“দ্য নেইম অফ দ্য রোজ”- শীর্ষক উমবের্তো ইকোর বেস্ট সেলিং উপন্যাসকে প্রায়শ উল্লেখ করা হয় পোস্টমর্ডান লিটেরেচার হিসেবে যা অতিক্রম করেছে জনপ্রিয় এবং সিরিয়াস সাহিত্যের সীমানাকে, উঁচু এবং নিচুর কালচারকে, এবং অন্য ঘরানা (ডিটেকটিভ নোভেল) নিয়ে তৈরী করেছেন প্যারোডি, আধুনিক যুগের নিশ্চয়তা তল্লাসে বড় ধরনের অভিব্যক্তি। তাঁর উপন্যাসের পরিশিষ্টে, ইকো উত্তরাধুনিকতা নিয়ে নিজস্ব ভাবনা পেশ করেছেন যেখানে পাওয়া যাবে এক ধরনের উৎকর্ষতা, এবং এক ধরনের প্যারোডি, আমাদের নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতাগুলো থেকে। লেখাটি উমবের্তো ইকোর বই পোস্টক্রিপ্ট টু দ্য নেইম অফ দ্য রোজ এর অংশবিশেষ নিয়ে প্রকাশিত দ্য ফনটানা পোস্টমর্ডানিজম রিডার বই থেকে অনূদিত যার শিরোনাম ছিল: সে বলে আত্মসচেতনভাবে ‘‘আমি তোরে ভালবাসি পাগলের মতো’’।– লেখাটি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন হোসেন মোফাজ্জল।
দুর্ভাগ্যক্রমে, ‘পোস্টমর্ডান’ বুলিটা হচ্ছে সকল কাজের কাজি (বোয়া তো ফে)। আমার এমন একটা ধারণা জন্মেছে এই শব্দটার ব্যবহারকারীরা যে কোন বিষয়ে আজকাল এটাকে কাজে লাগাতে পছন্দ করেন। তাছাড়া, এটাকে আগের তুলনায় বেশী বেশী ব্যবহারের চেষ্টা চলছে বলে মনে হয়: প্রথমত এটাকে আপাতদৃষ্টিতে ব্যবহার করা হয়েছিল নির্দিষ্ট কিছু লেখক এবং শিল্পীর বেলায় যারা সক্রিয় ছিলেন গেল বিশ বছর, তারপরে আস্তে আস্তে এটা পৌঁছে গেল শতাব্দির গোড়ার দিকে, তারপর গেল আরও আরও পেছনে। এবং এই পেছনে চলার রীতি চলছে তো চলছেই; শিঘ্রই হোমারকে পোস্টমর্ডান ক্যাটাগরিতে অর্ন্তভুক্ত করা হবে।
প্রকৃতপক্ষে, আমি বিশ্বাস করি উত্তরাধুনিকতা এমন কোন প্রবণতা না যা কালানুক্রমে সংজ্ঞায়িত করা যাবে, বরং বলা চলে এটা একটা আদর্শ রীতি প্রণালী বা আরো ভাল করে বললে এটা একটা কুনস্টোয়েন, কাজ করার একটা উপায়। আমরা বলতে পারি প্রতিটি কালেই ছিল তার নিজস্ব উত্তরাধুনিকতা, স্রেফ যেমনটি থাকে প্রতিটি কালের নিজস্ব ম্যানারিজম (এবং, আসলে, আমি অবাক হব উত্তরাধুনিকতা যদি মেটাহিস্টোরিক্যাল ক্যাটাগরিতে ম্যানারিজমের আধুনিক নাম না হয়ে থাকে)। আমি বিশ্বাস করি যে প্রতিটি কালেই একটা সংকট মুহূর্ত আসে যাকে নিৎসে বর্ণনা করেছেন তাঁর থটস আউট অফ সিজন বইতে, যেখানে তিনি লিখেছিলেন ইতিহাস চর্চা কিভাবে আমাদের বারোটা বাজিয়েছে। অতীত আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, লুন্ঠিত করেছে, ব্ল্যাকমেইল করেছে।
ঐতিহাসিক ভ্যান-গার্ড (কিন্তু এখানে আমি ভ্যান-গার্ডকেও মেটাহিস্টোরিক্যাল ক্যাটাগোরি হিসেবে বিবেচনা করেছি) চেষ্টা করেছে অতীতের সাথে গাঁটছড়া বাঁধতে। ‘‘ডাউন উইথ মুনলাইট’’ ছিল ফিউচারিস্টদের একটা শ্লোগান– প্রতিটি ভ্যান-গার্ডের কাছে যা ছিল একটা টিপিক্যাল প্ল্যাটফর্ম; আপনাকে শুধুমাত্র যা করতে হবে তা হলো ‘মুনলাইট’-এর বদলে যে কোন চলনসই একটা বিশেষ্য বসিয়ে দিলেই হবে। ভ্যান-গার্ড ধ্বংস করেছে, অতীতকে বিকৃত করেছে: লে দুমুওয়াজেল দাভিন্য়্যূ পেইন্টিংটা হচ্ছে টিপিক্যল একটা ভ্যান-গার্ডিও কর্ম।
তারপর ভ্যান-গার্ড আরও এগুতে থাকে, ফিগারের সর্বনাশ করে, তাকে বাতিল করে দেয়, বিমূর্ততে পৌঁছে যায়, অনানুষ্ঠানিক, খালি ক্যানভাস, ক্যানভাস চিরে ফেলা, ক্যানভাস আংশিক পুড়িয়ে কালো করে ফেলা ইত্যাদি ইত্যাদি। স্থাপত্যবিদ্যা এবং ভিজ্যুয়াল আর্টে, এটা হবে পর্দা দেয়া প্রাচীর, বিল্ডিং হবে যেন কেন্দ্রস্তম্ভ, খাঁটি সামন্তরিক ক্ষেত্র, মিনিমাল আর্ট; সাহিত্যের বেলায়, ডিসকোর্সের গতির বিনাশ, বারোজের (উইলিয়াম বারোজ) কোলাজ, নির্বাক, শাদা পাতা; সঙ্গীতে, গানের ছোট একটা অংশ অস্বরিক একটা অবস্থা থেকে উচ্চনাদে পৌঁছে গিয়ে একেবারে সুনসান হয়ে গেল (এভাবে ধরলে, জন কেইজের প্রথমদিককার কাজগুলো আধুনিক)।
কিন্তু এখন সময় এসেছে যখন ভ্যান-গার্ড (আধুনিক) আর সামনে এগুতে পারছে না; কারণ এটা তৈরী করেছে অধিভাষা (মেটাল্যাঙ্গুয়েজ) যা কিনা তার অসম্ভব টেক্সটগুলোকে (কনসেপ্টচ্যুয়াল আর্ট) বর্ণনা করছে। উত্তরাধুনিকতা, আধুনিককে এভাবে উত্তর দিচ্ছে যা গঠিত হয়েছে অতীতকে আমলে নিয়ে, যেহেতু এটাকে সত্যিকার অর্থে ধ্বংস করা যাবে না, কারণ এর বিনাশ প্ররোচিত করবে নির্বাককে, অবশ্যই যা আবার বারবার ফিরে আসবে: কিন্তু সরলচিত্তে নয়, বিদ্রুপের সাথে। আমি মনে করি পোস্টমর্ডান মনোভাবটি এমন ধরেন কোন একটা ছেলে সংস্কৃতিমনা একটা মেয়েকে ভালবাসে এবং ছেলেটা জানে মেয়েটাকে বলা চলবে না ‘‘আমি তোমাকে পাগলের মত ভালবাসি”, কারণ ছেলেটা জানে (এবং মেয়েটাও জানে যে এটা ছেলেটাও জানে) এইগুলো এরই মধ্যে বারবারা কার্টল্যান্ডের উপন্যাসে লেখা হয়ে গেছে, তবুও এখনও একটা উপায় আছে। ছেলেটা বলতে পারে “বারবারা কার্টল্যান্ড যেমনটি বলেন, আমি তোমাকে ভালবাসি পাগলের মতো।’’
এমন একটা অবস্থায়, মিথ্যা সরলতা বাদ দিয়ে, খুব পরিস্কারভাবে বলতে চাইলে কোনভাবেই আর সরলভাবে বলা সম্ভব হবে না, তা সত্ত্বেও ছেলেটি মেয়েটাকে যা বলতে চেয়েছিল: তাহলো সে ময়েটাকে খুব ভালবাসে, এবং সে মেয়েটিকে ভালবাসে লুপ্ত এক সরলতার কালে। মেয়েটা যদি এটার সাথে একমত পোষণ করে, তবে মেয়েটির কিছু এসে যায় না ভালবাসার জন্য এমন একটি বিবৃতির জন্য। এই দুই বক্তার কেউই আর নিজেদের নিষ্পাপ বা সরল ভাববে না, দুজনেই অতীতের চ্যালেঞ্জ গ্রহন করবে, এবং এর আগে যা বলা হয়েছিল, তা আর এড়ানো যাবে না; দুজনেই সচেতনভাবে এবং আনন্দের সাথে আয়রনি খেলা খেলবে…। কিন্তু দুজনেই কৃতকার্য হবে, আবারও, প্রেমের নামে।
আয়রনি, মেটালিঙ্গুয়িস্টিক খেলা, মানানসই উচ্চারণ। ফলে আধুনিকতার বেলায় খেলাটা যে কেউ পরিহার করতে পারবেন যদি তিনি খেলাটা না বোঝেন, কিন্তু উত্তরাধুনিকতার বেলায়, খেলাটা না বুঝেও সিরিয়াসলি খেলে যাওয়াটা সম্ভব হবে। যা সর্বপরি হচ্ছে আয়রনিটার একটা গুণ(ঝুঁকিটা)। সবসময় কাউকে না কাউকে পাওয়া যাবে যিনি আয়রনিক ডিসকোর্সকে গুরুত্বের সাথে নিচ্ছেন। আমার মনে করি পিকাসো, হুয়ান গ্রিস এবং ব্রাকের কোলাজগুলো ছিল আধুনিক: যার কারণে আমপাবলিক তাদেরকে গ্রহণ করবেন না। অন্যদিকে ম্যাক্স আর্নস্টের কোলাজগুলো, যিনি খানিকটা ঊনিশশতকের খোদাইগুলোকে একসাথে জোড়া দিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন উত্তরাধুনিক: যা কি-না মজার গল্প হিসেবে পড়া যেতে পারে, স্বপ্ন বলার মতো করে, কোনপ্রকার অবহিত না হয়েও তারা খোদাইকর্মের প্রকৃতি নিয়ে সমপরিমানের আলোচনা চালিয়ে যেতে পারেন, এমন কী তার কোলাজগুলো নিয়েও।
এই যদি ‘‘উত্তরাধুনিকতার” মানে দাঁড়ায়, তাহলে এটা পরিস্কার কেন স্টার্ন এবং র্যাবেলে উত্তরাধুনিক, নিশ্চিতভাবে কেনই বা বোর্হেস, আবার কেনই বা একই শিল্পী আধুনিক এবং উত্তরাধুনিক দুটো কালেই একইসাথে বা অদলবদল করে বা পরস্পরকে গভীরভাবে অনুসরণ করে সহাবস্থান করেন।
জয়েসের বেলায় দেখুন। Portrait গল্পটা হচ্ছে আধুনিক হবার একটা কোশেশ। ডাবলিনার্স, যদিও আগে প্রকাশিত হয়েছিল তবুও সেটা Portrait থেকে আরও আধুনিক। ইউলিসিস মাঝরেখা বরাবর। ফিনিগেনস ওয়েক এরই মধ্যে উত্তরাধুনিক, অথবা অন্ততপক্ষে এটা উত্তরাধুনিক ডিসকোর্সের সূত্রপাত করেছে: যদি বিষয়টি বুঝতে পারি তাহলে বলা যায়, এটা ইতোমধ্যে কথিত অস্বীকৃতিকে নয়, বরং এটি দাবী করছে পরিহাসময়( Ironic) পুনর্বিবেচনা। (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডট কম অবলম্বনে)



Leave a Reply