বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

বাবুল আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদ নিয়ে চারটি প্রশ্ন

Mitu SP Babulমশিউল আলম।

খুন হওয়া মাহমুদা খানমের স্বামী এসপি বাবুল আক্তারের জন্য দেশজুড়ে জনমনে যে গভীর সমবেদনা-সহানুভূতি জেগেছিল, তা ছিল অকৃত্রিম। তাঁর প্রতি দেশবাসীর নিখাদ সহানুভূতি জেগেছিল হত্যাকাণ্ডের পরপর আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ ও সরকারের বদৌলতে এবং তাঁদের ভাষ্যগুলো সংবাদমাধ্যমে বিশেষ গুরুত্ব ও সহানুভূতিসহ প্রচারের ফলে। কর্তৃপক্ষের সুর ও গণমাধ্যমের সুর ছিল অভিন্ন।

পুলিশ সূত্রে সংবাদমাধ্যমের প্রচারণাগুলো ছিল এ রকম: বাবুল আক্তার পুলিশের চৌকস কর্মকর্তা; জঙ্গিবাদী তৎপরতা দমনে তাঁর কৃতিত্ব রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি লাভ করেছে, তিনি পুরস্কৃত হয়েছেন। সে কারণেই তাঁর পরিবার আক্রান্ত হয়েছে; তাঁর স্ত্রীকে শিশুপুত্রের চোখের সামনে যাঁরা নৃশংসভাবে খুন করেছেন, তাঁরা জঙ্গি—পুলিশ ও সরকারের তরফ থেকে দেওয়া এ রকম বক্তব্যই সংবাদমাধ্যমে প্রশ্নাতীতভাবে প্রচার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টা পরেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘অব্যাহতভাবে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে যে অভিযান চলছে, জঙ্গিদের দমন ও নিয়ন্ত্রণের জন্য আমাদের পুলিশ ফোর্স যেভাবে বীরত্বের সঙ্গে কাজ করছে, তাদের বিভ্রান্ত করার জন্য এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডটি হয়েছে বলে আমরা মনে করছি।’ (প্রথম আলো, ৬ জুন ২০১৬)।

একই দিনের সংবাদমাধ্যমে বলা হলো, ‘পুলিশের অনেক কর্মকর্তাই মনে করছেন, জঙ্গিবিরোধী অভিযানে বাবুল আক্তারের সাহসী ভূমিকার কারণে তাঁর স্ত্রী নিশানায় পরিণত হয়েছেন।’ এসপি বাবুল আক্তারও জঙ্গিদের প্রতি ইঙ্গিত করে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আপনাদের তো বলেছিলাম, ওরা আমার ক্ষতি করবে। ওরা আমার ক্ষতি করেছে।’ জঙ্গিরাই তাঁর স্ত্রীকে হত্যা করেছে—এ বক্তব্যের সমর্থনে সংবাদমাধ্যমে লেখা হলো, ‘খোয়াজ নগরে অভিযান চালানোর সময় জঙ্গিরা তাঁকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছুড়লেও তিনি বেঁচে যান। ওই অভিযানেই চট্টগ্রামে জঙ্গিদের অস্তিত্বের সন্ধান পাওয়া যায়। এরপর থেকে বাবুল আক্তার নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কায় থাকলেও পিছু হটেননি অভিযান থেকে। কিন্তু পরিবার-পরিজন নিয়ে তিনি সব সময় শঙ্কায় থাকতেন। সহকর্মী থেকে শুরু করে সাংবাদিকেরা যিনিই তাঁর সঙ্গে জঙ্গিসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে কথা বলতেন, তিনি পরিবার-পরিজন নিয়ে তাঁর শঙ্কার কথা বলতেন। তাঁর সেই শঙ্কাই সত্য হলো। আজ রোববার সকাল সাতটার দিকে চট্টগ্রাম নগরের জিইসি মোড়ে তাঁর স্ত্রী মাহমুদা খানমকে হত্যা করল দুর্বৃত্তরা।’(প্রথম আলো অনলাইন, ৫ জুন ২০১৬)।

স্ত্রীহারা এসপি বাবুলের জন্য সমবেদনা-সহানুভূতি ব্যক্ত হলো খোদ জাতীয় সংসদেও।

ওই হত্যাকাণ্ডের পরের চার-পাঁচ দিনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে প্রাণ গেল ছয়জনের। ৯ জুন মধ্যরাত থেকে দেশজুড়ে শুরু করা হলো জঙ্গিবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান। সাত দিনের অভিযান শেষে দেখা গেল, মোট গ্রেপ্তারের সংখ্যা ১৩ হাজার পেরিয়ে গেছে, যাদের মধ্যে মাত্র ১৯৪ জন সন্দেহভাজন জঙ্গি। জঙ্গি, জঙ্গিবাদ, চাপাতি, কুপিয়ে হত্যা, মোটরসাইকেলে তিনজন, একই কায়দায় টার্গেটেড কিলিং—এই সব শব্দ ও শব্দবন্ধের জোয়ারে ভাসল সংবাদমাধ্যম। কোথাও কেউ খুন হলেই সন্দেহের তির প্রথমেই ছোটে জঙ্গিদের দিকে। যেন বাংলাদেশে জঙ্গি ছাড়া আর কোনো অপরাধী নেই।

তারপর, সপ্তাহ তিনেকের মাথায় আমাদের স্তম্ভিত হতে হচ্ছে। আইন প্রয়োগকারীদের পক্ষ থেকে এখন যেসব কথা বলা হচ্ছে, যেসব আভাস-ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো আমলে নিলে এসপি বাবুলের রূপ আর নায়কসুলভ থাকছে না, প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছে।

প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার কারণ খোদ পুলিশ কর্মকর্তাদের ‘অসমর্থিত’ ভাষ্য। পুলিশ যখন যা বলে সংবাদমাধ্যমে তখন তা-ই প্রকাশিত হয়। এ ধরনের রহস্যজনক ঘটনায় সাংবাদিকেরা নিরুপায়ভাবে পুলিশের ওপরই নির্ভরশীল। সাংবাদিকতা গোয়েন্দাবৃত্তি নয়, যদিও সাংবাদিকদের নিজস্ব অনুসন্ধানের প্রচেষ্টা থাকে, প্রশ্ন তোলার দায়িত্ব থাকে। পুলিশ সূত্রেই সাংবাদিকেরা জেনেছেন ও দেশবাসীকে জানিয়েছেন যে গত শুক্রবার মধ্যরাতে এসপি বাবুল আক্তারকে তাঁর শ্বশুরের বাসা থেকে ঢাকার গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে নিয়ে ১৫ ঘণ্টা ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। পরদিন বিকেলে তাঁকে আবার শ্বশুরের বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বাবুল আক্তার বাসায় ফেরার পর থেকে নীরব। তাঁর শ্বশুর সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘স্যাররা কথা বলতে না করেছেন। কিছু বলা ঠিক হবে না।’ আর বাবুল আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন পুলিশ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেছেন, জিজ্ঞাসাবাদ থেকে তাঁরা এমন সব তথ্য পেয়েছেন, যা

শুনে নিজেরাই বিস্মিত হয়েছেন। কিন্তু পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তির স্বার্থে তাঁরা সেসব তথ্য প্রকাশ করতে পারছেন না (প্রথম আলো, ২৭ জুন ২০১৬)।

তারপর পুলিশের সূত্রেই সংবাদমাধ্যম আমাদের আরও জানাল, ঢাকার গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে বাবুল আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় পুলিশের ডিআইজি পদমর্যাদার তিনজন কর্মকর্তা তাঁকে বলেন, তিনি যে নিজের স্ত্রীর হত্যার ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন—এ বিষয়ে সব তথ্য–প্রমাণ তাঁদের কাছে আছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মুখে এ কথা শুনে বাবুল আক্তার কী প্রতিক্রিয়া করেছিলেন বা আদৌ কোনো প্রতিক্রিয়া করেছিলেন কি না, সে বিষয়ে কিছু লেখা হয়নি। কিন্তু তারপর কী? বাবুল জড়িত ছিলেন—এটা তিনি স্বীকার করে নিলে তার পরবর্তী আইনানুগ প্রক্রিয়া কী হওয়া উচিত?

না, সে প্রসঙ্গ ওঠেনি। উঠলে বাবুলকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার প্রশ্ন ছিল না। আইনত তাঁকে গ্রেপ্তার করতে হতো; মাহমুদা হত্যা মামলার বাদী বাবুল আক্তার পরিণত হতেন প্রধান সন্দেহভাজন আসামিতে। কিন্তু পুলিশের কর্তারা সে পথে যাননি। তাঁরা বাবুল আক্তারকে দুটি বিকল্প প্রস্তাব করেছেন: হয় কারাগার, নয় পুলিশ বাহিনী থেকে বিদায়। প্রথম বিকল্পটি নিশ্চয়ই তাঁরা চাননি, তাই তাঁকে ডেকে নিয়ে গিয়ে প্রকারান্তরে বলেছেন, তুমি পুলিশ বাহিনী থেকে বিদায় হও।

এসব যদি সত্য হয়, তাহলে চারটা সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন ওঠে: এক. পুলিশ কর্তৃপক্ষ এসপি বাবুলকে ত্যাজ্য করতে চাইছে কেন? বাহিনীর ‘ভাবমূর্তি’ রক্ষার স্বার্থে? তারা কি দেশবাসীকে এই বার্তা দিতে চায় যে, বাবুল আক্তারই তাঁর স্ত্রীকে হত্যার জন্য দায়ী এবং এ রকম ‘স্ত্রী হন্তারকের’ স্থান এই বাহিনীতে নেই? দুই. নাকি ‘চৌকস’ এসপি বাবুল আক্তারকে অন্য কোনো স্বার্থের বলি করা হচ্ছে? তিন. মানুষ হত্যার মতো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গে বাবুল আক্তারের সশ্লিষ্টতার সব তথ্য–প্রমাণ যদি পাওয়া গিয়েই থাকে, তাহলে তাঁকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় না করিয়ে পুলিশ বাহিনী থেকে চলে যাওয়ার সুযোগ দিলে কি পুলিশের ও সরকারের ভাবমূর্তি আদৌ রক্ষা পাবে? নাকি উল্টোটাই ঘটবে? চার. এ দেশের আইন প্রয়োগকারীরা কি মনে করেন, আইন শুধু অন্যদের ক্ষেত্রেই প্রয়োগযোগ্য? তাঁরা নিজেরা আইনের ঊর্ধ্বে?
মশিউল আলম: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *