James Fowler & Harvard Nicholas Christakis এর এক গবেষণায় দেখা যায়, মানুষের আবেগ এবং ব্যবহার সংক্রামক। ধরুন আপনার পাশে একজন হাসিখুশি বন্ধু আছে। এক্ষেত্রে আপনার হাসিখুশি থাকার সম্ভাবনা ২৫ ভাগ বেড়ে যায়। তেমনিভাবে পরস্পরের ব্যবহারও পরস্পরের ব্যবহার দ্বারা প্রভাবিত হয়। কারো বিদ্বেষপূর্ণ ব্যবহার তার সাথের জনকেও বিদ্বেষপূর্ণ ব্যবহারে প্রভাবিত করে। বর্তমান সময়ে চারপাশের এরকম বিষোদগারপূর্ণ ও শত্রুতামূলক আচরণ ক্রমান্বয়ে একটা শত্রুতার দুষ্টচক্র তৈরি করেছে এবং জ্যামিতিক হারে বেড়েই চলেছে। যাদের সাথে একসময় অনেক হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল এখন কোথায় যেন একটা ছন্দহীনতা টের পাওয়া যায়। এভাবে চলতে থাকলে জানি না সিভিল সার্ভিসের সামনের দিনগুলো কেমন হবে?
স্ট্রাটেজিক ম্যানেজমেন্ট-এ একটা শব্দ বহুল প্রচলিত। এটা একটা সংগঠনের মাঝে কর্মীদের এবং এক সংগঠনের সাথে অন্য সংগঠনের সম্পর্কের বহুমাত্রিকতা প্রকাশ করে। শব্দটা হলো Coopetition. এই শব্দটা গঠিত হয়েছে Competition এবং Cooperation শব্দ দুটির সমন্বযে। যা দ্বারা একই সাথে সহযোগিতাপূর্ণ এবং প্রতিযোগিতাপূর্ণ দ্বিমাত্রিক সম্পর্ক প্রকাশ করে। ধরুন, আপনি একটা ক্যাডারে কর্মরত। আপনার পাশের সহকর্মীর সাথে আপনার অনেক বিষয়ে সহযোগিতার সম্পর্ক আছে; আছে কিছু বিষয়ে কেউ কারো থেকে ভালো করার, উন্নতি করার জন্য প্রতিযোগিতা। তেমনিভাবে এটা প্রযোজ্য একটা ক্যাডারের সাথে অন্য ক্যাডারের সম্পর্কে, একটা প্রতিষ্ঠানের সাথে অন্য প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কে। এই সহযোগিতা এবং প্রতিযোগিতা যুগপথভাবেই আবর্তিত হয়। এই গতিশীল সম্পর্কের বিষয়ে একটা বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি প্রতিযোগিতা যেন শত্রুতায় পর্যবসিত না হয়। এটা হলে সহযোগিতার সম্পর্ক নষ্ট হয়; যা সামগ্রিক ফলাফলের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর ফলে ব্যাহত হতে পারে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন।
বিবদমান কিছু বিষয়ের বিশ্লেষণ:
১। যা কিছু হারায় গিন্নি বলেন কেষ্টা বেটাই চোর: বর্তমানে আমাদের দেশেও একই অবস্থা বিদ্যমান। আমাদের যা কিছুই ঘটে সবশেষে দোষ ওই ব্যাটা আমলাদের। আমাদের দেশে দুইটা ফর্মুলা খুব জনপ্রিয় – ১) ধর্মকে কষে গালি দিয়ে কিছু লিখলে তা যতই যুক্তিহীন হোক মুক্তমনার খেতাব পেয়ে যাবেন ২) আমলাতন্ত্রকে কষে গালি দিয়ে সকল সমস্যার মূল হিসেবে চিহ্ণিত করতে পারলেই কেল্লাফতে; আপনি মেধাবী এবং বুদ্ধিজীবীর তকমা পেয়ে যাবেন।
আমলাদের অবস্থা নাকে দড়ি দেয়া প্রাণীর চাইতেও খারাপ। তাদেরকে যে যেভাবে পারে ইচ্ছামত ঘুরায় কিন্তু কিছু বলার মত অবস্থা নেই। অন্তত তাদের যদি স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের সুযোগ থাকত তবে অনেক বিষয়েই মানুষের ভুল ধারণাগুলো দূর হত। আমলারা নিজেরা নিজের কথা বলতে পারে না। আর যারা তাদের নিয়ে বলতে পারে তারা কখনো আমলাদের পক্ষে কিছু বলেছেন বলে আমার জানা নেই। পত্রিকা, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, উকিল, প্রকৌশলী, ডাক্তার থেকে শুরু করে সবাই আমলা বিরোধী; কিন্তু দিনশেষে আমলাদের সাথেই নিজের উচ্চতা মেপে দেখেন কতটা উঁচুতে বা নীচুতে তাদের অবস্থান। এতকিছুর পরেও আমলারা এ বিষয়ে বরাবরই সিভিল আচরণ প্রদর্শন করেছেন।
২। শিক্ষকদের বেতন, সম্মান ও অন্যান্য কিছু বিষয়: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ সম্মানের দিক দিয়ে সবার ঊর্দ্ধে। তাঁদেরকে ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স-এর বাইরেই সম্মান দেয়া হয়। একটি জেলায় দীর্ঘদিন এনডিসি থাকার সুবাদে নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই দেখেছি অনেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, এমপিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষককে সামনের আসনে দিতে। এ ধরনের আসন ছেড়ে দেবার ঘটনা সকল অধ্যাপকের ক্ষেত্রে ঘটে সেটা নয়।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এনডিসির দায়িত্ব থাকে ড্রাইভারসহ নেজারতের ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বেতন-বিল অনুমোদন। সদ্যই এনডিসির দায়িত্ব নেবার খেয়াল করলাম আমার অনেক ড্রাইভারের বেতন আমার থেকে শুধু বেশি না ঢের বেশি। সোনালী ব্যাংকের এমডির বেতন কম/বেশী ১০ লাখ টাকা কিন্তু চেয়ারম্যানের সম্মানী ৫-১০ হাজার টাকা। এখানে টাকার অঙ্কে সম্মান পরিমাপ করা যাবে না।
কিছুদিন আগে আসিফ নজরুল স্যারের একটা লেখা পড়লাম। সেখানে কিছু বিষয়ে স্যারের নির্মোহ বিশ্লেষণ ভাল লেগেছে। তবে কিছু বিষয়ে ছিল খণ্ডিত তথ্য। সেগুলোর বিষয়ে আলোকপাত করছি। আসিফ নজরুল স্যার নবম বিসিএস পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেও তিনি শিক্ষকতার প্রতি তাঁর ভালবাসা থেকে প্রশাসনের চাকুরি ছেড়ে দিয়েছেন। যে প্যাশন নিয়ে তিনি বিসিএসের চাকুরি ছেড়ে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় এসেছেন, ঠিক একই রকম প্যাশন নিয়ে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকও শিক্ষকতা ছেড়ে বিসিএস প্রশাসন বা অন্য কোন ক্যাডারের চাকুরি নিয়েছেন। আসিফ নজরুল স্যার সম্ভবত ২০০৪/০৫ সালের মধ্যে তৃতীয় গ্রেডের ফুল প্রফেসর হয়েছেন এবং এখন গ্রেড-১ এ বেতন পান। । অন্যদিকে, বিসিএস নবম ব্যাচের তাঁর ব্যাচমেটরা তৃতীয় গ্রেডধারী যুগ্ম সচিব বা সমমর্যাদার পদে গেছেন মাত্র ছয় মাস হলো, চাকুরির পঁচিশ বছরের বেশি সময় পার করার পর! তাঁদের মাঝে যাঁরা অতি সৌভাগ্যবান তারা আরো ৩/৪ বছর পরে গ্রেড-১ পাবেন এবং তিনি গ্রেড-১ এ চাকুরি করতে পারবেন সর্বোচ্চ ৩/৪ বছর (কারণ তাঁর অবসরের বয়স ৫৯), আর আপনি গ্রেড-১ পাবেন আরো ১৩ বছর (আপনার অবসরের বয়স ৬৫ বছর)।
স্যার আরেকটা বিষয় বলেছেন যুগ্মসচিব এবং তদূর্দ্ধ পর্যায়ে গাড়ি মেইনটেন্যান্স-এর জন্য ৪৫,০০০ টাকা ভাতার ব্যাপারে। এই ভাতাটা মূলত দেয়া হয় সরকারি গাড়ি এবং সরকার কর্তৃক প্রদত্ত ড্রাইভারের পরিবর্তে যদি কোন কর্মকর্তা সরকার থেকে লোন নিয়ে গাড়ি কিনেন। এক্ষেত্রে সরকারি গাড়ির মেইনটেন্যান্সের খরচ এবং ড্রাইভার খরচের পরিবর্তে সরকার তাকে মাসিক ৪৫,০০০টাকা ভাতা প্রদান করে। বলে রাখা ভাল যে, সরকারি ড্রাইভারদের (যাদের চাকুরি অনেকদিনের) বেতন এবং ওভারটাইম মিলিয়ে প্রায় ২০ হাজার টাকার ঊর্দ্ধে, ফুয়েলের খরচ (বরাদ্দ ১৮০লি: প্রতি লি: অকটেন ১০০ টাকা) ১৮০০০ টাকা সাথে প্রতিমাসেই কিছু না কিছু মেরামত খরচ। সরকারের এ সিদ্ধান্তের ফলে ব্যয় পূর্বের চেয়ে কম হবে। সরকার চিন্তা ভাবনা করেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
স্যার লিখেছেন, অধ্যাপকের সংখ্যা খুব বেশি হয়ে গেলে, বিশেষ গ্রেডে যাওয়ার সুযোগ অন্তত তার মধ্যে থেকে ১০ শতাংশের জন্য হলেও উন্মুক্ত রাখুন। স্যারের কথার সাথে আমিও একমত। তাঁদেরকে গ্রেড-১ এ যাবার সুযোগ থাকা উচিত। এখানে একটা শর্ত থাকতে পারে চাকুরি জীবেনর শেষ ৫ বছরের আগে কেউ গ্রেড-১ এ যেতে পারবে না। আর পদোন্নতির বর্তমান কাঠামোর সংস্কার করে এটাকে যুগোপযোগী অবশ্যই করা উচিত।
৩। সুপারিশসহ ফাইল গায়েব এবং প্রোপাগান্ডা তত্ত্ব: If you tell a lie big enough and keep repeating it, people will eventually come to believe it. গোয়েবলসের এই প্রোপাগান্ডা তত্ত্বে বিশ্বাসী অনেককেই পেলাম ফেসবুকে। ফেসবুকে দেখলাম একটা নিউজ ভাইরাল হতে এবং বাজারে সে নিউজের ব্যাপক কাটতিও লক্ষ্য করা গেল। কিন্তু আমরা কখনোই কোনকিছুর গভীরে চিন্তা করি না। নিউজটা হলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদিত সারসংক্ষেপ লাপাত্তা? শুধু নিউজই নয় সাথে একটা ছবিও দিয়ে দেয়া হলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর কিভাবে ছিল সে পাতায়, মাননীয় অর্থমন্ত্রী সেখানে কি লিখেছেন সেটাসহ গায়েব হওয়া পাতাটির ছবি। সারসংক্ষেপের পাতাটা যদি গায়েবই হয়ে যাবে তবে সাংবাদিক সাহেব কিভাবে সেই পৃষ্ঠার ছবি পোস্ট করলেন? খুঁজে বের করা দরকার কে ছবিটা তুলেছে এবং কেন সেটা ছবি তোলার পরপরই গায়েব হয়ে গেল।
৪। ভুল বোঝানো তত্ত্ব: যারা বলছেন আমলারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়েছেন বা এগুলো সব আমলাদের কারনে হচ্ছে তারা বিষযগুলো গভীরে না দেখে গতানুগতিক সমালোচনার জন্যই বলছেন। আপনারা কিভাবে বুঝলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাতে এত গোয়েন্দা তথ্য এতকিছু থাকার পরও গুটিকয়েক আমলার কথায় সবার বিরূদ্ধে বলবেন? আপনারা যারা জানেন আর যারা জানেন না তাদের জন্য বলছি- মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বোঝানো সম্ভব নয়। এসব বিষয়ে উনার ধারনা অনেক স্পষ্ট। বিভিন্ন কমিটির মিটিং বিশেষ করে একনেক, মন্ত্রিসভায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যখন আলোচনা হয় তখন সেই বিষয়ে উনি এতটা ইন ডেপথ আলোচনা করেন যা অনেক সময় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী/সচিব/সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বরতের জানার চেয়েও স্বচ্ছ। এই বিষয়টা অনেক সিনিযর স্যারের আলোচনা থেকে জানা। সুতরাং যারা এখনো ভুল বোঝানো তত্ত্ব বিশ্বাস করছেন তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। অধিকন্তু, বিভিন্ন পেশাজীবীদের মাঝে এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তি আছেন যারা অনেক মন্ত্রী/সাংসদ/সচিবের চাইতেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট রাজনৈতিকভাবে পরিচিত এবং গ্রহণযোগ্য। এত এত মানুষকে ডিঙ্গিয়ে, গোয়েন্দাদের গোপনীয় তথ্য উপেক্ষা করে গুটিকয়েক আমলা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে এতদিন ভুল বুঝিয়ে রেখেছেন এ ধরনের কথা বলার অর্থ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রজ্ঞা্ এবং দুরদর্শিতাকে ছোট করে দেখা।
প্রজাতন্ত্রের বেতন কাঠামো নির্ধারণ অবশ্যই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং সরকারের এখতিয়ার। গুটিকয়েক আমলা কি এতটা ক্ষমতাসম্পন্ন যে এতবড় একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেবে? আমলার কাজ সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন কোন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ নয়। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব নয়।
৫। সার্ভিস ভিত্তিক সুবিধা-অসুবিধা: আমলাদের বিরূদ্ধে এত এত প্রোপাগান্ডার কারনে ভবিষ্যত ক্যাডার প্রত্যাশীদের কাছে একটা ভুল বার্তা যাচ্ছে। তারা ভাবছে আমলারা মনে হয় সত্যিই অনেক ক্ষমতাসম্পন্ন। যার ফলে হয়ত আগের চাইতে অনেক বেশি পরিমাণ ছাত্র-ছাত্রী প্রশাসন ক্যাডারকে প্রথম পছন্দ হিসাবে গ্রহণ করবেন। তারপর সার্ভিসে আসার পর তাদের মোহভঙ্গ হবে এবং হতাশ হয়ে পড়বে।
কিন্তু সবকিছু কি আমলাদেরই নাকি অন্যদেরও আছে?
কাস্টমস এবং ট্যাক্স ক্যাডারের কর্মকর্তারা বৈধ পথেই যে কমিশন বছরে পায় সেটা সারা বছরের বেতনের চাইতেও বেশি। কই কেউ তো এটা নিয়ে কখনো তুলনা করেন না? তাদের প্রমোশন এবং পদায়ন প্রশাসন সার্ভিসের চাইতেও দ্রুত। পুলিশ সার্ভিসের প্রমোশন দ্রুত হয়, তাদের লজিস্টিকস অন্য যেকোন সার্ভিসের চাইতে বেশি। তাদের বিদেশে মিশন থেকে এক বছরে যা আয় হয় সেটা তার কযেক বছরের বেতনের চাইতে বেশি। র্যাবে চাকুরি কালীন ভাল পরিমাণ ডেপুটেশন ভাতা আছে। এই সুবিধাগুলো অন্য সার্ভিসে নেই। টেকনিক্যাল ক্যাডার এবং নন ক্যাডারে টেকনিক্যাল কর্মকর্তা যোগদানের সময়ই কয়েকটা ইনক্রিমেন্ট নিয়ে যোগদান করেন যেটা সাধারণ ক্যাডারগুলোতে নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের জন্য প্রতিদিন লাঞ্চের জন্য ভাতা আছে এবং এককালীন গৃহনির্মাণ বাবদ প্রায় ৬০ লাখ থেকে ৮০ লাখ টাকা ৫% সুদে ঋণের ব্যবস্থা আছে যা অন্যকোন সার্ভিসে নেই। ডাক্তারদের তেমনি আছে সরকারি চাকুরির বাইরেও প্রাইভেট প্র্যাকটিসের সুযোগ। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সুযোগ আছে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থায় কনসালটেন্সির সুযোগ যা অন্যদের নেই।
অন্যদিকে প্রতিটি সার্ভিসেই কিছু বিশেষ বিশেষ অসুবিধা অথবা ঝামেলাপূর্ণ দিক আছে যা অন্য সার্ভিসের সাথে মিলবে না। পুলিশ এবং মাঠ প্রশাসনের ডিউটি এবং কর্মঘণ্টার সাথে অন্য ক্যাডারের ডিউটি এবং কর্মঘণ্টা মিলবে না। পুলিশের চাকুরি তুলনামূলকভাবে অন্য যেকোন ক্যাডারের চাইতে ঝুঁকিপূর্ণ। এজন্য আমাদের তুলনাগুলো সামগ্রিক হওয়া প্রয়োজন কারণ কোন একটি বিশেষ সুবিধা আর অসুবিধা ধরে তুলনা করে কখনোই সঠিক উত্তর খুঁজে পাওয়া যাবে না।
তবে ডাক্তারদের জন্য প্রধান সমস্যা তাদের ব্লক পোস্ট এবং প্রমোশন। তাদের এ সমস্যার সমাধান করা উচিত। উপজেলায় আরএমও একজন কিন্তু সরকার পদ সৃষ্টি করে এখানে ৩/৪ জন আরএমও নিয়োগ দিতে পারে। আবার একজন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার অব্যবহিত পরেই ২ জন অতিরিক্ত উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার পদ তৈরি করা যেতে পারে।
৬। কৃত্য পেশাভিত্তিক মন্ত্রণালয়: কিছুদিন ধরেই কৃত্যপেশাভিত্তিক মন্ত্রণালয়ের জন্য জোড় দাবি জানানো হচ্ছে। ব্রিটিশ ঔরশে জন্ম এই আমলাতন্ত্র অচল; সারাবিশ্বে এর কোন প্রযোগ নেই ইত্যাদি ইত্যাদি। এত এত লেখা পড়ে নিজেরও একটু ইচ্ছা জাগলো বিভিন্ন দেশের সার্ভিস সম্পর্কে জানার। যা জানলুম তার সারবত্তা হলো বিভিন্ন দেশে ব্যুরোক্রেসি আছে এবং ভালমতই আছে। তারা হয়ত এই উপমহাদেশের ব্যুরোক্রেসির চাইতে দক্ষ এবং উন্নত। ইউএসএ তে এই সার্ভিসকে বলা হয় Senior Executive Service. এখানে দুই ধরনের নিযোগের ব্যবস্থা Career Reserved Positions এবং General Positions. জেনারেল পজিশনে যে কোন পর্যায় থেকে Career, non career, limited or contractual জব হোল্ডারদের মাঝ থেকে নিয়োগ দিতে পারে এসইএস এবং এই নিয়োগ কোনক্রমেই ২৫ ভাগের বেশি হবে না; বাকী ৭৫ ভাগ Career Reserved Positions হোল্ডারদের জন্য।
অত:পর বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়/ডিপার্টমেন্টের ওয়েবসাইটগুলো থেকে একটু তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করলাম। তাদের প্রোফাইলগুলো দেখে খুবই চমৎকৃত হলাম। অস্ট্রেলিয়ার স্বাস্থ্যসচিব জনাব মার্টিন বাওয়েলস একজন বিজনেজ গ্র্যাজুয়েট এবং ইতিপূর্বে বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট-এ কাজ করেছেন। উনা ও’ব্রায়েন ইউকে’র স্বাস্থ্যসচিব। উনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে গ্র্যাজুয়েশন এবং লন্ডন স্কুল অব ইকনোমিক্স থেকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করেছেন। এছাড়াও নেদারল্যান্ড, জার্মানি, সিংগাপুর ইত্যাদি দেশের স্বাস্থ্যসচিব ডাক্তার নয়।
এখন বলেন আমাদের দেশের ইতিহাস, বাংলা, ইংরেজি, অর্থনীতিসহ বিজনেস গ্র্যাজুয়েটদের সমস্যা কোথায়। মেধাবী মানে কেবল কিছু জিপিএ বা মার্কস নয়। যারা নিজেদেরকে মেধাবী দাবী করে ইতিহাস কে পাতিহাঁস কিংবা মানবিক/সামাজিক বিজ্ঞানের গ্র্যাজুয়েটদের উপহাস করেছেন তাদের প্রতি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে একরাশ করুণা।
৭। ডিএস পুল এবং ডিএস পুলে কোটা বিতর্ক: ডিএস পুল সম্পর্কে জানতে হলে প্রথমেই এর উৎপত্তি এবং কিভাবে একে সুপিরিয়র সার্ভিস বলা হলো সেটা জানতে হবে। তদানীন্তন পাকিস্তানে কেন্দ্রীয় এবং প্রাদেশিক সিভিল সার্ভিস ছিল। কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিসকে সুপিরিয়র সার্ভিস বলা হত এবং ডিএস পোস্টকে সুপিরিয়র পোস্ট বলা হতো। এখানে সুপিরিয়র পোস্টে কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিস থেকে ২/৩ ভাগ এবং প্রাদেশিক প্রশাসনিক সার্ভিস থেকে ১/৩ ভাগ পুরণ করা হত। এখানে কখনোই প্রাদেশিক ফাংশনাল সার্ভিস থেকে সুপিরিয়র পোস্টে নিয়োগ দেবার নজির ছিল না। তারও পূর্বে বৃটিশ ভারতের প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় সরকারের সকল উচ্চতর পদে ICS or IPS ক্যাডার হতে কর্মকর্তাগণ নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রাপ্ত হতেন।” উল্লেখ্য যে, তাঁরা সকলেই প্রশাসনিক ক্যাডারের সদস্য ছিলেন। আর ডিএস এর পর থেকে উপর পর্যায়ের পদগুলোর সাথে ক্যাডার পরিচয় রাখা হয় না ডিএস পুলে বিভিন্ন ক্যাডার থেকে এসে সুপিরিয়র সার্ভিসে আত্মীকরণের জন্য।
এবার আসি ডিএস পুলে কোটা বিতর্কে। ডিএস পুলে কোটা পদ্ধতির প্রচলন ছিল শুধুমাত্র প্রাদেশিক সিভিল সার্ভিসে কর্মরত প্রশাসন ক্যাডারের সদস্যদের জন্য। এখন যেহেতু প্রাদেশিক এবং কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিস আলাদা নয় সেহেতু কোটা পদ্ধতি আর না রাখাই উত্তম কারণ এগুলো প্রশাসন ক্যাডারের পদ।
সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগের মাননীয় প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে ফুল বেঞ্চ এ বিষয়ে একটি রায় দেন এবং সেই রায়েই ৭৫% এবং ২৫% ভাগ বণ্টণ করে রায় দেয়া হয়েছে। সেই রায়ের ৭৩ নং পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে “যেহেতু PSC এর সুপারিশ পর্যায় হইতেই কর্মকর্তাগণ বিভিন্ন ক্যাডারে শ্রেণীভুক্ত হইয়া যায় সেই হেতু সচিবালয়ের প্রশাসনিক উপ-সচিব পদে প্রশাসনিক কর্মকর্তাগণ ব্যতিরেকে অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তাগণের পুনরায় নিয়োগ বা পদোন্নতি প্রাপ্ত হইবার কোন সহজাত অধিকার নাই।”
সবশেষে আবার সেই শুরুর কথাই বলছি। আমাদের মাঝে যেন সহযোগিতা এবং প্রতিযোগিতার সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে এবং প্রতিযোগিতা যেন আমাদের মাঝের সহযোগিতার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নষ্ট না করে। শেষ করছি ছোটবেলার নৈতিকতা শিক্ষার একটা গল্প নতুনভাবে বলে।
গল্পটা সবাই পড়েছি। খরগোশ এবং কচ্ছপের গল্প। যে গল্পে কচ্ছপ খরগোশের বিপক্ষে জয়লাভ করে তার অদম্য মনোবল এবং পরিশ্রমের জোড়ে। এই গল্পের শিক্ষণীয় বিষয় ছিল, ‘Slow and Steady wins the race’.
সেই পুরনো গল্পটা শেষ হয়নি। আমাদের সামনে সেই গল্পটা নতুনভাবে এসেছে নতুন শিক্ষা নিয়ে। মধ্যযুগে এসে খরগোশ নতুন করে প্রতিযোগিতা আহবান করে। এবারের প্রতিযোগিতায় খরগোশ আর ঘুমায় না। একেবারে এক দৌড়ে প্রতিযোগিতা শেষ করে এবং বিজয়ী হয়। সে সময়ে স্লোগান ছিল, ‘Fast but steady wins the race’.
তারপর অনেক দিন পার হয়ে খরগোশ আর কচ্ছপ তখন আধুনিক যুগের বাসিন্দা। কচ্ছপ হাল ছাড়েনি তখনো। সে চিন্তা করলো এভাবে এই ধরনের প্রতিযোগিতায় সে কখনো খরগোশকে হারাতে পারবে না। সে মনে মনে ফন্দি আঁটল কিভাবে খরগোশকে হারানো যায়। সে খরগোশকে নতুন করে প্রতিযোগিতার আহবান করল একটা নতুন প্রতিযোগিতার মাঠে। খরগোশ প্রাণপনে দৌড়ে গিয়ে দেখল প্রতিযোগিতার ফিনিশিং লাইনের আগে ছোট একটা নদী আছে। সে আর নদী পার হতে পারল না। অবশেষে, কচ্ছপ আস্তে ধীরে নদী পার হয়ে ফিনিশিং লাইন অতিক্রম করে বিজয়ী হবার গৌরব অর্জন করল। তখন স্লোগান হলো, ‘Strategy based on your competencies wins the race’.
তবে এতদিনে একসাথে প্রতিযোগিতার ফলে তাদের মাঝে এক ধরনের সম্পর্কও তৈরি হয়েছিল। তাদের মাঝে এক নতুন বোধের উদয় হলো। তারা বুঝলো শেষ রেস্-টা তারা আরো দ্রুত শেষ করতে পারবে যদি তারা একসাথে দৌড়ায়। তারা একসাথে দৌড়ানোর সিদ্ধান্ত নিল। দৌড় শুরু করার পর প্রথম পর্যায়ে নদী পর্যন্ত খরগোশ কচ্ছপকে পিঠে নিয়ে দৌড়ালো এবং নদী পথটুকু কচ্ছপ খরগোশকে পিঠে নিয়ে পাড় হলো এবং এভাবে আগের থেকে অনেক কম সময়ে তারা দৌড় শেষ করল। গল্পের শিক্ষণীয় হলো, ‘Strategic cooperation and team work win the race’. এভাবে সকল সার্ভিসের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তৈরি হবে একটা টিম এবং সবার কৌশলগত সহযোগিতার মাধ্যমেই নির্মিত হবে আগামীর বাংলাদেশ।
আশরাফুল আলম: সহকারী কমিশনার (ভূমি), বাঁশখালী, চট্টগ্রাম।
পে স্কেল সম্পর্কে আরও জানতে পড়ুন:
o সিনিয়র সেক্রেটারি পদ দুনিয়ার কোথাও নেই: শেখ রেহানার স্বামী
o পে স্কেলের খসড়ায় প্রধানমন্ত্রীর সই করা নোটসিট গায়েব!
o পে স্কেলে বৈষম্য দূর করতে ১৪ সপ্তাহ সময় চায় সচিব কমিটি
o প্রধানমন্ত্রীর বকুনি খেয়ে বৈষম্য সমাধানে তালগোলে অর্থসচিব
o পে স্কেলে আমলে নেয়া হয়নি প্রচলিত বিধি, আইন ও সুপারিশ



