ডিগবাজি খেয়েও লাভ হল না। সাতকানিয়া পৌরসভার মেয়র মোহাম্মদুর রহমান কয়েক মাস আগে বিএনপি ছেড়ে সরকারি দলে যোগ দিয়েছিলেন ‘গদিতে’ থাকা নিশ্চিত করার আশায়। স্থানীয় এমপি, জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের কিছু শীর্ষ নেতাকে ‘ম্যানেজ’ করে আওয়ামী লীগে যোগদানকারী এই নেতা দলীয় মনোনয়ন প্রাপ্তির দোরগোড়ায় পৌঁছেও গিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাতকানিয়া পৌরসভায় মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী পাঁচ তৃণমূল নেতার একাট্টা হওয়া এবং সুযোগসন্ধানীদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় কিছু নেতার কঠোর অবস্থানের কারণে শেষ মুহূর্তে মোহাম্মদুর রহমানকে মনোনয়ন দেয়া হয়নি। সাতকানিয়ায় দক্ষিণ জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক মোহাম্মদ জোবায়েরকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে আওয়ামী লীগ। বৃহস্পতিবার তিনি মনোনয়নপত্র জমাও দিয়েছেন।
এদিকে মেয়র পদে থেকে ১০ বছরে দুর্নীতির ষোলকলা পূর্ণ করেছেন মোহাম্মদুর রহমান। জাতীয় দিবস পালন উপলক্ষে ফুলের তোড়া বানানোর অবিশ্বাস্য বিল বানানো থেকে শুরু করে পৌরসভার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে নিজস্ব ঠিকাদারদের মাধ্যমে কাজ করিয়ে লাখ লাখ টাকা কমিশন হাতিয়ে নিয়েছেন। বহুল আলোচিত সেই মোহাম্মদুর রহমান মনোনয়ন না পাওয়ায় কেবল স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাধারণ নেতাকর্মীরাই খুশি হননি, তার চেয়েও বেশি খুশি হয়েছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।
দলটির জেলা ও উপজেলার অধিকাংশ নেতা বলেছেন, বিএনপির হয়ে মেয়র পদের স্বাদ গ্রহণ করেছিলেন মোহাম্মদুর রহমান। ১০ বছর তিনি এর ফল ভোগ করেছেন। কিন্তু দলের দুঃসময়ে নিজের স্বার্থে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে তিনি প্রকারান্তরে বিএনপির সঙ্গে বেঈমানি করেছেন। বিএনপি থেকে নির্বাচন করলে এবার সুবিধা করা যাবে না, মেয়র পদও টিকিয়ে রাখা যাবে না- এমন আশংকা থেকে তিনি ক্ষমতাসীন দলে যোগ দেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার এই ‘সুবিধাবাদী’ চরিত্র বিবেচনা করে আওয়ামী লীগ তাকে মনোনয়ন দেয়নি। এখন তার একূল-ওকূল দু’কূলই গেছে।
স্থানীয় আওয়ামী লীগ থেকে কেন্দ্র পাঠানো মোহাম্মদুর রহমানের দুর্নীতির বিবরণ এবং বিভিন্ন ঠিকাদারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মোহাম্মদুর রহমান নিজে পারিবারিকভাবে বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক হলেও ১০ বছরে পৌর মেয়র থাকাকালে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছেন। পৌরসভার কোটি কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজের সব জায়গা থেকে আর্থিক সুবিধা হাতিয়ে নেন তিনি।
সূত্র জানায়, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে দুটি জাতীয় দিবসে তিনি ফুলের তোড়ার খরচ দেখিয়েছেন ২৯ হাজার ৪৪০ টাকা। পৌরসভার আবর্জনা বহনকারী গাড়ি নিজের নির্মাণাধীন বাড়ির কাজে ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি পৌরসভার একমাত্র গাড়িটির মূল্যবান যন্ত্রাংশ খুলে নিয়ে নিন্মমানের পার্টস সংযোজন করার মতো অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে।
সাতকানিয়ার দেওয়ান হাটে বাংলাদেশ মিউনিসিপ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের (বিএমডিএফ) অর্থায়নে নির্মিত কিচেন মার্কেটের পুরনো ভবনের লোহালক্কড়সহ কয়েক লাখ টাকার মালামাল কোনো টেন্ডার ছাড়াই গায়েব করে ফেলেন মেয়র। এছাড়া ২০০৮ সালে তিনটি কোরবানির হাটের ইজারার টাকা পৌরসভার রাজস্ব খাতে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এরকম নানা অভিযোগ রয়েছে মোহাম্মদুর রহমানের বিরুদ্ধে।
ঠিকাদার আবুল কালাম বলেন, মোহাম্মদুর রহমান নিজস্ব লোক দিয়ে পৌরসভার কোটি কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ করিয়েছেন। গত মেয়াদে পৌরসভায় ৩০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ হলেও এর বিরাট একটি অংশ নানাভাবে মোহাম্মদুর রহমান ও তার ঘনিষ্ঠদের পকেটে ঢুকেছে। ইতিপূর্বে মোহাম্মদুর রহমান বলেছিলেন, মেয়র থাকাকালে কোনো ধরনের দুর্নীতি-অনিয়ম তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। বরং এলাকার উন্নয়নে সরকারি ফান্ডের দিকে তাকিয়ে না থেকে অনেক ক্ষেত্রে নিজের অর্থায়নে রাস্তা, ব্রিজ, কালভার্ট নির্মাণ করেছেন। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই তিনি বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছিলেন বলে দাবি করেন।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির ১৬ আগস্ট দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে নৌপরিবহন মন্ত্রীর হাতে ফুল দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন মোহাম্মদুর রহমান। দল ত্যাগের আগ পর্যন্ত তিনি দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছিলেন। সাতকানিয়া পৌরসভার প্রথম মেয়র মোহাম্মদুর রহমান ২০১০ সালে দ্বিতীয় দফায়ও নির্বাচিত হয়েছিলেন। বিএনপি-জামায়াতের এলাকা হিসেবে পরিচিত সাতকানিয়া পৌরসভার মেয়র হিসেবে তার দল ত্যাগের বিষয়টি কেউই ভালোভাবে নেননি। নবাগত এই নেতাকে নিয়ে আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ ছিলেন। বিএনপির নেতাকর্মীরাও তার ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ ছিলেন।
২০০৩ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় মোহাম্মদুর রহমান বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে অর্থের জোগান দেয়ায় তখন দলে হঠাৎ জনপ্রিয় হয়ে উঠেন তিনি। ২০০৫ সালে অনুষ্ঠিত সাতকানিয়া পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপির সমর্থন নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। পরেরবারও বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে তিনি মেয়র পদ ধরে রাখেন। বিভিন্ন কারণে বর্তমানে স্থানীয় বিএনপির নড়বড়ে অবস্থা দেখে তৃতীয়বারের মতো মেয়র হওয়ার স্বপ্নে বিভোর মোহাম্মদুর রহমান দল পাল্টে ফেলেন।



Leave a Reply