গুলশানে জঙ্গি হানায় নিহত হওয়া ওসি সালাউদ্দিন আহমেদের শোকে পুলিশবাহিনী কাতর হলেও তার অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য মরণোত্তর বিচারের দাবি উঠেছে।
ওসি সালাউদ্দিন কি করেছিলেন? সংক্ষিপ্ত পরিসরে জেনে নেওয়া যাক। এছাড়া কত নৃশংস এবং ভয়ঙ্কর পুলিশ ছিলো ওসি সালাউদ্দিন সেটা জানতে ৩ মাস আগে সম্প্রচারিত যমুনা টিভির অপরাধ বিষয়ক অনুসন্ধানী রিপোর্টটি দেখুন। রিপোর্টে তার পূর্বের কর্মস্থল মিরপুর, কোতোয়ালি থানার কিছু পাশবিক কাণ্ডের বিবরণ তার অপকর্মের অল্প কিছু হিসাব বেরিয়ে এসেছে।
এক সময় মিরপুরের ত্রাস ছিলেন ওসি সালাউদ্দিন। থানা হেফাযতে পিটিয়ে হত্যা, ধরে এনে নির্যাতন, গ্রেপ্তার বাণিজ্য হেন কাজ নেই তিনি করেননি।
এসব কারণেই বনানী থানায় বদলি করা হয় তাকে। কিন্তু এতটুকুও দমেননি তিনি।
তার এই ধরনের আচরণ অবশ্য নতুন নয়। সেই সব কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি টানলে অনেক বড় হয়ে যাবে।
সংক্ষেপে যদি উল্লেখ করা যায় তাহলে দেখা যায়:
সেপ্টেম্বর ২০১০, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক অভিযোগে বলা হয়, সালাউদ্দিন খানের শেয়ারবাজারে এক কোটিরও বেশি টাকা বিনিয়োগ ছাড়াও নামে-বেনামে কয়েক কোটি টাকার সম্পদের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।
ফেব্রুয়ারি ২০১১, অবৈধ অর্থ আয়ের দুদকের তদন্তের নথি গায়েব। অথচ দোষী সাব্যস্ত করে চিঠি দিয়েছিল দুদক।
২৯ মে ২০১২, আদালত চত্বরে এক তরুণীর শ্লীলতাহানি করেন ওসি সালাউদ্দিন এবং সাংবাদিক-আইনজীবীদের বেধড়ক পেটান। দিনভর কোতোয়ালী থানায় আটকে রাখেন তরুণীকে।
ইসলামপুরে দেশীয় নিম্নমানের কাপড়ে অবৈধ ভাবে বিদেশি সিল লাগানোর কারখানার মালিক বাবুল ওরফে জাপানি বাবুলের কাছ থেকে প্রতি মাসে দুই লাখ ঘুষ নিতেন।
আগস্ট ২০১২, তার নির্দেশে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের ছাত্র আযহারুল ইসলামকে থানায় নিয়ে হাত পা ভেঙে হাত পায়ের নখ উপড়ে ফেলে পুলিশ। পরিবারের কাছে ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিল।
১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ছেলে শিক্ষানবিশ আইনজীবী আসিফ মোহাম্মদ জুনায়েদকে মিরপুর থানা অন্যায়ভাবে আটক করলে থানায় যান বাবা অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম। ওসি দুইজনকেই গ্রেপ্তার করেন।
১৭ মার্চ ২০১৩, বাবলু নামের এক যুবকের পায়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে পঙ্গু করে দেন।
১০ এপ্রিল ২০১৩, কাজীপাড়া থেকে মিল্টন ও শিপন নামে দুই যুবদল কর্মীকে গ্রেপ্তার করে থানায় নেয়ার আধাঘণ্টা পর হাতে পায়ে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাদের পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
২১ অক্টোবর ২০১৩, মিরপুর ন্যাশনাল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২২ জন শিক্ষককে একসঙ্গে গ্রেপ্তার করে। মামলার ভয় দেখিয়ে শিক্ষকদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা খান।
২৫ অক্টোবর ২০১৩, ব্যাংক কর্মকর্তা এবং মনিপুর স্কুলের শিক্ষককে পেট্রোলবোমা মারার মামলা দিয়ে গ্রেপ্তারের নামে হয়রানি করে।
২৬ ডিসেম্বর ২০১৩, তার নেতৃত্বে পুলিশ মিরপুরের যুবদল নেতা মামুন ও তার ভাইয়ের বাসায় তল্লাশি, ভাঙচুর। আটক করে আনেন মামুনের ভাইয়ের স্ত্রী ও কলেজপড়ুয়া মেয়েসহ কয়েকজনকে। মামুনের প্যারালাইজড ভাইকে লাথি মেরে শিশুপুত্রসহ ঘরে আটকে রাখে।
২ মে ২০১৪, ব্যবসায়ী শীষ মনোয়ারকে থানায় ডেকে নিয়ে নির্যাতনের পর তার বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা দেন।
১২ জুলাই ২০১৪, প্রতি মাসে ১ লাখ টাকা করে চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় ঝুট ব্যবসায়ী সুজনকে ধানমণ্ডির শংকরের বাসা থেকে আটক করে মিরপুর থানায় বেধড়ক পিটিয়ে হত্যা।
২ সেপ্টেম্বর ২০১৪, ঢাকা বারের সদস্য অ্যাডভোকেট শেখ আব্দুল ওয়াহিদকে মামলা প্রত্যাহারে জন্য মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে হত্যার হুমকি দেয়।
২৫ নভেম্বর ২০১৪, ২৮ ঘন্টা থানায় আটকিয়ে রেখে অকথ্য নির্যাতন করে রাকিব হোসেন নামের এক সংবাদ কর্মীর কাছ থেকে ১ লাখ দশ হাজার টাকা নেয়।
৭ জানুয়ারি ২০১৫, রাত সাড়ে ১১টার দিকে সারাদিন কাজ শেষে রিকশা ভ্যান নিয়ে বাসায় যাওয়ার সময় মোহাম্মদ রিপন নামে এক সবজি বিক্রেতাকে দক্ষিণ পীরেরবাগ এলাকা থেকে ধরে মিরপুর থানায় নিয়ে আসে পুলিশ। পরে তাকে সহিংসতার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। একইভাবে পান-সিগারেট ব্যবসায়ী ইমরানকে ধরে নিয়ে আসে।
৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, মেডিকেল কলেজের ছাত্র আব্দুল্লাহ হোসাইনকে তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ধরে নিয়ে আসে। খোঁজ নিতে থানায় গেলে তার ভাই হাসানকেও গ্রেপ্তার করে। তাদের দুইজনকে নিয়ে বাসায় অস্ত্র উদ্ধারে গিয়ে ব্যাপক ভাংচুর করে এবং তাদের অসুস্থ বাবা এনায়েত উল্লাহকে থানায় ধরে নিয়ে যায়।
১৯৬৭ সালে গোপালগঞ্জ জেলার সদর থানার ব্যাংক পাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ওসি সালাউদ্দিন। গোপালগঞ্জ হাই স্কুল থেকে এসএসসি, ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি ও গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু কলেজ থেকে ১৯৮৭ সালে বিকম পাস করেন। ১৯৯১ সালের আগস্ট মাসে উপ-পরিদর্শক (এসআই-নিরস্ত্র) পদে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে ইন্সপেক্টর (নিরস্ত্র) পদে পদন্নোতি পান। ২০০৭ সালে হাজারীবাগ থানায় ওসি হিসেবে যোগ দেন। এক-এগারো সরকারের সময় তাকে বদলি করা হয়েছিল রাজশাহী রেঞ্জে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরপরই বদলি হয়ে আসেন ঢাকার উপকণ্ঠ কেরানীগঞ্জে। ২০০৯ সালের ২৯ মার্চ কোতোয়ালী থানায় যোগ দেন। ২০১২ সালের ১১ আগস্ট বদলি হোন মিরপুর থানায়। এরপর চলতি বছর তাকে পাঠানো হয় বনানী থানায়। চাকরি জীবনে একাধিকবার সাসপেন্ড হয়েছিলেন ওসি সালাউদ্দিন।
ওসি সালাউদ্দিনকে নিয়ে যমুনা টিভির বিশেষ অনুষ্ঠানটি দেখুন:
https://youtu.be/kqNDAdYGklE



Leave a Reply