খালেদা জিয়ার চা খাওয়ার আমন্ত্রণে দু-একটি দলের সাড়া দেওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও খুব সহজে রূপ নিচ্ছে না বিএনপির প্রস্তাবিত বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য। আদর্শিক কারণে এমন ঐক্য গড়তে রাজি নয় সিপিবি ও বাসদ। আর মূল বাধা বলে বিবেচিত জামায়াতকে পরিত্যাগ করলেও প্রগতিশীল দলগুলো সহজেই রাজি হয়ে যাবে, এমন সম্ভাবনাও কম। কারণ আদর্শিক ইস্যু ছাড়াও বিএনপির কাছে ওই দলগুলোর আরো অনেক দাবিদাওয়া আছে।
প্রথমত, জামায়াতকে পুরোপুরি বহিষ্কারের পাশাপাশি তারা ক্ষমতার অংশীদারি চায়। আগেভাগেই নিষ্পত্তি করতে চায় আগামী নির্বাচনে আসন ভাগাভাগির বিষয়টি।
দ্বিতীয়ত, সরকারে গেলে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ভূমিকা কী হবে সেটিও আগেভাগে নিশ্চিত করার পক্ষে বেশ কয়েকটি দল।
এককথায় চূড়ান্ত ঐক্যের আগেই বেশির ভাগ দল একসঙ্গে আন্দোলন, নির্বাচন ও সরকার গঠনের সুস্পষ্ট ঘোষণা চায় বিএনপির কাছ থেকে। আর এটি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিএনপির নেতৃত্বে জোট গঠন করে সরকারের রোষানলে পড়তে রাজি নয় সরকারি জোটের বাইরে থাকা দলগুলো। একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
সিপিবি ও বাসদের দুজন প্রথম সারির নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রথমত, জামায়াতকে বিএনপি পুরোপুরি ছাড়বে এটি তাঁরা বিশ্বাস করেন না। দ্বিতীয়ত, তাঁরা বাহাত্তরের সংবিধানের চার মূলনীতিতে বিশ্বাসী। ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের পক্ষে তাঁদের অবস্থান স্পষ্ট। ফলে জাতীয়তাবাদী ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী বিএনপির সঙ্গে তাঁদের ঐক্য হবে না। এ ছাড়া তারেক রহমানকে নিয়েও সিপিবি-বাসদের আপত্তি রয়েছে বলে জানা গেছে। ওই দুই নেতা বলেন, যে দলটির মধ্যে ন্যূনতম গণতান্ত্রিক চর্চা নেই, যেখানে কাউন্সিলের আগেই মা চেয়ারম্যান ও ছেলে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন, সেই দলের সঙ্গে সিপিবি-বাসদের ঐক্য হতে পারে না।
সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য হায়দার আকবর খান রনো বলেন, আদর্শিক কারণে বিএনপির সঙ্গে সিপিবি-বাসদের ঐক্য এত সহজ হবে না। তাঁর মতে, ‘আমরা আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন কোনো জোটেই যাব না।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চায়ের আমন্ত্রণে যাওয়ার সম্ভাবনাও কম। কারণ এটি নিছক চায়ের দাওয়াত নয়, রাজনৈতিক মুভ—যোগ করেন তিনি।
বিকল্প ধারার সভাপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও তাঁর ছেলে মাহী বি চৌধুরী দুজনেই এখন যুক্তরাষ্ট্রে। ৯ আগস্ট তাঁদের দেশে ফেরার কথা রয়েছে। এ মুহূর্তে বিদেশে রয়েছেন গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেনও।
বিকল্প ধারার মুখপাত্র মাহী বি চৌধুরী টেলিফোনে বলেন, ‘প্রথমত, জামায়াতকে বিএনপি ছাড়বে এটিই আমরা বিশ্বাস করি না। দ্বিতীয়ত, জাতীয় ঐক্যের বিষয়টি আসলে রাজনৈতিক ঐক্য। ফলে ওই ঐক্য করতে কতগুলো কর্মসূচির ব্যাপারে একমত হতে হবে। একসঙ্গে আন্দোলন, নির্বাচন ও সরকার গঠনসহ ঐক্যের কাঠামো কী হবে এ বিষয়টি নিশ্চিত না করা পর্যন্ত কিছুই সম্ভব নয়।’ তাঁর মতে, অতীতে বিএনপিকে নিয়ে তাঁদের অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে। ফলে বোঝাপড়া না করে রাজনৈতিক ঐক্য সম্ভব নয়। সম্ভব নয় সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে ঝুঁকি নেয়াও—বলেন মাহী বি চৌধুরী।
কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী অবশ্য কিছুটা ভিন্ন মত পোষণ করে বলেন, ‘দেশে এখন ক্রান্তিকাল ও চরম অনিশ্চয়তা চলছে। আমরা এ অনিশ্চয়তা কাটাতে চাই।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারে যাওয়া কিংবা দরকষাকষি, কিছুই এ মুহূর্তে মুখ্য নয়। কারণ দেশ এখন দুই ধারায় বিভক্ত। এটি এখন জাতীয় ধারায় নিয়ে আসা উচিত।
