে উল্লেখ করে বলা হচ্ছে এসব এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি দেখা যাবে আগামী দিনগুলোতে।
এলাকাবাসী জানায়, উজানের ঢলে তিস্তা ব্যারাজের ২০ কিলোমিটার নদী দুটি চ্যানেলে রূপান্তরিত হয়েছে। মূল চ্যানেল কালিগঞ্জ জিরো পয়েন্ট ছাড়াও টেপাখড়িবাড়ির চরখড়িবাড়ি দিয়ে তিস্তা নতুন চ্যানেলে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। তিস্তার অববাহিকার ২৫ গ্রামের ৫ সহস্রাধিক পরিবার বন্যার কবলে পড়েছে।
পাশাপাশি নদী বাম ও ডান তীরের বাঁধ ঘেঁষে প্রবাহিত হওয়ায় বাঁধের হার্ডপয়েন্ট ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তিস্তা ভয়ঙ্কর ঢলের কারণে নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলার কয়েকটি উপজেলার লাখ লাখ মানুষের ঘরবাড়ি বানের পানিতে তলিয়ে গেছে। রাতে এসব এলাকার পরিবারগুলোকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।
তিস্তার বানের পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা হলো-নীলফামারীর ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলা, লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা, কালিগঞ্জ উপজেলা। এসব উপজেলার বাইশপুকুরচর, কিসামত ছাতনাই, ঝাড়শিংঙ্গেরশ্বর, বাঘেরচর, টাবুর চর, ভেন্ডাবাড়ি, ছাতুনামা, হলদিবাড়ী, একতারচর, ভাষানীর চর, পুর্বছাতনাই, খগাখড়িবাড়ি, টেপাখড়িবাড়ি, গয়াবাড়ি, খালিশাচাঁপানী, ঝুনাগাছ চাঁপানী, গোলমুন্ডা, ডাউয়াবাড়ি, শৌলমারী, কৈমারী ও লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা ও কালিগঞ্জ উপজেলার তিস্তা অববাহিকার গ্রামগুলোর কাঁচা ঘরবাড়িতে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের সিডিএমপির বাঁধে বন্যার পানি প্রবল বেগে আঘাত করায় রাত জেগে এলাকাবাসী বালুর বস্তা ও বাঁশের বাইলিং দিয়ে রক্ষা করে।
খালিশা চাপানি ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রমজান আলী জানান, তাদের গ্রামের প্রতিটি পরিবারের ঘরে হাটু পানির নিচে রয়েছে। ঘরের ভেতর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে স্রোত। পশ্চিম বাইশপুকুর থেকে পূর্ব বাইশপুকুরের ৪ কিলোমিটার বালুর বাঁধটি চরম হুমকির মুখে পড়েছে। বাঁধটি ভেঙে গেলে পূর্ব বাইশপুকুর, পশ্চিম বাইশপুকুর, সতিঘাট, ছাতুনামা, ভেন্ডাবাড়ীসহ ১০টি গ্রামের কয়েকশ’ বাড়িসহ সহস্রাধিক বিঘা আবাদী জমি নদীগর্ভে বিলিন হবে। পূর্বছাতনাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ খান বলেন, তার এলাকার পাঁচ শতাধিক ঘরবাড়িতে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। রাতে নদীর ভেতরের লোকজন তিস্তার বাঁধে আশ্রয় নিয়েছিল।
খগাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম লিথন জানান, কিছামত ছাতনাই চরের দুইশ’ পরিবারকে রাতে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনা হয়েছে। টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহীন বলেন, চরখড়িবাড়ী, উত্তর খড়িবাড়ী ও দক্ষিণ খড়িবাড়ী গ্রামের ৬শতাধিক পরিবারে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। রাতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো তিস্তার বাঁধে আশ্রয় নিয়েছিল। তার ইউনিয়নের সিডিএমপির বাঁধটি চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডালিয়া ডিবিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, উজানে ঢলে তিস্তা পানি সোমবার সকাল ৬টায় বিপদসীমার ৩২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। পানি বৃদ্ধির কারণে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি সুইচ গেট খুলে রাখা হয়েছে। সকাল ৯টায় ২ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ৩০সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম সকালে বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন শেষে বলেন, রাতে তিস্তার পানি যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল সকাল থেকে আস্তে আস্তে তা কমতে শুরু করেছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডটকম



Leave a Reply