কমিটি গঠনের পর যুগ পার হলেও সম্মেলন হয়নি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের চার সহযোগী সংগঠনের। এগুলো হলো-মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব মহিলা লীগ, তাঁতী লীগ ও আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ।
১৬ বছর ধরে আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে আছেন সাহারা খাতুন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। এখন সংসদ সদস্য সাহারা আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীতেও আছেন।
২০০০ সালের ২০ জুলাই ওই সম্মেলনে তার সঙ্গে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে থাকা আবু আব্দুল্লাহ গত সাত বছর ধরে মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর।
গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন বছর পর সম্মেলন হওয়ার কথা থাকলেও এখনও তা না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের এক নেতা বলেন, “এই বিষয়টা সাহারা আপা দেখছেন। উনার ওপর দিয়ে কেউ কথা বলেন না। উনি যখন মনে করবেন তখন দিবেন।”
সম্মেলন না হওয়ার কারণ এবং কবে তা হতে পারে জানতে চাইলে সাহারা খাতুন বলেন, “সম্মেলন হচ্ছে না, হবে। আমাদের কিছু কিছু জেলা কমিটির সম্মেলন দেওয়া বাকি আছে। এগুলোর কাজ সম্পন্ন হলে তারপর সম্মেলন হবে।”
মহিলা আওয়ামী লীগের সর্বশেষ কমিটিও হয়েছে ১৩ বছর আগে। ২০০৩ সালের ১২ জুলাই কাউন্সিলে আশরাফুন্নেসা মোশাররফ সভাপতি ও পিনু খান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
এরপর আর সম্মেলন না হওয়ায় নেতৃত্বে আসার সুযোগ না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংগঠনটির অনেকে।
সংগঠনটি ওই দুজনের কাছে ‘জিম্মি’ হয়ে আছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মহিলা লীগের ঢাকার এক থানা সভাপতি বলেন, “দীর্ঘ দিন ধরে থানা কমিটি নিয়ে আছি। কেন্দ্রীয় কমিটি না দেওয়ায় দলের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। তারা কোনোভাবেই পদ ছাড়তে চাচ্ছেন না। আমরা কেন্দ্রীয় সম্মেলনের কথা বললে অনেক কথা শোনায়।”
এতদিনেও সম্মেলন কেন হয়নি জানতে চাইলে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক পিনু খান বলেন,“সারা দেশের জেলা উপজেলার সম্মেলন দিতেই অনেক সময় চলে গেছে। তবে এখন আমরা সম্মেলনের জন্য প্রস্তুত আছি। দলীয় নির্দেশনা পেলেই সম্মেলন হবে।”
নির্দেশনা পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন,“অফিসিয়ালি আমরা কোনো নির্দেশনা পাইনি।”
যুগ পার করেছেন যুব মহিলা লীগের শীর্ষ নেতারাও। ২০০২ সালে নাজমা আক্তারকে আহ্বায়ক করে ১০১ সদস্যের কমিটি দেওয়া হয়। দুই বছর পর সম্মেলনে নাজমা আক্তারকে সভাপতি ও অপু উকিলকে সাধারণ সম্পাদক করে যুব মহিলা লীগের কমিটি হয়।
যুব মহিলা লীগের তৃণমূলের কমিটি দিতে ‘একটু সময় লেগেছে’ মন্তব্য করে অপু উকিল বলেছেন,তারা এখন সম্মেলনের জন্য ‘হাই কমান্ডের’ নির্দেশনার অপেক্ষায় আছেন।
তিনি বলেন, ২০০৪ সালের ১৫ মার্চ প্রথম সম্মেলনের মাধ্যমে তাদের কমিটি হয়। এর আগে আহ্বায়ক কমিটি ছিল। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি দিতে একটু সময় লেগেছে। এখন আমরা সম্মেলনের জন্য প্রস্তুত। দলীয় হাই কমান্ডের নির্দেশনার অপেক্ষায় আছি।
এক যুগেও সম্মেলন আয়োজন করতে না পারা তাঁতী লীগের আহ্বায়ক এর জন্য নিজেদেরই দুষছেন।
