বিরল রোগে আক্রান্ত নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের হোসনে আরা বেগম। তার সারা শরীরে হাজার হাজার আলু সদৃশ গোলাকার মাংস থাকায় সবাই তাকে ‘আলু মানবী’ বলে ডাকে। উপজেলার গুতিয়াবো আগারপাড়ার হোসনে আরা বেগম ২৫ বছর ধরে বিরল এই রোগে ভুগছেন। স্বামী ও ভিটেবাড়িহারা এই আলু মানবীর জীবন কাটছে করুণভাবে। একমাত্র রিকশাচালক ছেলের পক্ষে সাধ্য নেই মায়ের চিকিৎসা করার। দু’বেলা ভাত জোটানোই যেন অনেক কঠিন কাজ তাদের সংসারে।
সরেজমিন আগারপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ঘুটঘুটে অন্ধকার ঝুপড়ি ঘর। আর এ অন্ধকার ঘরের কোনায় বসে ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদছেন ‘আলু মানবী’ হোসনে আরা বেগম। লোকের বিদ্রুপ আর স্থানীয়দের অঘোষিত নিষেধাজ্ঞার কারণে ঘর থেকে বের হন না। কালেভদ্রে বের হলেও বোরকা পরে বের হতে হয়। অজানা এই রোগের কারণে তাকে কেউ মেনেও নেয় না। রিকশাচালক একমাত্র ছেলে ডাল-ভাতের জোগানদাতা। অনেক সময় এর-ওর আর নিজের ভাইদের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে চলে সংসার।
দেখা যায়, হোসনে আরার শরীরের বিভিন্ন অংশে আলু সদৃশ শতশত গুটি। মুখমণ্ডলে, চোখ, নাক, মুখের কিছু অংশ বোঝা যায়। হাতের গুটির অংশগুলো আরো বড়। একদম খৈ ফোটা হয়ে পিঠে অসংখ্য আলু গোটা। হোসনে আরা জানান, যন্ত্রণায় প্রায়ই জ্বর হয়, চুলকায়, জ্বালাপোড়া করে। অনেক সময় ঘষা লেগে পানি বের হয়। কষ্ট নিবারণ করতে, যন্ত্রণা কমাতে পানিতে গা ডুবিয়ে বসে থাকেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অভাব, হতাশা আর যন্ত্রণা নিয়ে জীবনের সঙ্গে নিরন্তর যুদ্ধ করছেন হোসনে আরা। কিন্তু যন্ত্রণা এতই বেড়ে চলছে যে তিনি আর বেঁচে থাকার সাহস খুঁজে পান না।
উপজেলার গুতিয়াব মধ্যপাড়া গ্রামের মৃত সাইজুদ্দিন মিয়ার মেজো মেয়ে হোসনে আরা। জন্মলগ্নে তার ঠোঁটের বামপাশে ছোট্ট আঁচিলের মতো একটি গোটা ছিল। সেটাই দিন দিন বড় হয়ে আলু আকৃতি ধারণ করে। ১৬ বছর বয়সে হোসনে আরার বিয়ে হয় পার্শ্ববর্তী শিমুলিয়া গ্রামের কারখানা শ্রমিক আরজু মিয়ার সঙ্গে। ৮৬ সালের দিকে মারা যায় স্বামী আরজু। দুই বছরের শিশুসন্তান নিয়ে যখন অভাবের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন তখন ভাইয়েরা তার এবং তার সন্তানের দায়িত্ব নিয়ে বাবার বাড়ি নিয়ে আসে।
এ দিকে দিন দিন শরীরের আঁচিল বড় হতে থাকে।
হোসনে আরা বলেন, ‘গ্রামের ডাক্তার দেহাইছি। কিন্তু অসুখ বাড়া ছাড়া কমে নাই। অনেকে কইছে টিউমার। হোমিওপ্যাথি ওষুধ খাইলে সাইরা যাইবোগা। হোমিওপ্যাথি দেহাইলাম অনেক বছর। কামের কাম কিছু অয় নাই। পরে লোকজনের কাছে চাইয়া মাইগ্যা মুড়াপাড়ার রফিক ডাক্তারের কাছে অপারশেন করাইয়া হেই আলুডা কাইট্টা ফালাইলাম। হেরপর অই শুরু অইলো আমার অভিশাপ।’
ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কেঁদে হোসনে আরা বলেন, ‘অপারেশনের পর থেকেই শুরু হলো অভিশপ্ত জীবন। হাজার হাজার আলু গোটায় ভরে যেতে থাকল সারা অঙ্গ। আমি বাজান পোড়া কপালি। আর নাইলে ক্যান এমন অইবো। সোয়ামীরে হারাইলাম। সোয়ামীর ভিটেবাড়ি হারাইলাম। ঠিক মতন পেট ভইরা খাইবার পারি না। আর এমুন এক রোগ অইলো মানুষও কাছে আহে না। আর পোলাপানতে দেইহ্যাতো ডরায় (ভয়)। অহন মরবারও পারি না। খোদায় আমারে দুনিয়াত্তে লইয়া যাইতোগা। এই যন্ত্রণা থেইক্যা মইরা যাওন অনেক ভালা।’
হোসনে আরার ভাই আবদুল হালিম জানান, হঠাৎ কোথাও হোসনে আরা গেলে সেখানে উৎসুক জনতার ভিড় জমে। তাকে দেখতে প্রতিদিন অনেক মানুষও আসে, অনেকে চিকিৎসা কিংবা কিছু খাওয়ার জন্য টাকা পয়সা দেয়। কিন্তু সংসারের অভাবের কারণে সেসব ব্যয় হয়ে যায় চাল-ডালের পেছনেই।
এ ব্যাপারে রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার বাদল চন্দ্র সাহা বলেন, দেখতে টিউমারের মতো মনে হলেও আসলে পরীক্ষা না করে বলা সম্ভব নয় রোগটি কি। আর আমার চিকিৎসা জীবনে এত বেশি পরিমাণ আলু সদৃশ বস্তু কারো শরীরে দেখিনি। যদি হোসনে আরা আমাদের কাছে চিকিৎসা গ্রহণের জন্য আসেন তাহলে আমরা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে পরামর্শ করব।
এদিকে ঈদের পর গুতিয়াব গ্রামের হোসনে আরা বেগমকে দেখতে যান পূর্বাচল দুস্থ কল্যাণ লিল্লাহ ফান্ডের নেতা জাকির হোসেন, চাঁন মিয়া, মিয়াজ উদ্দিন, অ্যাডভোকেট শুক্কুর মাহমুদ, ইকবাল হোসেন, মোন্তাজ উদ্দিন, হাফিজুল ইসলাম, ফয়সালসহ গ্রামের ব্যক্তিরা। সংগঠনের পক্ষ থেকে হোসনে আরা বেগমের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেয়া হয়। সরকারিভাবে সুচিকিৎসার অনুরোধ জানানো হয় সংগঠনের পক্ষ থেকে।



Leave a Reply