বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

ঘুষ না পেয়ে পুলিষের গুলি: প্রশাসনের অনুমতি ছিল না

tangail_killingটাঙ্গাইলের কালিহাতীতে মা-ছেলেকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ঘটনায় প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই বিক্ষোভকারীদের প্রতি গুলি ছোড়ে পুলিশ। তিন ঘণ্টাব্যাপী এ সংঘর্ষে ৩ জন নিহত হলেও কালিহাতী থানা পুলিশের পক্ষ থেকে উপজেলা বা জেলা প্রশাসনকে অবহিত করা হয়নি। বরং ঘটনার প্রধান আসামি রফিকুল ইসলাম রমার বড় ভাই মিনহাজ উদ্দিন মিঞ্জুর পক্ষে অবস্থান নেন খোদ কালিহাতী থানার ওসি (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) শহিদুল ইসলাম।

অভিযোগ রয়েছে, তিনি ১২ লাখ টাকা উৎকোচ নিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো সরকারি একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন সব তথ্য।

১৮ সেপ্টেম্বরের এ ঘটনায় নিহত ও আহতদের প্রতি পুলিশ সরাসরি গুলি করেছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, নিহত ও আহতদের অনেকে যেভাবে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন তাতে এটা স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় যে, পুলিশ বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি করেছে। এ ঘটনায় সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে নষ্ট হয়েছে। এ ব্যাপারে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হলে কিছুটা হলেও সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার জিল্লার রহমান বৃহস্পতিবার বলেন, টাঙ্গাইলের কালিহাতীর ওই ঘটনায় গুলি চালাতে পুলিশ উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের কাউকেই অবহিত করেনি। এমনকি কালিহাতী থানার ওসি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপারকেও (এসপি) বিষয়টি জানাননি। বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।

কালিহাতীর বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির আশ্বাস দেয়ায় এলাকাবাসী বর্তমানে শান্ত রয়েছে। তবে তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়া না হলে আবারও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।

এছাড়া আগামী ১০ নভেম্বর টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসনের উপনির্বাচনে পুলিশ কর্তৃক সাধারণ জনগণ নিহত হওয়ার ঘটনায় সরকারকে দায়ী করে কাদের সিদ্দিকী রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছেন বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়, বিক্ষোভ ঠেকাতে আসা পুলিশের সঙ্গে আসামির ভাই মিনহাজ উদ্দিন মিঞ্জুর আগমন, মিঞ্জুর সঙ্গে ওসির সখ্য, ওসি কর্তৃক মোটা অংকের টাকা উৎকোচ নিয়ে মামলা নিষ্ক্রিয় বা হালকা করে দেয়ার বিষয়ে যে গুঞ্জন উঠেছে তা তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করার নির্দেশ দেয়া যেতে পারে।

পাশাপাশি পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় এলাকার ৩ জন সাধারণ মানুষ নিহত হওয়ার বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে উদঘাটন করে দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেয়া যেতে পারে।

পাঁচটি কারণে পুলিশের প্রতি এলাকাবাসী বিক্ষুব্ধ বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এগুলোর মধ্যে রয়েছে- ক. ১৫ সেপ্টেম্বর রফিকুল ইসলাম রমার বাড়িতে যখন আলামিন ও তার মা সাহারা খাতুনকে নির্যাতন করা হয়, তখন এলাকাবাসী পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ এসে তাদের উদ্ধার না করেই চলে যায়।

খ. ভিকটিম ও প্রত্যক্ষদর্শীরা ধর্ষণের অভিযোগ করলেও কালিহাতী থানা পুলিশ ওই ধর্ষণের অভিযোগ আমলে নেয়নি।

গ. ঘটনার প্রধান আসামি রফিকুল ইসলাম রমার বড় ভাই মিঞ্জুর বাড়িতে কালিহাতী থানার ওসি শহিদুল ইসলাম ভাড়া থাকতেন। সেই সুবাদে মিঞ্জুর সঙ্গে কালিহাতী থানা পুলিশের বিশেষ সখ্য রয়েছে। এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে, এ ঘটনা ধামাচাপা দিতে ও আসামিদের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিতে কালিহাতী থানার ওসি মিঞ্জুর মাধ্যমে ১২ লাখ টাকা উৎকোচ নিয়েছেন। ১৮ সেপ্টেম্বর এলাকাবাসী যখন কালিহাতীতে নির্যাতনকারীদের বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে সে সময় পুলিশের সঙ্গে উল্লিখিত মিঞ্জুসহ তার কিছু অনুসারী উপস্থিত ছিলেন। এতে এলাকাবাসী পুলিশের প্রতি আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।

ঘ. মিঞ্জু কালিহাতী পৌর আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত নেতা। এলাকার বেশির ভাগ লোকই তাকে অপছন্দ করে। সে স্থানীয় থানা পুলিশকে ব্যবহার করে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে থাকেন। এলাকাবাসী মনে করে, পুলিশের সঙ্গে সখ্য থাকার কারণে পুলিশ আসামিদের বাঁচানোর চেষ্টা করছে।

এবং ঙ. ঘটনার নায়ক রফিকুল ইসলাম রমা এলাকায় লম্পট হিসেবে পরিচিত। তার তৃতীয় স্ত্রী হোসনে আরা রাইস মিলের বয়লার শ্রমিক ছিলেন। তাকে বিভিন্ন প্রলোভন দিয়ে রমা বিয়ে করেন। লম্পট প্রকৃতির রমা দ্বারা আলামিন ও তার মা নিকৃষ্টভাবে নির্যাতিত হওয়ায় এলাকাবাসী চরম ক্ষিপ্ত হয়। কিন্তু পুলিশের ভূমিকায় এলাকাবাসী আশ্বস্ত হতে পারেনি।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, এ ঘটনায় ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার জিল্লার রহমান, ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মো. মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান, অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ আলী, টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক মাহবুব হোসেনসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কালিহাতী যান এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে সাংবাদিকদের নিয়ে মতবিনিময় করেন।

ঘটনা তদন্তে পুলিশের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত ডিআইজি (শৃঙ্খলা) মো. আলমগীর আলমকে প্রধান করে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে জড়িত পুলিশ সদস্যদের টাঙ্গাইল পুলিশ লাইনে ক্লোজ করার নির্দেশ দেয়া হয়। টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারোয়ার হোসেনকে প্রধান করে ৩ সদস্যের আরও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

প্রসঙ্গত ১৫ সেপ্টেম্বর কালিহাতী উপজেলার সাতুটিয়া গ্রামে মা ও ছেলেকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন করে একই গ্রামের রফিকুল ইসলাম ওরফে রমা ও তার ভগ্নিপতি হাফিজ উদ্দিনসহ বেশ কয়েকজন বখাটে। এ ঘটনায় নারী নির্যাতন আইনে মামলার পর মূল আসামি রমাসহ তিনজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

দোষীদের শাস্তির দাবিতে ১৮ সেপ্টেম্বর ঘাটাইল উপজেলার আঠারোদানা, কালিহাতী উপজেলার সাতুটিয়া ও পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষ মাইকে ঘোষণা দিয়ে সমবেত হয়ে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। এক পর্যায়ে তারা কালিহাতী-ময়মনসিংহ সড়ক অবরোধ করে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে পুলিশ বেধড়ক লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও গুলি ছোড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই ৯ জন গুলিবিদ্ধ হন। আহত হন অর্ধশতাধিক।

গুলিবিদ্ধদের মধ্যে ঘটনাস্থলে ফারুক ও শ্যামল এবং টাঙ্গাইল মেডিকেলে নেয়ার পথে শামীমের মৃত্যু হয়।

আরও পড়ুন