পরীক্ষার চাপ থেকে মুক্তি পেতে ফুপির বাসায় বেড়াতে গিয়েছিল আরহাম সামি, সাজিদ আরহাম নাবিল ও সাঈদ আরহাম সায়ান। সঙ্গে ছিলেন মা মরিয়ম বেগমও। কিন্তু ফেরার পথেই তাদের জীবনে এত বড় দুর্ঘটনা ঘটে যাবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেননি। ট্রেনের ধাক্কায় বাসের সঙ্গে দুমড়েমুচড়ে গেছে তাদের স্বপ্নও। সবচেয়ে বড় আপনজন মাকে হারিয়ে এখন গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালের বেডে কাতরাচ্ছে সামি। আর দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া ছোট্ট নাবিল ও সায়ান মায়ের ফেরার অপেক্ষার প্রহর গুনছে।
গতকাল সোমবার বেলা ১১টার দিকে চট্টগ্রামের বায়েজিদ থানার ষোলশহর ২ নম্বর গেট এলাকায় তেলবাহী ট্রেন একটি যাত্রীবাহী বিআরটিসি বাসকে ধাক্কা দিলে ওই তিন শিশুর মা মরিয়ম বেগমসহ অজ্ঞাত আরেক নারী নিহত হন। এ ঘটনায় সামি ছাড়াও নূর নবী, রত্না বেগম ও তার ছেলে নোমানও আহত হয়েছেন। তাদের সবাইকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ট্রেনটি চট্টগ্রামের বটতলী স্টেশন থেকে তেল নিয়ে হাটহাজারী বিদ্যুৎকেন্দ্রে যাচ্ছিল। অন্যদিকে, বিআরটিসি বাসটি অক্সিজেন মোড় থেকে শহরের দিকে আসছিল।
জিআরপি থানার ওসি হিমাংশু দাশ রানা জানান, ইঞ্জিন বাদে আটটি ওয়াগনের ওই ট্রেন রেলক্রসিং পার হওয়ার জন্য সিগন্যাল দেওয়ার আগেই বাসটি রেললাইনের ওপর চলে আসে। কিন্তু সামনে যানজট থাকায় সেটি এগোতে না পারায় দুর্ঘটনা ঘটে। ট্রেনের ধাক্কায় দুমড়েমুচড়ে যাওয়া বাসটি রাস্তা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
দুর্ঘটনার সাক্ষী মরিয়ম বেগমের আত্মীয় সাজিদ আহমেদ জানান, বাসের ঠিক মাঝখানের তিনটি আসনে বাচ্চাদের নিয়ে বসেছিলেন মরিয়ম। আমি মাঝপথে এ বাসে উঠেছিলাম। কিন্তু বাসটি ট্রেনলাইনের ওপর উঠে পড়ার পর বিপদ শুনেই আমি দ্রুত বাস থেকে নেমে পড়ি। কিছুক্ষণ পর দেখি, রেললাইনের পাশে পড়ে আছে মরিয়মের লাশ। চোখের সামনে দেখা এ মৃত্যু মেনে নিতে পারছি না। ট্রেনের হাত থেকে বাঁচতে বাস থেকে লাফ দেওয়াতেই মৃত্যু হয়েছে তার।
দুর্ঘটনার খবর শুনে হাসপাতালে ছুটে এসেছেন সামি, নাবিল ও সায়ানের ফুপি। তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনার কিছুক্ষণ আগেই বিদায় দিয়েছি ভাবি ও ভাতিজাদের। ভাবিকে দেওয়া বিদায়ই যে শেষ বিদায় হবে, তা তো জানা ছিল না।’
দুর্ঘটনায় আহত সামি গরীবে নেওয়াজ উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র। হাসপাতালের বেডে এখন সে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। এখনও তার জানা হয়নি, প্রিয় মা যে আর নেই। তবে মা যে আর আসবে না, তা এরই মধ্যে জানা হয়ে গেছে হালিশহর পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের চতুর্থ শ্রেণীতে পড়া নাবিলের। তার পরও ছোট ভাই সায়ানকে নিয়ে মায়ের জন্য প্রহর গুনছে সে। পরিবারটির এমন দুঃসময়ে তাদের বাবা শাহাদাত হোসেনও পাশে নেই। তিনি দুবাইপ্রবাসী। ফলে ছোট্ট তিন শিশু কীভাবে এই ধাক্কা সামলাবে, তা নিয়ে চিন্তিত তাদের স্বজনরা।
এদিকে, চমেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির নায়েক মোহাম্মদ হামিদ জানান, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে দুপুরেই রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা ফিরোজ ইফতেখারকে আহ্বায়ক করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন বিভাগীয় প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, বিভাগীয় সিগন্যাল ও টেলিকমিউনিকেশন কর্মকর্তা মো. সেলিম ও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার (লোকো) সাইফুল ইসলাম। আগামী তিন দিনের মধ্যে এই কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।



Leave a Reply