বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

সিভিল ড্রেসের পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে পুলিশের ‘দূর-ছাই, ভাগ শালা’ ব্যবহার

মোঃ আব্দুর রাজ্জাক।

২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫ সাল। ঢাকার কল্যাণপুর থেকে ঈদ উল আজহার ছুটি কাটানোর জন্য রংপুরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছি। আজ সকাল নয়টার দিকে আমাদের গাড়িটি আশুলিয়া বাইপাইল মোড় থেকে সামান্য পূর্ব দিকে আটকে আছে। গাড়িতে উঠেছি রাত সাড়ে তিনটায়। প্রায় সাত ঘন্টা ধরে কম বেশি একই স্থানে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের শ্যামলী পরিবহনের গাড়িটি। সূর্যটা আমাদের দিকে একটু তেরসাভাবে কিরণ দিচ্ছে। গাড়ির কাঁচের জানালা ভেদ করে শেষ ভাদ্রের আলো আসছে আমাদের বাসের ভিতর। বাসটি দ্রুত গরম হয়ে উঠছে। ইতোমধ্যে ফেরিওয়ালারা খাদ্যদ্রব্য বিক্রির জন্য হাঁক ডাক শুরু করেছে। শুকনা খাবারের সাথে পাওয়া যাচ্ছে কোক, ফান্টা, টাইগার কিংবা প্রাণগ্রুপের ফ্রুটি ম্যাঙ্গো জুস। তরল খেয়ে খেয়ে তলপেটে চাপ পড়েছে সবার।

সবাই যে যার মতো এদিক ওদিক গিয়ে সামান্য আড়ালে আবডালে তলপেটের তরল টুকু বের করে দিয়ে স্বস্তি ক্রয় করছে। বিনিময়ে রাস্তার ধার ভেসে যাচ্ছে যাত্রীদের মৌসুমি মুত্র দিয়ে।

আমি একজন ঊধ্বর্তন সরকারি কর্মকর্তা। অন্যদের মতো আমি চাইলেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে ব্যাকরণহীনভাবে আমার তলপেট খালি করতে পারি না। পদের ভার, নাগরিক সৌজন্যবোধ আর অভ্যাসের তর্জনী সর্বদাই আমার দিকে তাক করা। আমার কষ্টের কথা পত্রিকায় হাস্যকর হেডলাইন হয়; আমার বঞ্চনা অন্যদের সমালোচনার বিষয় হয়। তাই আমাকে প্রাকৃতিক কর্মেও নূন্যতম শালীনতা বজায় রাখতে হয়।

ডান দিকে তাকিয়ে দেখি একটি ছোট খাট পুলিশ বক্স। ট্রাফিক পুলিশের বক্স, নাকি থানা পুলিশের কোন স্থাপনা- বোঝা গেল না। ছোট খাট- কিন্তু বাইরের চেহারা সুন্দর। থাই কাঁচের স্লাইডিং দরোজা দিয়ে আটকানো অন্দর মহলে নিশ্চয়ই শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা আছে? মুহূর্তের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিলাম, ঐ পুলিশ বক্সে গিয়েই তলপেটের ক্রমবর্ধমান তরল সম্ভার প্রয়োজনমত হ্রাস করা যায়।

বেশ স্বস্তির আমেজ নিয়ে অগ্রসর হলাম পুলিশ বক্সের দিকে। ভাবলাম, ঢুকেই তাদের পরিচয় দিব। সরকারের পঞ্চম গ্রেডের (উপ সচিব) একজন কর্মকর্তা তাদের মাঝে আকস্মাৎ উপস্থিত হওয়ায় তারা নিশ্চয়ই ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। সেই কর্মকর্তা যদি খোদ পুলিশেরই কেউ হয় তাহলে অধীনস্তরা নিশ্চয় ডান হাত কপালে তুলে সেলুট ঠুকবেন, কেউবা আবার বসা অবস্থাতেই হাত-দুটো সোজা করে ‘সিট-টু-সান হবেন। কারণ, এটা পুলিশের সাধারণ সৌজন্যবোধ।

ধীর পদক্ষেপে গিয়ে পুলিশ বক্সের স্লাইডিং ডোরে হাত দিলাম। আস্তে আস্তে খুলতে থাকলাম দরোজাটি। স্লাইডের অর্ধেক মাত্র খুলে গেল। কিন্তু দরোজা খুলতেই আমার কল্পনার নিশার অবসান ঘটল। একজন ফর্সা চেহারার পুলিশ ইন্সপেক্টর তার কন্ঠের সকল কর্কশতা একত্র করে রেজিমেন্টাল ভঙ্গিতে বললেন, ‘এই যান! যান! যান, বলছি!