খালেদা জিয়ার প্রস্তাবিত জাতীয় ঐক্যের ব্যাপারে নেপথ্যে ভূমিকা রাখা গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী কাছে স্বীকার করেন, বৃহত্তর ঐক্য করতে হলে কতগুলো কর্মসূচির ব্যাপারে একমত হতে হবে, এটি ঠিক এবং সেখানে রাজনীতিতে সমঝোতার ব্যাপারগুলোও আসতে পারে। কিন্তু প্রাথমিকভাবে এখন কেবল বিএনপি চেয়ারপারসন সবাইকে চা-চক্রের আমন্ত্রণ জানাবেন। সুতরাং সেখানে শর্ত আরোপ করা ঠিক হবে না।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, চূড়ান্ত ঐক্য করতে হলে সেখানে হয়তো অনেকে অনেক প্রশ্ন বা নীতিগত অবস্থানের কথা তুলবেন। কিন্তু এখন শুধু বিএনপি চেয়ারপারসন সবাইকে চায়ের আমন্ত্রণের কথা বলছেন। এখানে দরকষাকষির কোনো ব্যাপার নেই। তাঁর মতে, দেশের এই ক্রান্তিকালে কেবল বিএনপির নয়, অন্য দলগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে জনগণের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টির ব্যাপারে।
গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার পর গত ৩ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সন্ত্রাসবিরোধী জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার জন্য দল-মত-নির্বিশেষে সবার প্রতি আহ্বান জানান খালেদা জিয়া। তাঁর এ প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে এরই মধ্যে দলটির নেতারা তৎপরতা শুরু করেছেন। তাঁদের সিদ্ধান্ত হলো—প্রাথমিকভাবে চায়ের আমন্ত্রণ দিয়ে শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত ওই ঐক্যকে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যে রূপান্তরিত করা। কাছে টানতে আগ্রহী এমন দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে বিএনপি আলাপ-আলোচনাও শুরু করেছে। আজ-কালের মধ্যে দলগুলোর নেতাদের ফোন করে খালেদা জিয়া চা খাওয়ার আমন্ত্রণ জানাতে পারেন বলে জানা গেছে।
তবে ওই দলগুলোর নেতারা বিএনপির প্রস্তাবে এককথায় রাজি হয়েছেন, এমন কোনো তথ্য সংশ্লিষ্ট নেতাদের পক্ষ থেকে স্বীকার করা হয়নি। তাঁদের মতে, রাজনৈতিকভাবে বিপাকে থাকা বিএনপি এখন নিজেদের সুবিধার জন্য প্রগতিশীল দলগুলোর সঙ্গে ঐক্য গড়তে আগ্রহী। কিন্তু প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে আবার তারা পুরনো রূপে ফিরে যাবে। ফলে ক্ষমতায় যাওয়ার ‘সিঁড়ি’ হিসেবে ব্যবহৃত হতে সহজে রাজি হওয়া যাবে না। প্রথমত, জামায়াতকে পুরোপুরি শুধু জোট থেকে নয়, আদর্শগতভাবে বিদায় করতে হবে। এরপর নিষ্পত্তি করতে হবে অন্যান্য ইস্যু।
১৯৯৯ সালের ৬ ডিসেম্বর চারদলীয় জোট গঠনের পর ঘোষিত যৌথ ইশতেহারে একসঙ্গে আন্দোলন, নির্বাচন ও সরকার গঠনের কথা বলা হয়েছিল; যার সূত্র ধরে জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে জোট সরকারের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অন্যদিকে ক্ষমতায় গিয়ে ২০০২ সালের ২১ জুন জোট সরকারের রাষ্ট্রপতির পদ থেকে এখনকার বিকল্প ধারার সভাপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে অপসারণ করা হয়। এরপর ২০০৬ সালের ২৬ অক্টোবর বিএনপির স্থায়ী কমিটির তৎকালীন সদস্য অলি আহমদের নেতৃত্বে দলের ৩১ জন সাবেক মন্ত্রী-এমপি বিএনপি থেকে বেরিয়ে এলডিপি গঠন করেন।
অলি আহমদ পরে ২০ দলীয় জোটে ফিরলেও বি চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্প ধারাকে বিএনপি এখন বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যে সম্পৃক্ত করতে চায়। তবে সর্বশেষ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে ওই দুই নেতা বিএনপির হাতে অপদস্থ হয়েছেন বলে মনে করা হয়। ফলে বি চৌধুরীকে বিএনপির সঙ্গে আনতে হলে তাঁর নিজের পদ বা অবস্থানের পাশাপাশি রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের বিষয়টি এখন সামনে চলে আসছে।
এ ছাড়া ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম, আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জেএসডি, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বাধীন নাগরিক ঐক্য, সিপিবি ও বাসদসহ সরকারের বাইরে থাকা দলগুলোকে নিয়ে সন্ত্রাসবিরোধী জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে চায় বিএনপি। ড. কামাল হোসেন গত মেয়াদে একাধিকবার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎ চেয়েও পাননি; বিষয়টি এখনো বিএনপিতে আলোচিত হয়।



Leave a Reply