২০০৪ সালের ৮ অগাস্ট সংগঠনের আহ্বায়কের দায়িত্ব পাওয়া এনাজুর রহমান চৌধুরী বলেন, “নিজেদের দোষের কারণেই সম্মেলন হতে এত দেরি হয়েছে। আসলে উপর থেকে সম্মেলন করার কোনো চাপ বা নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তাছাড়া আমাদের মধ্যেও অনেকেই চান না সম্মেলন হোক। সম্মেলন হলে তো,তাদের পদ চলে যাবে। তবে ডিসেম্বরে সম্মেলন দেওয়ার জন্য আমরা নেত্রীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে সময় চাইব।”
এই চার সংগঠনের সম্মেলন নিয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, “২০১৩ সালে এই সহযোগী সংগঠনগুলোর সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল। সে সময় বিএনপি-জামায়াতের দেশব্যাপী অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি ও ’১৪ সালের নির্বাচন,তারপর আবার অরাজকতা; সব মিলিয়ে হয়ে ওঠেনি।”
ইতোমধ্যে সংগঠনগুলোকে সম্মেলন করার নির্দশ দেওয়া হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, “আশা করছি, আগামী অক্টোবরে আওয়ামী লীগের সম্মেলন হওয়ার আগেই তাদের সম্মেলন হবে।”
আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলন দ্বিতীয় দফা পিছিয়ে আগামী ২২ ও ২৩ অক্টোবর ঠিক হয়েছে। তিন বছর পর সম্মেলন হওয়ার কথা থাকলেও দলটির সর্বেশষ সম্মেলন হয় ২০১২ সালের ২৯ ডিসেম্বর।
আওয়ামী লীগের ওই চার সহযোগী সংগঠনের মতো অবস্থা না হলেও বছরখানেক আগেই মেয়াদ পেরিয়েছে আওয়ামী লীগের আরও চার সহযোগী সংগঠন- স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুবলীগ, কৃষক লীগ ও জাতীয় শ্রমিক লীগের নেতৃত্বের। ‘ভ্রাতৃপ্রতীম’ সংগঠন শ্রমিক লীগের কমিটিরও মেয়াদ শেষ হয়েছে দুই বছর আগে।
আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সহযোগী সংগঠনের সম্মেলন হওয়ার কথা তিন বছর পরপর। ‘ভ্রাতৃপ্রতীম’ সংগঠন ছাত্রলীগ ও শ্রমিক লীগের সম্মলন হওয়ার কথা দুই বছর পরপর। গত বছরের জুলাই মাসে ছাত্রলীগের সম্মেলন হলেও শ্রমিক লীগের সম্মেলন হয়নি চার বছরেও।
২০১২ সালের ১১ জুলাই মোল্লা মো.আবু কাইসারকে সভাপতি ও পঙ্কজ নাথকে সাধারণ সম্পাদক করে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সর্বশেষ কমিটি হয়।
মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও সম্মেলন হচ্ছে না কেন জানতে চাইলে সংগঠনের সভাপতি আবু কাউসার বলেন, “আমরা সম্মেলনের জন্য প্রস্তুত আছি। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের সম্মেলনের প্রধান অতিথি থাকেন, উনি যেদিন সময় দিবেন সেদিনই আমাদের সম্মেলন।”
তিন বছর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি থাকার পর ২০১২ সালের ১৪ জুলাইয়ের কাউন্সিলে সংগঠনের চেয়ারম্যান হন ওমর ফারুক চৌধুরী। ওই কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক হন হারুন অর রশিদ।
সম্মেলন নিয়ে যুবলীগ চেয়ারম্যান বলেন, “আমরা কংগ্রেস করতে সব সময় প্রস্তুত। আমাদের সাংগঠনিক নেত্রী রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা যখনই বলবেন, তখনই আমরা আয়োজন করব।”
২০১২ সালের ১৯ জুলাই কৃষক লীগের সর্বশেষ কমিটি হয়- মোতাহার হোসেন মোল্লাকে সভাপতি ও খন্দকার শামসুল হক রেজাকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়।
সভাপতি শুক্কুর মাহমুদ ও সাধারণ সম্পাদক মো.সিরাজুল ইসলাম নেতৃত্বাধীন শ্রমিক লীগের বর্তমান কমিটিও মেয়াদ পেরিয়েছে বছরখানেক আগে।
এই চার সংগঠনের সম্মেলনের সময় পার হলেও কেন দেরি হচ্ছে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “স্বাধীনতাবিরোধী ও দেশবিরোধীরা সম্প্রতি জঙ্গি সন্ত্রাসসহ দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাচ্ছে, সেটা মোকাবেলা করাই আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ। এগুলো কাটিয়ে উঠার সাথে সাথে যখনই সময় পাব তখনই সহযোগীদের সম্মেলন হবে।”



Leave a Reply