আমি সম্পূর্ণ ভেবাচেকা খেয়ে কিছুক্ষণ স্লাইডিং ডোরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। ভাবছি পুলিশ ইন্সপেক্টরের এই আচরণের মাঝখানে আমার পরিচয়টা প্রকাশ করা সমীচীন হবে কিনা। একবার ভাবলাম, পরিচয়টা দিয়ে তাদের লজ্জিত করি। পরের বার ভাবলাম, না, আমি তো লজ্জিত হয়েছি। এবার পরিচয় দিয়ে তাদেরও লজ্জিত করা উচিৎ হবে না। একজন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা তা করতে পারেন না।

আমি ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছি পুলিশ বক্সের ভিতরের দিকে। দরোজাটি সম্পূর্ণ খুলতেও পারছি না, আবার বন্ধও করতে পারছি না। ফর্সা চেহারার সুঠামদেহী পুলিশ ইন্সপেক্টর আবার খেকিয়ে উঠলেন, ‘এই কি হল? যান ! যান বলছি , যান’।

আমি সুবোধ বালকের মতো অপমান হজম করে থাইয়ের দরোজাটি যার পর নেই অধিকতর সতর্কতা ও আদবের সাথে বন্ধ করলাম। ভাবলাম, দরোজা বন্ধ করতে শব্দ হলে তারা যদি আবার পিছু ধাওয়া করে? যদি তলব করে আমার ত্রস্ততর অভদ্রতার! তখন ঘটবে আবার অন্য এক বিপত্তি। আমি যে অপমানিত হয়েছি, এখন তারা সেটা জানেন না- এখন হয়তো বলা যাবে-

না বুঝে কারে তুমি ভাসালে আঁখিজলে।
ওগো, কে আছে চাহিয়া শূন্য পথপানে–
কাহার জীবনে নাহি সুখ, কাহার পরান জ্বলে॥

পুলিশ বক্সের পিছনে একটি মার্কেট। নিচ তলায় তেমন কোন ভিড় নেই। ভাবলাম, যাই ওখানে নিশ্চয় ন্যূনতাম শালীনতার কোন আড়াল থাকবে যেখানে প্রাকৃতির কর্মটা সারা যাবে। মার্কেটে গিয়ে একটা নির্জন গলি পেলাম। অবশেষে ওখানেই শরীরের তরল বর্জ্য বিসর্জন দিয়ে রাজ্যের অস্বস্তিগুলো দূর করলাম।

আসার পথে দেখি, এক কনস্টেবল একটি ওয়ারলেস সেট নিয়ে পুলিশ বক্সের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। সামনের ডাবল কেবিন পিকআপটি দেখে মনে হল, এই কনস্টেবল ভিতরের কোন অফিসারে সে অর্ডারলি হবে। কিন্তু ভিতরে কোন এএসপি পাইনি। ধরে নিলাম, ঐ কর্কশকন্ঠের ইন্সপেকটর সাহেবেরই সে অর্ডারলি হবে।

অর্ডারলির কাছে অনেকটা গলবস্ত্র হয়েই গেলাম। আদবের সাথে কথা বলার চেষ্টা করলাম। তার হাতে আমার একটি ভিজিটিং কার্ড ধরিয়ে দিয়ে বললাম, ‘ভাই এই কার্ডটা ভিতরের অফিসারদের হাতে দিয়ে বলবেন, যাকে অপনারা পুলিশ বক্সে ঢুকতেই দেননি, তিনি ছিলেন এই অফিসার।’

কিন্তু ভিজিটিং কার্ড দিয়েও ঘটল আর এক বিপত্তি। আমি তার হাতে কার্ডটি দিয়ে হন হন করে আমার বাসের দিকে হাঁটা শুরু করেছি কিনা, পিছন দিক থেকে অর্ডারলি কনস্টবল হাঁক দিয়ে উঠল, ‘এই শোন, দাঁড়া, কই যাইস ?’ আমি অবশ্য আর পিছনপানে তাকালাম না। সামনের দিকে ছুটে চললাম।

ঢাকা থেকে বগুড়া পর্যন্ত এলাম। মনে হল, ‘বিষয়টি একটু সংশ্লিষ্ট সার্কেল এএসপিকে জানাই। সাভার সার্কেলের এএসপি গল্প শুনে থ মেরে গেলেন। তিনি বললেন, এই ইন্সপেক্টরকে খুঁজে বের করে তিনি তার কৈফিয়ত তলব করবেন। তার একটা শাস্তির ব্যবস্থা করবেন।

কিন্তু আমি তাকে বিষয়টি নিয়ে কোন অফিসারকে টার্গেট না করতে অনুরোধ করলাম। কারণ, এটা একজন ইন্সপেক্টরের গল্প হলেও তা নিছক কোন একক পুলিশ অফিসারের সমস্যা বা রূঢ আচরণ নয়; এটা পুরো পুলিশের সাংগঠনিক সমস্যা।

পুলিশের বিরুদ্ধে মানুষের বড় অভিযোগ,তারা সাধারণ মানুষের সাথে দুর্ব্যবহার করে। আমি একজন সাধারণ মানুষের মতো পুলিশ বক্সে ঢুকতে নিয়ে দুর্ব্যবহারের শিকার হয়ে তার বাস্তব প্রমাণ পেয়েছি।

একটি সুশৃঙ্খল সংগঠনের নিম্ন পদস্থদের অপকর্মের দায়ভার ঊর্ধ্বতন অফিসারদের নিতে হয়। একজন সাধারণ যুবক পুলিশে ঢুকে পিটি, প্যারেড, আদব কায়দা শিখে। তাদের সকল প্রশিক্ষণের ভার ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের হাতে। এমন কোন পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নেই যেখানে প্রশিক্ষণকালে জনগণের সাথে পুলিশকে ভদ্র ব্যবহার করার সবক দেয়া হয় না। কিন্তু এই যদি প্রশিক্ষণার্থীরা গ্রহণ না করে সেটার দায় ভার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরই গ্রহণ করতে হবে। তাই এ পুলিশ বক্সের অফিসারদের কাছ থেকে যে যে দুর্ব্যবহার আজ আমি পেয়েছি তা আমার পাওনাই ছিল।

সার্কেল এএসপিকে বিষয়টি একজন মাত্র পুলিশ অফিসারের আচরণ না ভেবে তা পুলিশের সামগ্রিক আচরণের অংশমাত্র মনে করার অনুরোধ করলাম। এ বিষয়ে তাকে দেয়া সুনির্দিষ্ট কাজগুলো হল:

প্রথমত, কোন প্রকার লিখিত আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই তিনি উক্ত পুলিশ অফিসারকে শনাক্ত করে বিষয়টি উল্লেখপূর্বক তাকে ব্যক্তিগতভাবে উপদেশ দিবেন। এতে সংশ্লিষ্ট অফিসার তার নিজের ভুল বুঝতে পেরে তা থেকে ভবিষ্যতে বিরত থাকার চেষ্টা করবেন।
দ্বিতীয়ত, তিনি বিষয়টি কোন নির্দিষ্ট অফিসারকে উল্লেখ না করে অর্থাৎ কে দুর্ব্যবহার করেছেন এবং কে দুর্ব্যবহার পেয়েছেন তা উল্লেখ না করে আগামী কল্যাণ সভায় উপস্থাপন করে জেলার সকল পুলিশ সদস্যদের এ ধরনের ব্যবহার থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিবেন।

পুলিশ বক্সের অফিসারদের একজন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তার প্রতি এরূপ আচরণ প্রমাণ করে, জনগণের প্রতি পুলিশের দুর্ব্যবহার কোন অষাঢ়ে গল্প বা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নয়। এ অভিযোগের বাস্তবতা শুধু স্বীকৃতই নয়; প্রতিষ্ঠিতও বটে।

কোন পুলিশ বক্সে গিয়ে জনগণ পুলিশের কাছে নানা বিষয়ে তথ্য চাইতে পারেন। ট্রাফিক জামে ৮/১০ ঘন্টা আটকে থাকা যাত্রীরা পুলিশতে জিজ্ঞাসা করতে পারেন, কেন জামটি হচ্ছে ? এটা সারতে কতক্ষণ লাগতে পারে ? পুলিশ এজন্য কি কি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, ইত্যাদি। কিন্তু পুলিশ বক্সের দরোজা খুললেই যদি সাধারণ মানুষকে ‘দুর- ছাই, ভাগ শালা’ ইত্যাকার খিস্তি-খেউড় শোনান হয়, তবে বক্সের দরকার কি ?

আব্দুর রাজ্জাক: পুলিশে কর্মরত উপ-সচিব পদ মর্যাদার কর্মকর্তা।

(বিডিনিউজের সৌজন্যে)

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *