নববধূর কোলে প্রথম সন্তান আসছে- এ খবরে পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের আনন্দের সীমা ছিল না। কিন্তু ছেলেশিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর উৎসবের পরিবর্তে সবার মুখে বিষাদের ছায়া নামে। সদ্য পৃথিবীর মুখ দেখা শিশুটি মানবশিশু নাকি অন্য কিছু, তা নিয়ে সব খানে আলোচনা। কারণ তার অবয়বে বৃদ্ধ মানুষের ছাপ, বিকৃত চেহারা। দেখলে মনে হয়, সে আশি বছরের বৃদ্ধ।
বয়স এখন মাত্র চার। তবে দেখলে মনে হয় বৃদ্ধ। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, বৃদ্ধের মতো চেহারা নিয়েই ভূমিষ্ট হয় বায়েজিদ। দিন দিন তার শরীরে বার্ধক্যের ছাপ আরও প্রকট হতে থাকে।
তার দাদা হাসেম শিকদার জানান, ১৮ বছর বয়সে একমাত্র ছেলে লাবলু শিকদারকে খালাত বোনের সঙ্গে বিয়ে দেন। এক বছরের মাথায় মাগুরা ম্যাটারনিটি হাসপাতালে বায়েজিদের জন্ম। জন্মের সময় ওর শরীরে চামড়া ছিল না। চেহারা দেখে মানুষ আৎকে উঠত। ওকে ৮০ বছরের রোগগ্রস্ত বৃদ্ধর মতো দেখাত।
বয়স বাড়ার সঙ্গেসঙ্গে মুখ ও শরীরের চামড়া বৃদ্ধদের মতো ঝুলে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
হাসেম শিকদার বলেন, বায়েজিদকে মাগুরা, ফরিদপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলায় ডাক্তার দেখানো হয়েছে। কোনো চিকিৎসকই তার আসল রোগ চিহ্নিত করতে পারেননি।
নাতির উন্নত চিকিৎসার জন্য সংশ্লিষ্টদের সাহায্য কামনা করেন তিনি।
‘জিনগত সমস্যার’ কারণে বায়েজিদের এমন হতে পারে বলে মনে করছেন মাগুরা সদর হাসপাতালের মেডিসিন কনসালটেন্ট ডা. দেবাশীষ বিশ্বাস। বলেন, “এ ধরনের শিশু সম্ভবত আমাদের দেশে প্রথম দেখা গেল। এর আগে দেশে প্রজোরিয়া রোগে আক্রান্ত এক রোগীর সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। যে জন্মের এক মাস পর ধীরে ধীরে বৃদ্ধদের মতো হতে থাকে।”
“তবে বায়েজিদের মা-বাবার ভাষ্যমতে জন্ম থেকেই শিশুটি চেহারা ও শারীরিক অবস্থা বৃদ্ধদের মতো।
বিষয়টি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের গবেষণা প্রয়োজন বলে মনে করেন ডা. দেবাশীষ।
মহম্মদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিক্যাল অফিসার ডা. মোকসেদুল মোমিন জানান, একটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি যেমন জিনগত ও পরিবেশগত বিষয়ের ওপর নির্ভর করে, তেমনই নির্ভর করে তার সার্বিক সুস্থতা ও হরমোনের ওঠানামার ওপর। এ ছাড়া শৈশবে কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা, যেমন: কিডনি বা ফুসফুসের রোগ, অপুষ্টি ইত্যাদি কারণে শিশুর বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। শরীরের প্রায় সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বৃদ্ধি যে হরমোনগুলো নিয়ন্ত্রণ করে, তার মধ্যে থাইরয়েড ও গ্রোথ হরমন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই হরমোনগুলোর অভাবে শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি থমকে যেতে পারে বা ধীরে হতে পারে। নানা ধরনের জেনেটিক সমস্যায় এমন হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলে টার্নার বা ডাউনস সিনড্রোম। এ রোগের চিকিৎসা আছে। তবে তা জটিল, সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।
মা তৃপ্তি খাতুন জানান, স্বাভাবিক শিশুরা ১০ মাসে হাঁটা শিখলেও বায়েজিদ সাড়ে তিন বছরে হাঁটতে শিখেছে। আবার তিন মাস বয়সে তার সবগুলো দাঁত উঠেছে। সে স্বাভাবিক চলাফেরা ও খাওয়াদাওয়া করতে পারে।
শিশুটির বাবা লাবলু শিকদার বলেন, চেহারা ও শরীরে বার্ধক্যর ছাপ নিয়ে জন্ম নিলেও বায়েজিদের মানসিক গঠন ঠিক আছে। সমবয়সী অন্য বাচ্চাদের মতো স্বাভাবিকভাবে হাঁটা-চলা ও খাওয়া-দাওয়া করতে পারে। কথা বলতে পারে। তার স্মৃতিশক্তিও ভালো।
তিনি বলেন, এলাকার বিভিন্ন ডাক্তারের কাছে বায়েজিদের চিকিৎসা করিয়েছেন। চিকিৎসা অব্যাহত রাখলে ছেলে হয়তো স্বাভাবিক হত। কিন্তু উন্নত চিকিৎসা করানোর সামর্থ নেই তাদের।
লাভলু শিকদার বলেন, ‘অনেক ডাক্তার দেখিয়েছি। ৩-৪ লাখ টাকা ব্যয় করেছি। কোনো অসুখ ধরতে পারেননি চিকিৎসকরা। অনেক কষ্টে টাকাপয়সা সংগ্রহ করে কয়েক জায়গায় চিকিৎসা করিয়েও কোনো ফল পাইনি। চিকিৎসকরা বিদেশে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এটা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’
মা আয়েশা বেগম, বাবা হাসেম আলী শিকদার, স্ত্রী তৃপ্তি খাতুন ও বায়েজিদকে নিয়ে লাভলু শিকদারের পরিবার। নিজের সামান্য জমিতে কৃষিকাজ আর মৌসুমি ক্ষুদ্র ব্যবসা করে চলে তাদের সংসার।
মহম্মদপুর উপজেলার বিনোদপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. হামিদ মিয়া বলেন, কোনো বাবার কাছেই সন্তানের এই অবস্থা সুখকর নয়।
দরিদ্র এই বাবার সন্তানের চিকিৎসার জন্য বিত্তবান লোকদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান মো. হামিদ মিয়া।



Leave a Reply