ছোটবেলায় অনেক রচনা মুখস্ত করার চেষ্টা করেছি- জার্নি বাই বোট, জার্নি বাই ট্রেন বা জার্নি বাই বাস ইত্যাদি! এ রচনাগুলো মুখস্থ করার সময় হয়তো অনেক ক্ষেত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতা না থাকলেও কষ্ট করে মুখস্থ করার চেষ্টা করেছি, খুব একটা সফল হয়েছি বলে মনে পড়ে না। তবে এবার সত্যি সত্যিই জার্নি বাই ট্রেন মুখস্থ না করেই রচনা লেখার শিক্ষা পেয়েছি। আর এ শিক্ষাটা দিয়েছে গাইবান্ধা থেকে ঢাকা আসার ‘লালমনি এক্সপ্রেস’!
গাইবান্ধা থেকে ঢাকা আসার জন্য গত ১০ জুলাই ২০১৬ তারিখের লালমনি এক্সপ্রেসের টিকেট পেয়েছিলাম। যদিও ঈদের বাজারে টিকেট প্রাপ্তি ছিল আকাশের চাঁদ হাতের মুঠোয় পাওয়ার সমান! বাসের চেয়ে ট্রেন আমার কাছে পছন্দনীয় ছিল আমাদের ছোট্ট দুই সন্তানের সুবিধার জন্য। ৭ মাস ও ৫ বছর বয়সী দু’সন্তান এবং স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকা আসার জন্য ১০.০৭.২০১৬ তারিখ সকাল থেকেই প্রস্তুতি; কারণ লালমনি এক্সপ্রেসের গাইবান্ধা আসার সময় হচ্ছে দুপুর ১২.২৫ মিনিট।
ট্রেনের শিডিউলে দেখলাম এ ট্রেনটি ঢাকায় রাত ০৯.০৫ মিনিটে পৌঁছার কথা রয়েছে। আমরাও মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম প্রায় দিনে দিনেই জার্নি শেষ হবে এবং রাত ০৯ টার দিকে ঢাকা শহরের যে কোথাও যাওয়া সম্ভব- কোনও অসুবিধা হবে না। বেলা ৯ টার দিকে বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রেন ট্রাকিং মনিটরিং সিস্টেমের সহায়তা নিলাম। দেখলাম লালমনি এক্সপ্রেস ট্রেনটি ঢাকা থেকে লালমনিরহাট যাওয়ার পথে বগুড়াই ক্রস করেনি। ও মাই গড… এই ট্রেনটি বগুড়া ক্রস করবে তারপর বোনারপাড়া তারপর গাইবান্ধা, এরপর পীরগাছা, তারপর কাঊনিয়া এবং এরপর লালমনিরহাট যাবে। আবার লালমনিরহাট পৌছে কিছু সময় পর আবার এতগুলো পথ পাড়ি দিয়ে গাইবান্ধা আসবে এবং এক সময় ঢাকা যাবো- এরকম ভাবতেই খুব কষ্ট লাগছিল!
ওই মুহুর্তে বাসের টিকেটের জন্য চেষ্টা শুরু করলাম এবং যথারীতি ব্যর্থ হলাম। এর পর উপায়ন্তর না দেখে ট্রেন ট্রাকিং মনিটরিং সিস্টেমের সহায়তা নেয়ার জন্য মোবাইল কোম্পানিকে প্রতিবার পাঁচ টাকা করে দিলাম। অবশেষে সেই ট্রেনের ধরা মিললো বিকাল ৫.১২ মিনিটে।
ট্রেনে উঠে মোবাইলে গুগল সার্চে লালমনি এক্সপ্রেস দিতেই বেশ কিছু পত্রিকার নিউজ দেখতে পেলাম। সেগুলো দেখে মনে হলো এই ট্রেনটি যে ১০.০৭.২০১৬ তারিখেই যে লেট বা ঈদ উপলক্ষে লেট তা নয়- এটি এই আন্তঃনগর ট্রেনের অন্যতম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রায় প্রত্যেক দিনই ন্যুনতম সাড়ে তিন ঘণ্টা থেকে ৪ ঘণ্টা লেট করে। অনেক পত্রিকায় এই আন্তঃনগর ট্রেনের শিডিউল মেইনটেইন না করার কারণে যাত্রী দুর্ভোগের অনেক গল্প রয়েছে। কিন্তু লাভের খাতা একেবারেই শুণ্য।
যাই হোক, ট্রেনের পুরো শরীর জুড়ে যাত্রী বাহন আর প্রচণ্ড গুমোট গরমে আমাদের ছোট বাচ্চাসহ প্রায় সকলেরই ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। এভাবে চলতে চলতে অবশেষে আমার যখন ঢাকায় পৌঁছলাম তখন ফজরের আযান দিচ্ছে। হিসেব করে দেখলাম আমার ঢাকায় পৌছার কথা ১০.০৭.২০১৬ তারিখের রাত ০৯টা ৫ মিনিটে, কিন্তু পৌঁছলাম ১১.০৭.২০১৬ তারিখের ভোর প্রায় সাড়ে চারটায়। সাত ঘন্টার অধিক সময় দেরী। ফলাফলঃ ১) ভোর রাতে ছোট বাচ্চা স্ত্রীসহ ঢাকার রাস্তায় যাত্রা (শংকা ও অনিরাপত্তা) ২) ১১.০৭.২০১৬ তারিখে আমার ও আমার স্ত্রীর অফিসে অনুপস্থিতি, ৩) আমার ৭ মাস বয়সী ছোট ছেলের পেটের সমস্যা, ৪) বড় ছেলের শারীরিক সমস্যাসহ স্কুল মিস্।
ফলাফল আরো বেশী খারাপ হতে পারতো বা অনেকরই হয়েছে! অনেক যাত্রী হয়তো বিমানের ফ্লাইট মিস করেছেন, অনেক অসুস্থ ব্যক্তির অবস্থা হয়তো আরোও খারাপ হয়েছে, অনেক শিশুই হয়তো আমাদের সন্তানদের মতো অসুস্থ হয়েছে, অনেক যাত্রী হয়তো ঢাকায় নেমে গভীর রাতে যাত্রাপথে অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, অনেকই হয়তো জরুরী অফিসে উপস্থিত হতে পারেননি বা এ রকম আরোও অনেক কিছু!
শুনেছি অন্যান্য রুটে ট্রেন মোটামুটি ঠিকঠাক মতোই চলে, শিডিউল ফেইল করলেও হয়তো ঘন্টা এক বা দু’য়েক। কিন্তু একটা আন্তঃনগর এক্সপ্রেস ট্রেনের নিয়মিত দীর্ঘ ৭ ঘন্টা দেরী কোনওভাবেই মেনে নেয়া যায় না। জানি না বাংলাদেশের অন্যান্য সেক্টরের মতো সদাশয় রেল কর্তৃপক্ষের কোনও ইনোভেশন আছে কি-না যাতে আমাদের ক্ষুদ্র সামর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার করা যায়। (লেখকের ফেসবুকে প্রকাশিত স্ট্যাটাস থেকে সংগৃহীত)
লেখক: বাংলাদেশ সরকারের সচিবালয়ে কর্মরত প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা।




Leave a Reply