বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশের কোথাও দুর্গা পূজায় সাউন্ড সিস্টেম নিষিদ্ধ হয়নি

বাংলাদেশের কোথাও দুর্গা পূজায় সাউন্ড সিস্টেম নিষিদ্ধ হয়নি“বাংলাদেশে দূর্গাপূজায় সাউন্ড সিস্টেম তথা মাইক বাজানো নিষিদ্ধ” বলে ভারতীয় গণমাধ্যমে হওয়া খবরকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন খোদ হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। ভারতের ওই সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদকে সর্বৈব মিথ্যা ও উসকানিমূলক বলে মন্তব্য করেছেন পূজা উদযাপন পরিষদ শ্রীমঙ্গল শাখার সাধারণ সম্পাদক সুশীল শীল।

বাংলাদেশে প্রায় ২৯ হাজারের বেশি মণ্ডপে এ বছর দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গার আরাধনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। গতবছরের চেয়ে এবছর বেশি মণ্ডপে পূজা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দুর্গাপূজা নিয়ে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু ধর্মাবলম্বী নেতাদের সঙ্গে প্রশাসন সহ সংশ্লিষ্টদের বৈঠক ও মতবিনিময় সভা হচ্ছে।

বাংলাদেশের সার্বজনীন পূজা উদযাপন কমিটির নেতারা বলছেন, এই ধরনের কথা কোথাও হয়নি। বরং বলা হয়েছে, মাইকে বা সাউন্ড সিস্টেমে পূজার গান ও ঢাকের বাদ্যি ছাড়া হিন্দি বা বিজাতীয় গান বাজানো যাবে না এবং কোনো মণ্ডপে অশালীন ডিজে পার্টির আয়োজন করা যাবে না বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে।

গত ১৯ সেপ্টেম্বর আসামের শিলচর, গুয়াহাটি ও কলকাতা থেকে প্রকাশিত একটি দৈনিক পত্রিকার প্রথম পাতায় গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশিত এক সংবাদে বলা হয়- “বাংলাদেশে দুর্গা পূজায় সাউন্ড সিস্টেম নিষিদ্ধ”। খবরটি গোটা বাংলাদেশের বলে বলা হলেও এতে শ্রীমঙ্গলের খবর দেওয়া হয়। সংবাদটিতে বলা হয়, শ্রীমঙ্গলে এবার দুর্গাপূজায় মাইক বা সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করা যাবে না।

এই সংবাদটির পর ভারতে বাঙালি হিন্দু ও মুসলমিদের মধ্যে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া হয়।

এই প্রসঙ্গে জানতে যোগাযোগ করা হলে শ্রীমঙ্গল উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সুশীল শীল রোববার নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কমের এই প্রতিনিধিকে বলেন, আমাদের উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে ১৬৫টি মণ্ডপে পূজা হবে। মাইক বা সাউন্ড সিস্টেম বাজানো যাবে না বলে প্রকাশিত খবরটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। কোথা থেকে এই খবরের সূত্রপাত হলো?

তিনি বলেন, পূজার নাম করে অশালীনতা ও পূজার ধর্মীয় পরিবেশ নষ্ট হচ্ছিল ধীরে ধীরে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে এসব বন্ধ করতে চাই।

তিনি বলেন, পূজায় ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গায়ক-গায়িকা এনে ডিজে পার্টির নামে ভিন্ন ধরনের উচ্চরবের গান করে পূজার পরিবেশ নষ্ট করে এক শ্রেণীর যুবকরা। সন্ধ্যার সময় পূজা মণ্ডপের বাতি বন্ধ করে তাদের ডিজে পার্টির মঞ্চে লাল-নীল বাতি জ্বলতে থাকে। এসব কি পূজার পরিবেশ? মা দুর্গার মণ্ডপে আমরা এই অশালীনতা বন্ধ করতে চেয়েছি।

সুশীল শীল আরও বলেন, আমরা এই কথাতো দুই মাসের বেশি আগে পূজা কমিটিগুলোকে জানিয়ে দিয়েছি। এখন কেন তারা এসব নিয়ে অপব্যাখ্যা করছেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ শ্রীমঙ্গল পৌর শাখার গত ৩ সেপ্টেম্বর ও গত ১৬ সেপ্টেম্বরের সভায় শ্রীমঙ্গল পৌর শাখার  অধীনে শহর এবং শহরতলীর প্রায় ২০টি পূজা মণ্ডপের সভাপতি/সম্পাদকের আলোচনায় দুর্গা পূজায় যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রাখতে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে ৷ সেখানে বলা হয়েছে, ডিজে পার্টি করলে মণ্ডপের কমিটিগুকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে।

শ্রীমঙ্গলের পাশের উপজেলা বাহুবলের হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য  নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কমকে বলেন, উচ্চস্বরে হিন্দি গান বাজানো যাবে না- এটা এই বছরের কোনো সিদ্ধান্ত নয়; বরং এই প্রাকটিস আমরা হবিগঞ্জের বিভিন্ন মণ্ডপে করছি বিগত দুই বছর ধরেই। এভাবে উচ্চস্বরে বিজাতীয় গান বাজিয়ে পূজার আধ্যাত্মিক পরিবেশ নষ্ট হয় বলেই আমরা মনে করি।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা চেয়ারম্যান এবং শ্রীমঙ্গল পূজা উদযাপন কমিটির প্রাক্তন সভাপতি রণধীর কুমার দেব নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কমকে বলেন, সাউন্ড সিস্টেম নিষিদ্ধ বলে প্রকাশিত সংবাদ সর্বৈব মিথ্যা এবং উসকানিমূলক। আমরা বলেছিলাম, উচ্চস্বরে হিন্দি গান বাজিয়ে পূজার পরিবেশ নষ্ট করা যাবে না। কিন্তু সাউন্ড নিষিদ্ধ- এটাতো কোথাও বলা হয়নি।

এদিকে শ্রীমঙ্গলের বাইরে সারা বাংলাদেশে অবশ্য এই ধরনের কোনো অপব্যাখ্যা তৈরি হয়নি।

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি রানা দাশগুপ্ত বলেন, পূজায় উচ্চস্বরে গান বাজিয়ে পূজার পরিবেশ নষ্ট না করতে সারাদেশের কমিটিগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সারাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি মাথায় রেখে আমরা বলেছি, সবাইকে সচেতন থাকতে। শুধু পুলিশের ওপর নির্ভর না করে নিজেরাও স্বেচ্ছাসেবক তৈরি করতে, যেন চব্বিশ ঘণ্টাই সবকিছু দেখে রাখা যায়।

চলতি বছর বাংলাদেশে ২৯ হাজারের বেশি মণ্ডপে পূজার আয়োজন চলছে বলে জানান বাংলাদেশ মহানগর সার্বজনীন পূজা উদযাপন কমিটির সাবেক সভাপতি বাসুদেব ধর। তিনি বলেন, পূজা শুরুর কয়েকদিন আগে চূড়ান্ত সংখ্যা জানা যাবে।

বাসুদেব ধর বলেন, আমাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত ২০১৫ সালে ঢাকা মহানগরীকে পূজামণ্ডপের সংখ্যা ছিল ২২২টি আর সারাদেশে প্রায় ২৯ হাজার ৭৪টি। তিনি জানান, ২০১৪ সালে  দেশে পূজা মণ্ডপের সংখ্যা ছিল ২৮ হাজার ৩৮৭টি। ২০১৩ সালে ২৮ হাজার ২০০টি, ২০১২ সালে ২৭ হাজার ৮শ’টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *