সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ডেসমন্ড বি স্যামুয়েল নামে এক ব্রিটিশ লোকের সঙ্গে বন্ধুত্ব বাংলাদেশি এক চিকিৎসকের। কথা হয় হোয়াটস অ্যাপেও। কথা বার্তায় বেশ সুচারু স্যামুয়েল কিছুদিনের মধ্যে চিকিৎসকের ভালো বন্ধু হয়ে যান। ‘ইংল্যান্ড থেকে’ পাঠান বেশ কিছু উপহারও। সবশেষ ১০ ফেব্রুয়ারি মিন-রো ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামের কুরিয়ার সার্ভিসের এক প্রতিনিধি ফোন করে (মোবাইল নম্বর ০১৭৪৭-২৬৪১০১) আরেকটি গিফট আসার কথা জানান।
রীতি মতো ওই চিকিৎসককে পরিবহন ব্যয় বাবদ পরিশোধ করতে হয় ৫৬ হাজার ৫শ ৬৬ টাকা। তবে পরিশোধের পরও পাননি তার উপহার। পরবর্তীতে ১৩ ফেব্রুয়ারি মিন-রো ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের ওই প্রতিনিধি একই মোবাইল নম্বর থেকে ফোন করে বলেন, ‘প্রেরণকৃত গিফট বক্স এর এক্স-রে স্ক্যান রিপোর্ট এর তথ্যে দেখা গেছে, বক্স এ ডায়মন্ড (হিরক) এর অতি মূল্যবান গহনা আছে যার মূল্য ২ কোটি টাকা। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে তাকে জানানো হয়, এই গিফট বক্স সংগ্রহ করতে হলে তাকে ২ লাখ ৬২ হাজার ৯শ টাকা আরেকটি ব্যাংক হিসাব নম্বরে পাঠাতে হবে।’
সেই মোতাবেক ওই চিকিৎসক গত ১৪ ফেব্রুয়ারি’১৬ মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেড এর মিন-রো ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের হিসাব নং-০৬৪১০২১০০০০৯৮৬ বরাবর আবার ২ লাখ ৬২ হাজার ৯শ টাকা জমা করেন। ওই দিনই অর্থাৎ বিকেলে তৃতীয়বার তাকে ফোনের মাধ্যম জানানো হয় যে, বক্স এর ভিতরে অনেক মূল্যবান দ্রব্যাদি থাকায় তাকে আরও ১০ লাখ ৮৩ হাজার টাকা পাঠাতে হবে। তখন তিনি ঐ গিফট বক্স এর যথাযথ অবস্থান জানতে চাইলে জবাবে পরবর্তীতে জানানো হবে বলে বলা হয়।
এমতাবস্থায় টাকার পরিমাণ বেশি হওয়ায় এবং গিফট বক্স এর সঠিক ঠিকানা না জানানোর কারণে বিষয়টি চিকিৎসকের কাছে সন্দেহজনক বলে মনে হয়। পরবর্র্তীতে তিনি এ বিষয়ে র্যাব এর শরণাপন্ন হলে র্যাব-২ এর একটি আভিযানিক দল বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে প্রথমে ব্যাংক হিসাবের ২ মালিক মোহাম্মদ আলী (৩০) এবং মঞ্জুর মাহমুদ (৩১) ব্যাংকের জমাকৃত টাকা উত্তোলন করতে গেলে তাদের আটক করেন।
ফেসবুক ব্যবহার করে এমন অভিনব প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে একটি চক্রের দেশি-বিদেশি ৫ নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। সম্প্রতি ওই চিকিৎসকের অভিযোগেই আটক করা হয় তাদের।
চিকিৎসকের করা অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়ে আটক এ চক্রটিকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া আংশিক তথ্যের উপর ভিত্তি করে র্যাবের একটি বিশেষ আভিযানিক দল বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের ফেসবুক, টুইটার, ভাইবার, হোয়াটস অ্যাপ এবং ইমো এর আইডি বিশ্লেষণ করে এই আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্রের সক্রিয় আরো ৩ নাইজেরিয়ান সদস্য ইজুচিউ ফ্রাংকিন (৩০), ওবি হ্যাচে (৩৪) ও ইক ফ্লিস্ককে (৩৫) আটক করে।
এসময় তাদের কাছ থেকে ৫৩ হাজার ১১ টাকা, পাসপোর্ট, বিভিন্ন ব্যাংকের ব্লাংক চেক, ক্রেডিট কার্ড এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য বেশ কিছু অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন পাওয়া যায়। এসব দ্রব্যাদি তারা বিভিন্ন প্রতারণামূলক কাজে ব্যবহার করে আসছিল। আটককৃত তিন নাইজেরিয়ান হাউজ নং-০৮, রোড নং-০১, ব্লক-বি, নিকেতন, ঢাকায় ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করছিলেন। প্রসঙ্গত যে, আটককৃত তিনজন নাইজেরিয়ান নাগরিকের কাছে বৈধ কোন কাগজ-পত্র নেই।
জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই নাইজেরিয়ান নাগরিকরা ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট থেকে বাংলাদেশের মোহাম্মদ আলী ও মঞ্জুর মাহমুদ এর সাথে যৌথভাবে গার্মেন্টস ব্যবসা শুরু করেন। গার্মেন্টস ব্যবসার পাশাপাশি প্রতারণার মাধ্যমে প্রাপ্ত টাকা মোহাম্মদ আলী ৫ শতাংশ এবং মঞ্জুর আহমেদ ৫ শতাংশ করে কমিশন পেতেন। প্রতারণার প্রথম পর্যায়ে তারা বাংলাদেশিদের মাধ্যমে টার্গেট খুঁজতে থাকেন। পরবর্তীতে যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যমে টার্গেট প্রাপ্তি স্বাপেক্ষে তাদের ফেসবুক আইডি বের করে তাদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলেন। এসব ক্ষেত্রে তারা খুবই সুদর্শন এবং আমেরিকা অথবা ইউরোপের নাগরিক পরিচয় দেন। তাদের এ প্রতারণার ক্ষেত্রে কিছু নারী সদস্যও আছেন বলে তথ্য পেয়েছে র্যাব। বন্ধুত্ব গাঢ় হওয়ার পরে তারা প্রেমের অভিনয় এবং বিভিন্ন উপহার পাঠানোর মাধ্যমে সম্পর্কটাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করে এবং এক পর্যায়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেন।


