বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

কোরবানির পশুর রক্তে একাকার রাজধানী

কোরবানির পশুর রক্তে একাকার রাজধানীঈদের দিনে বৃষ্টির আশঙ্কার কথা আগেই জানিয়েছিল আবহাওয়া অধিদফতর। সেই আভাসই সত্যি হলো। ঈদের দিন সকালেই বৃষ্টি নামে মুষলধারে। ভিজে ভিজে জামাতে অংশ নেন মুসল্লিরা। রাজপথ, অলিগলি, এমনকি কোরবানির জন্য রাখা নির্দিষ্ট জায়গাগুলোও বৃষ্টির পানিতে সয়লাব হয়ে যায়। এর মধ্যেই বৃষ্টিতে ভিজে পশু জবাই করতে হয়েছে। আর পশুর রক্ত বৃষ্টির পানিতে মিশে রাজধানীর কোথাও কোথাও ‘রক্তনদী’র রূপ ধারণ করে। রক্তাক্ত পানিতে সয়লাব হয়ে যায় রাজপথ।

এর মূল কারণ রাজধানীর ড্রেনেজগুলো ময়লা আর আবর্জনায় আটকে থাকায় পানি নামছিল না সহসাই। রক্তাক্ত পানি জমে যায় যেখানে সেখানে। এজন্য সিটি করপোরেশেনের অব্যবস্থাপনাকেই দোষারোপ করেছেন নগরবাসী। তারা বলছেন, আগে থেকেই বিষয়টি সম্পর্কে সিটি করপোরেশন ব্যবস্থা নিলে এমন হতো না।

সরেজমিনে পুরনো ঢাকার বকসি বাজার, হোসনি দালাল, যাত্রাবাড়ী, কাঠালবাগান, শান্তিনগর, শান্তিবাগ, মিরপুরের কোনও কোনও সড়কে, মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন স্থানের সড়কে রক্তাক্ত পানি দেখা গেছে।

এ নিয়ে নগরবাসীও ফেসবুকে বিভিন্ন এলাকার রক্তাক্ত জলাবদ্ধতার ছবি পোস্ট করে সিটি করপোরেশনের দায়িত্বহীনতার কথা তুল ধরছেন।

এ সম্পর্কে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উপ-প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম বলেন, ‘শান্তিনগরের জলাবদ্ধতার সমস্যা দীর্ঘদিনের। সমস্যা সমাধানে কাজ করছি। ঈদের দিন দ্রুত সমস্যা সমাধানে মানিকনগরে ওয়াসার পাম্প চালু করা হয়েছে। আশা করি শিগগিরেই পানি নেমে যাবে।’

এদিকে বৃষ্টির পানি আর কোরবানির পশুর রক্ত মিশে রাজধানীতে যে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব নগরবাসীর স্বাস্থ্যেও পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে এর নেতিবাচক প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে শিশুদের ওপর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে, এমন এলাকাগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রিভেনটিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘পুরো ঢাকা শহরে এবার কোরবানির আগে-পরে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়েছে। এ কারণে ঢাকার বৃষ্টির পানি রক্তলাল হয়ে গেছে বলে আমরা বিভিন্ন জায়গায় দেখতে পেয়েছি। এই রক্ত অল্প সময়ের মধ্যে পচে যাবে। পচে গেলেই সেখান থেকে জীবাণু জন্ম নেবে। আর এই জীবাণু পানিবাহিত রোগের বিস্তার ঘটাবে রাজধানীতে। এরমধ্যে অন্যতম হলো, টাইফয়েড, জন্ডিস, উদারাময় ইত্যাদি।’

ডা. লেনিন চৌধুরী বলেন, ‘মুম্বাইয়ের ভেন্ডিবাজার এলাকার ড. আসাদ নামের একজন চিকিৎসক এ ধরনের একটি গবেষণা করেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, কোরবানির বর্জ্য ঠিকমতো পরিষ্কার করা না হলে এবং যেখানে-সেখানে কোরবানি দেওয়া হলে ওই অঞ্চলে ঈদের পরপরই সংক্রামক ব্যাধির বিস্তার ৩০-৩৫ ভাগ বেড়ে যায়। আমাদের দেশে এ ধরনের জরিপ না থাকলেও আমি মনে করি, এই কোরবানির সময় যেটা হলো এবং রক্তের যে বিস্তার ঘটলো, সেটার আফটার শক হিসেবে রোগবালাই বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।’

গ্রিন লাইফ মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের শিশুরোগ বিভাগের চিকিৎসক রকিব উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এই রক্তমাখা পানিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে শিশুরা। শিশুদের ত্বক খুবই স্পর্শকাতর। এই রক্তমিশ্রিত পানি শিশুদের শরীরে লাগলে চর্ম রোগ হওয়ার আশঙ্কা আছে। বড়রাও আশঙ্কামুক্ত নয়। তাদেরও চুলকানি, পানিফোড়ার মতো চর্মরোগ হতে পারে।’

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের নীতি বিশ্লেষক সৈয়দ মাহবুবুল আলম বলেন, ‘ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনের উচিৎ, যত দ্রুত সম্ভব এই জলাবদ্ধ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। আমাদের মনে রাখতে হবে, এই জীবাণু পানির পাশাপাশি বাতাসেও ছড়াচ্ছে।’

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *